দেশের সবচেয়ে উঁচু এলাকা পঞ্চগড়। অথচ ভারি বর্ষণ ও উজানের ঢলে পঞ্চগড়ের তালমা নদীতেও তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। নদীর পার ধরেই ছিল পঞ্চগড় দেওয়ানহাট-ফকিরপাড়া-আমকাঁঠালবাজার যাতায়াতের প্রাচীন রাস্তা। কিন্তু, নদীর অব্যাহত ভাঙনে এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক যুগ ধরে উদাসীনতায় এই মেঠোপথটি এখন নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার উপক্রম। এতে ঝুঁকিতে পড়েছে ফসলি জমি, মসজিদ, কবরস্থান বসতবাড়ি। স্থানীয় সংসদ সদস্য এই নদীর ভাঙন প্রতিরোধে এক যুগ ধরে ডিও লেটার দিয়ে গেলেও প্রতিকারে কোনও ব্যবস্থা নেয়নি। আশ্বাসের পর আশ্বাস দিলেও নদী ভাঙন রোধে প্রকৃতপক্ষে কোনও পদক্ষেপই নেয়নি পানি উন্নয়ন বোর্ড। নদী ভাঙন প্রতিরোধে নদীপাড়ে মানববন্ধন করেছে শিশু, নারী-পুরুষসহ কয়েক শতাধিক মানুষ।
পঞ্চগড় দেওয়ানহাট-ফকিরপাড়া-আমকাঁঠালবাজার যাতায়াতের প্রাচীন রাস্তাটি ভাঙতে ভাঙতে এখন চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। রিক্সা-ভ্যানতো চলেই না সাইকেল নিয়েও চলাচল কষ্টকর হয়ে পড়েছে। সড়কের গাছপালা নদীগর্ভে ভেঙে গেছে। এক কিলোমিটারের মতো রাস্তা নদীগর্ভে ভেঙে পড়ায় চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে চরম দুর্ভোগে পড়েছে ফকিরপাড়া ও মাহানপাড়া গ্রামের বাসিন্দারাসহ দেওয়ানহাট ডুডুমারি, তেলিপাড়া এলাকার মানুষসহ ওই রাস্তা দিয়ে চলাচলকারী হাজার হাজার মানুষ।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, নদী ভাঙন রোধে ২০০৮ সালে পঞ্চগড়-১ আসনের সাংসদ মো. মজাহারুল হক প্রধানের ডিও লেটার নিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড অফিসে যোগাযোগ করা হয়। পরবর্তীতে ২০১৪ তৎকালীন সংসদ সদস্য নাজমুল হক প্রধানও পানি উন্নয়ন বোর্ড অফিসকে নদীতে বাঁধ নির্মাণের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন। পাউবোর তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান একাধিকবার এসে মাপজোঁক করে নিয়ে গেলেও গত এক যুগেও পাউবো কর্তৃপক্ষ নদী ভাঙন রোধে নদী তীর সংরক্ষণ বাঁধ নির্মাণে কোনও ব্যবস্থা নেননি। ফলে ওই এলাকার মানুষ বর্তমানে দিশেহারা ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে।
গত শনিবার বিকেলে নদী তীরবর্তী এলাকার মানুষ দ্রুত তালমা নদীতে বাঁধ নির্মাণের দাবিতে মানববন্ধন করেছে। শিশু নারী-পুরুষ, বৃদ্ধসহ কয়েক শতাধিক মানুষ মানববন্ধনে অংশ নেন।
ফকিরপাড়া গ্রামের নুরুল ইসলাম, কামরুল ইসলাম ও আল ইমরান জানান, রাস্তাটি তালমা নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। যানবাহন তো চলে না, পায়ে হেঁটেও যাতায়াত করাও কঠিন। জরুরি প্রয়োজনে এলাকার কেউ অসুস্থ হলে দ্রুত নিয়ে যাওয়ার কোনও উপায় নেই।
ফকিরপাড়া এলাকার কবির হোসেন, আমিরুল ইসলাম জানান, রাস্তা ভেঙেছে। নদী ভাঙন রোধে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে মসজিদ, কবরস্থান, ফসলি জমি ও ঘরবাড়ি ভেঙে যাবে।
রফিকুল ইসলাম নামে এক কৃষক বলেন, বছরের পর বছর ধরে রাস্তা খাচ্ছে তালমা, এখন রাস্তাটা ঠিক করতে না পারলে মনে হচ্ছে আমাদেরও গিলে ফেলবে। আমাদেরও ঘর-বাড়ি নদীতে বিলীন হয়ে যাবে। এই রাস্তা না থাকলে পঞ্চগড় থেকে যাবো কি করে আমকাঁঠালবাজার?
ওই এলাকার তোফাজ্জল হোসেন, সফিরউদ্দিন ও আব্দুল খালেক জানান, আমরা কৃষকরা খুব বেশি সমস্যায় পড়েছি। রিক্সা-ভ্যান চলাচল করতে না পারায় ফল ও ফসলসহ উৎপাদিত কৃষিপণ্য হাটবাজারে নিয়ে যেতে পারছি না। সার, বীজ, কীটনাশক কোনও কিছু আনতেও পারছি না।
সালমা বেগম নামে এক গৃহবধূ জানান, আমরা খুব বিপদে আছি। ভাঙা রাস্তা দেখে ভয় লাগে। আমাদের ছেলেমেয়েরা ওই রাস্তা দিয়ে চলাচল করতে পারছে না।
ওই গ্রামের কামরুল ইসলাম জানান, দিনের বেলাতেই রাস্তা দিয়ে হাঁটতে ভয় করে। রাতে বেলা হেঁটে যাতায়াতে অনেকেই মালামালসহ নদীতে পড়েছে। লোকজন মসজিদে নামাজ পড়তে আসতে পারছে না। সরকারের কাছে দাবি আমাদের চলাচলের একমাত্র রাস্তায় বাঁধ নির্মাণ করা হোক।
পঞ্চগড় ইউনিয়ন পরিষদের ইউপি সদস্য মো. নজরুল ইসলাম জানান, নদীর পাড় সংলগ্ন প্রাচীন এই রাস্তাটির বৃহৎ অংশই নদীতে ভেঙে গেছে। এক যুগ ধরে স্থানীয় সংসদ সদস্য, পাউবো কর্তৃপক্ষসহ বিভিন্ন দফতরে আমরা আবেদন নিবেদন করেছি। সময় মতো বাঁধ নির্মাণ করা না গেলে ফকিরপাড়া, মাহানপাড়া গ্রামে যাতায়াতের কোনও রাস্তাই থাকবে না।
ঠাকুরগাঁও পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী (পঞ্চগড়ের ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত) মো. রবিউল ইসলাম জানান, তালমা নদীসহ পাঁচটি নদীর অর্ধশত ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বাঁধ নির্মাণের জন্য ডিপিপি পাঠানো হয়েছে। ফকিরপাড়ার ওই স্থানটিও এর মধ্যে রয়েছে। আমরা ক্ষতিগ্রস্ত স্থানটি পরিদর্শন করেছি। নদীর পানি বেশি থাকায় আপৎকালীন সময়ে তাৎক্ষণিকভাবে জিও ব্যাগ দিয়ে মেরামত করার ব্যবস্থা করা হবে, তবে পরবর্তীতে আমরা বিষয়টি প্রকল্প আকারে তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে পাঠাবো।








