বগুড়ায় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুক্রবার (২৬ জুন) রাতে মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের আইসোলেশন ইউনিটে সাংবাদিক মুক্তিযোদ্ধা সাইদুজ্জামান তারা (৭০) ও গার্মেন্টসকর্মী মুজাহিদুল ইসলাম (৪৫) মারা গেছেন। একই ইউনিটে শনিবার (২৭ জুন) দুপুরে করোনা উপসর্গ নিয়ে ফরিদ উদ্দিন (৫৫) নামে এক ব্যবসায়ী ভর্তি হওয়ার ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই মারা গেছেন।
মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. খায়রুল বাশার মমিন এ তথ্য দিয়েছেন।
কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের সদস্যরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে মৃতদেহগুলো ধোয়ানো, জানাজা ও দাফন করেছেন।
শুক্রবার রাতে মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের আইসোলেশনে মারা যাওয়া সাংবাদিক ও মুক্তিযোদ্ধা সাইদুজ্জামান তারা (৭০) বগুড়া প্রেসক্লাব ও বগুড়া সাংবাদিক ইউনিয়নের সদস্য ছিলেন। তিনি বগুড়া থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক হাতিয়ার পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক ছিলেন। তিনি সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম রাজশাহী বিভাগীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছিলেন। বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার ডেমাজানি ইউনিয়নের মালোপাড়া গ্রামের বাসিন্দা সাইদুজ্জামান তারা শহরের সূত্রাপুর এলাকায় পরিবার নিয়ে বাস করতেন।
ডা. খায়রুল বাশার মমিন জানান, করোনা উপসর্গ নিয়ে সাইদুজ্জামান তারাকে বৃহস্পতিবার রাতে আইসোলেশন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। শুক্রবার তার নমুনা বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালের পিসিআর ল্যাবে পাঠানো হয়। ফলাফলে তিনি করোনা শনাক্ত হন। শ্বাসকষ্ট বেড়ে গেলে রাত সাড়ে ৮টার দিকে তিনি মারা যান। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়ে রেখে গেছেন।
কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছাসেবীদের সহযোগিতায় শনিবার সকালে গার্ড অব অনার ও জানাজা শেষে তার মরদেহ গ্রামের বাড়ির কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, এর আগে গত ৪ জুন ঢাকার কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে করোনায় মারা যান বগুড়া থেকে প্রকাশিত দৈনিক উত্তরকোণের সম্পাদক ও বগুড়া প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য অধ্যাপক মোজাম্মেল হক তালুকদার (৭৪)। গত ১০ জুন বগুড়া শজিমেক হাসপাতাল পিসিআর ল্যাবে নমুনা দিতে গিয়ে উপসর্গ নিয়ে মারা যান দৈনিক বগুড়ার বার্তা সম্পাদক ওয়াসিউর রহমান রতন (৬২)।
করোনায় পোশাক শ্রমিকের মৃত্যু
ডা. খায়রুল বাশার মমিন আরও জানান, গাজীপুরের একটি পোশাক কারখানার শ্রমিক মুজাহিদুল ইসলামের বাড়ি বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ি গ্রামে। তিনি করোনা আক্রান্ত হয়ে গত ২০ জুন মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের আইসোলেশন ইউনিটে ভর্তি হন।
কাশির সঙ্গে তার রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়ায় শুক্রবার তাকে আইসিইউতে রাখা হয়। রাত ১১টা ৫০ মিনিটে তিনি মারা যান।
কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের সদস্যরা তার মরদেহ প্রস্তুত, জানাজা ও দাফন সম্পন্ন করেছেন।
করোনা উপসর্গ নিয়ে ব্যবসায়ীর মৃত্যু
মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের ডা. খায়রুল বাশার মমিন আরও জানান, করোনা উপসর্গ নিয়ে ফরিদ উদ্দিন (৫৫) নামে এক ব্যবসায়ী শনিবার (২৭ জুন) দুপুরে হাসপাতালের আইসোলেশন ইউনিটে মারা গেছেন। তিনি শ্বাসকষ্ট ও জ্বর নিয়ে শনিবার বেলা সোয়া ১২টার দিকে আইসোলেশন ইউনিটে ভর্তি হন। অবস্থার অবনতি হলে বেলা ১টার দিকে তার মৃত্যু হয়।
বগুড়া সদরের ছোট কুমিড়া গ্রামের ফরিদ উদ্দিন শহরের রাজাবাজারে ব্যাগের ব্যবসা করতেন ফরিদ।
স্বাস্থ্যবিধি মেনে ফরিদ উদ্দিনের মরদেহ প্রস্তুত ও হাসপাতাল চত্বরে জানাজা করা হয়। পরে ছোট কুমিড়া গ্রামের কবরস্থানে তার মরদেহ দাফন করা হয়েছে।
ঢাকায় মারা যাওয়া ব্যাংক কর্মকর্তা খলিলুর রহমানের দাফন
কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন বগুড়া শাখার অর্গানাইজার মিজানুর রহমান জানান, মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক সাইদুজ্জামান তারা ও গার্মেন্টকর্মী মুজাহিদুল ইসলাম, ব্যবসায়ী ফরিদ উদ্দিনের মরদেহের পৃথকভাবে গোসল, জানাজা ও দাফন ছাড়াও ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে করোনায় মারা যাওয়া একটি ব্যাংকের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট খলিলুর রহমানের (৭০) দাফন করা হয়েছে। খলিলুর রহমানের বাড়ি বগুড়ার গাবতলী উপজেলার লস্করীপাড়ায়।
জেলায় আরও ৬৭ জন করোনাভাইরাস আক্রান্ত
এদিকে শনিবার দুপুর পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় বগুড়ায় আরও ৬৭ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। এ নিয়ে গত ৮৮ দিনে জেলায় বিভিন্ন পেশার দুই হাজার ৬৬৯ জন করোনা পজিটিভ হলেন। এ সময় মারা গেছেন ৪৭ জন।
ডেপুটি সিভিল সার্জন মোস্তাফিজুর রহমান তুহিন এসব তথ্য দিয়েছেন।
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সূত্র জানায়, শুক্রবার বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতাল পিসিআর ল্যাবে ১৮৮ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। বগুড়ার ১৭৭ জনের মধ্যে ১৮ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। টিএমএসএস মেডিক্যাল কলেজ ও রফাতউল্লাহ কমিউনিটি হাসপাতাল পিসিআর ল্যাবে ১৮৮ জনের নমুনার মধ্যে বগুড়ার ছিল ১২৮ জনের। এর মধ্যে করোনা পজিটিভ শনাক্ত হয়েছেন ৪৯ জন। দুটি ল্যাবে ২২ জন নারী ও পাঁচজন শিশুসহ মোট ৬৭ জন করোনা পজিটিভ হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ৫৬ জন, শেরপুরে চারজন, শিবগঞ্জে তিনজন, ধুনটে দু’জন এবং কাহালু ও শাজাহানপুর উপজেলায় একজন করে।
সূত্রটি আরও জানায়, শুক্রবার পর্যন্ত জেলায় করোনা আক্রান্ত ছিলেন দুই হাজার ৬০২ জন। নতুন ৬৭ জন শনাক্ত হওয়ায় এ পর্যন্ত জেলায় মোট আক্রান্ত হলেন, দুই হাজার ৬৬৯ জন। এর মধ্যে এক হাজার ৮৩২ জন পুরুষ, ৬৯০ জন নারী ও ১৪৭ জন শিশু। মোট আক্রান্তের মধ্যে শহর তথা সদর উপজেলায় সর্বোচ্চ এক হাজার ৮৬৩ জন, গাবতলীতে ১৪০ জন, শাজাহানপুরে ১৩৫ জন, শেরপুরে ১০৩ জন, কাহালুতে ৭৪ জন, সারিয়াকান্দিতে ৭১ জন, শিবগঞ্জে ৬৯ জন, সোনাতলায় ৫৪ জন, দুপচাঁচিয়ায় ৫৩ জন, ধুনটে ৫৩ জন, নন্দীগ্রামে ২৮ জন ও আদমদীঘি উপজেলায় ২৬ জন।
ডেপুটি সিভিল সার্জন মোস্তাফিজুর রহমান তুহিন জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় পাঁচজন সুস্থ হয়েছেন। এ নিয়ে জেলায় মোট সুস্থ হলেন ৩২২ জন। মারা গেছেন ৪৭ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে ২৬৩ জনের। গত ১ এপ্রিলের পর জেলায় নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে ১৬ হাজার ৭৪৩ জনের। ফলাফল পাওয়া গেছে ১৪ হাজার ৩১৯ জনের। নমুনা জটে পড়েছে দুই হাজার ১১৯ জনের।








