একুশে পদকপ্রাপ্ত রাবির সাবেক অধ্যাপক মজিবর আর নেই

রাবি প্রতিনিধি
১৯ মে ২০২০, ১৭:৫৮আপডেট : ১৯ মে ২০২০, ১৮:১১

অধ্যাপক ড. মজিবর রহমান দেবদাস একুশে পদকপ্রাপ্ত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) গণিত বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক ড. মজিবর রহমান দেবদাস আর নেই। সোমবার (১৮ মে) বার্ধক্যজনিত কারণে জয়পুরহাটের মহুরুল গ্রামে নিজ বাসভবনে মারা যান তিনি (ইন্নালিল্লাহি. . . রাজিউন )। তার বয়স হয়েছিল ৯০ বছর। একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে তিনি আমৃত্যু মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় ছিলেন। 

বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সোমবার বেলা সাড়ে ১১টায় রাষ্ট্রীয় সম্মাননা প্রদান শেষে অধ্যাপক মজিবরকে তার পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।

ড. মজিবুর রহমান ১৯৩০ সালের ১ জানুয়ারি জয়পুরহাটে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫২ সালে গণিতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তারপর করাচির সেন্ট্রাল সরকারি কলেজে যোগদানের মাধ্যমে তার অধ্যাপনা জীবনের শুরু। ১৯৬৪ সালে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটি থেকে ফলিত গণিতে এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করে করাচির নাজিমাবাদ কলেজে যোগ দেন। পরে তিনি ১৯৬৭ সালের ১৬ অক্টোবর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত বিভাগে সিনিয়র লেকচারার হিসেবে যোগ দেন।

১৯৭১ সালের ১০ মে মজিবর রহমান বিশ্ববিদ্যালয়ের পবিত্রতা নষ্ট এবং বিশ্ববিদ্যালয়কে পাকিস্তান আর্মির ক্যাম্পে পরিণত করবার জন্য তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে একটি প্রতিবাদলিপি দেন। মুসলমান হয়ে আর এক মুসলমানের ওপর পাকবাহিনীর নির্মমতা দেখে নিজের নাম পরিত্যাগ করে নতুন ‘দেবদাস’ নাম ধারণ করেন। প্রতিবাদলিপিতে আগের নাম উল্লেখসহ পরিবর্তিত নাম ‘দেবদাস’ উল্লেখ করেছিলেন তিনি।

প্রশাসনিক তৎপরতায় অধ্যাপক মজিবর রহমান দেবদাসের চিঠি পৌঁছে যায় পাকিস্তানি সামরিক দফতরে। ১৯৭১ সালের ১২ মে এ প্রতিবাদী অধ্যাপককে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ক্যাম্পাস থেকে ধরে নিয়ে যায়। রাজশাহী, পাবনা ও নাটোর কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে প্রায় চার মাস ধরে তার ওপর অমানবিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। পাকিস্তানি বাহিনীর নিষ্ঠুর নির্যাতনে অধ্যাপক রহমান যখন প্রায় মানসিক ভারসাম্য হারানোর মতো অবস্থায়, তখন ৫ সেপ্টেম্বর ’৭১ তাকে ছেড়ে দেওয়া হয় নাটোর ক্যাম্প থেকে।

স্বাধীনতার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন তাদের পরিবারকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোয়ার্টারে অবস্থানের সুযোগ ও অন্যান্য সুবিধা দিয়ে সিন্ডিকেট সভায় এক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। জাতীয় অধ্যাপক ও ইতিহাসবিদ সালাহউদ্দিন আহমেদের (তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন) একান্ত চেষ্টায় শহীদদের পরিবারকে দেওয়া সুযোগ-সুবিধা অধ্যাপক মজিবুর রহমান দেবদাসের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে এ মর্মে সিন্ডিকেটে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সেই থেকেই তাকে আখ্যায়িত করা হয় ‘জীবন্ত শহীদ’ বলে।

’৭১-এ পাক হানাদার বাহিনীর পাশবিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের তীব্র প্রতিক্রিয়ার কারণে তিনি আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারেননি। বেঁচে থাকলেও তিনি ছিলেন অনেকটা স্মৃতি বিভ্রম, যেন জীবন্ত শহীদ অর্থাৎ জীবিত থেকেও মৃত। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অকৃতদার এই বুদ্ধিজীবী এভাবেই বেঁচে ছিলেন।

তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন মানসিক রোগের চিকিৎসার জন্য তাকে পাবনা হেমায়েতপুর মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করে। তিনি পাগল নন এ কথা বলে হেমায়েতপুরে চিকিৎসা নিতে অনীহা প্রকাশ করেন। হেমায়েতপুর থেকে এসে তিনি চলে যান একেবারে লোকচক্ষুর আড়ালে। দীর্ঘদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের কেউ তার খোঁজখবর জানতেন না। দৈনিক আজকের কাগজের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রতিনিধি বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক হাসিবুল আলম প্রধান তার খোঁজ পেয়ে একটি প্রতিবেদন লেখেন, যা ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই ওই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনটি তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নজরে আসে।

১৯৯৮ সালের ১২ আগস্ট তৎকালীন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় মহান মুক্তিযুদ্ধে ত্যাগ ও অবদানের জন্য তাকে সংবর্ধনা প্রদান করে। স্বাধীনতা লাভের ৪৩ বছর পর ২০১৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে একুশে পদকে ভূষিত করে।

জীবনে শেষ সময় জয়পুরহাটের সদর উপজেলার মহুরুল গ্রামে নিজ বাড়ির চার দেয়ালের আবদ্ধ ছিলেন। তার দেখভাল করতেন ভাইয়ের স্ত্রী রোকেয়া বেগম ও নাতি-নাতনিরা।

/এমএএ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম