করোনাকালে কর্মহীন হয়ে পড়া অসহায় দুস্থদের জন্য বগুড়ার দুপচাঁচিয়া পৌর এলাকায় প্রধানমন্ত্রীর আর্থিক প্রণোদনার তালিকা তৈরিতে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। জনপ্রতিনিধিরা স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে একই পরিবারের স্বামী-স্ত্রী, ভাইবোন, বাবা-ছেলে, প্রবাসী, প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার, ভবনের মালিক সাবলম্বীদের তালিকাভুক্ত করেছেন এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে বঞ্চিতদের মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তারা তদন্ত সাপেক্ষে এ অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
এ প্রসঙ্গে পৌরসভার বিএনপি সমর্থিত মেয়র জাহাঙ্গীর আলম জানান, তিনি জানামতে কোনও অনিয়ম করেননি। তড়িঘড়ি করে তালিকা তৈরি করায় ভুলত্রুটি হতে পারে।
সরেজমিন ও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকারি নির্দেশ অমান্য করে দুপচাঁচিয়া পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের পাইকপাড়ার ধনী প্রবাসী ও বিলাসবহুল বাড়ির মালিক হাবিবুর রহমানের স্ত্রী চায়না বেগম প্রণোদনার টাকা পেয়েছেন। এ ওয়ার্ডে হাওয়া বিবি তার দুই ছেলে হারুনুর রশিদ ও রাজু আহমেদ, রবিউল ইসলাম ও তার স্ত্রী রিনা পারভীন, মো. সজল ও তার মা সাহারা খাতুন, মৃত আলীমুদ্দিনের স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক ছেলের স্ত্রী, মালেকা বিবি ও তার মেয়ে রজনী খাতুন, অন্য ভাতাভোগী সুফিয়া বেগম, জয়পুরপাড়ায় কোটি টাকার কাজ চলমান প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার তাহিনুর রহমানসহ অনেকে টাকা পেয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে ২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আকরাম হোসেন দাবি করেন, মেয়র ও নারী কাউন্সিলর তালিকা দেওয়ায় এক পরিবারের একাধিক ব্যক্তি প্রণোদনার টাকা পেয়ে থাকতে পারেন।
তার ওয়ার্ডে বিলাসবহুল ভবনের মালিকের স্ত্রী চায়না বেগম কী করে এই তালিকাভুক্ত হলেন জানতে চাইলে তিনি দাবি করেন, স্বামী প্রবাসী ও ভবনের মালিক হলেও চায়না বেগম গরিব, তাই তাকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
৩ নম্বর ওয়ার্ডে ধাপ গ্রামে আবদুল মতিন খাঁন নামে এক ব্যক্তিকে প্রণোদনার জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। তিনি একটি দোতলা ভবনের মালিক। অন্য ভাতাভোগী আনোয়ারা বেগম ও নবানু খাঁ, সহোদর রব্বানী মন্ডল ও শহিদুল মন্ডল, সহোদর বাবলু মিয়া ও আবদুল মতিন খাঁন, আলমগীর মন্ডল ও তার সহোদর রব্বানী মন্ডল, মা বুবলি ও মেয়ে মলি বেগমসহ এক পরিবারের অনেককে এবং অন্য ভাতাভোগীদের প্রণোদনার তালিকায় রাখা হয়েছে। যদিও নিয়ম হচ্ছে সরকারের অন্য ভাতাভোগী কাউকে এই তালিকায় রাখা যাবে না। একই পরিবারের একাধিক সদস্যকেও রাখা যাবে না।
কাউন্সিলর আবদুস সালাম আলমের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি দাবি করেন, আবদুল মতিন খাঁন জমিজমা বিক্রি করে বিল্ডিং করেছেন। তিনি গরিব তাই তালিকায় তার নাম দেওয়া হয়েছে। তবে তিনি কোনও ভাতাভোগী বা একই পরিবারের একাধিক কারও নাম দেননি।
৪ নম্বর ওয়ার্ডে এমন অভিযুক্ত নামগুলো হচ্ছে দুলন ফকির ও ছেলে শাহজাহান ফকির, সহোদর জুয়েল ফকির ও রানা ফকির। এ বিষয়ে জানতে চাইলে কাউন্সিলর ইউনুস আলী মহলদার মানিককে ফোনে পাওয়া যায়নি।
৫ নম্বর ওয়ার্ডে রুনু চক্রবর্তী, তার ছেলে সানি চক্রবর্তী ও মেয়ে পিংকি চক্রবর্তী, সমরেশ কুমার সাহা ও তার মা রেবা নারী সাহা, শিখা রানী
চক্রবর্তী ও ছেলে শাওন চক্রবর্তী, সুমি সরকার ও তার মেয়ে সুকৃতি রানী মালী, জলি কর্মকার ও তার ছেলে বিধান কুমার কর্মকার, লিপি রানী সরকার ও তার শ্বশুর স্বপন সরকার প্রমুখকে প্রধানমন্ত্রীর প্রণোদনার তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
গরিব হওয়ায় একই পরিবারের একাধিককে প্রণোদনার অর্থ দেওয়ার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার সত্যতা স্বীকার করে কাউন্সিলর এসএম কায়কোবাদ বলেন, এটা তার অন্যায় হয়েছে। তবে সবাই গরিব।
৬ নম্বর ওয়ার্ডে সহোদার লিটন শাহ ও মিঠু শাহ, সহোদর হাসান আলী ও হোসেন আলী, ছামসুল হোসেন ও তার স্ত্রী জোসনা বেগম, শ্রাবনী রানী মহন্ত ও তার শাশুড়ি তুলশী রানী, সবিতা রানী মহন্ত ও ছেলে সুজন চন্দ্র মহন্ত, রনি মহন্ত ও তার স্ত্রী বিথী রানী মহন্ত, হালিমা বেগম ও তার ছেলে বাবুল হোসেন, নামের বানান পরিবর্তন করে একই নারী মিলন বেগমকে দু’বার প্রধানমন্ত্রী প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে।
একই ওয়ার্ডের অবস্থাসম্পন্ন নিখিল চন্দ্র পাল, শ্যামলী রানী পাল ও নমিতা রানী পাল এবং রেখা রানী পালসহ আটজন ভাতাভোগী এ সুযোগ পেয়েছেন।
কাউন্সিলর মহিদুল ইসলাম জানান, তিনি জানামতে তালিকাতে একই পরিবারের একাধিক ব্যক্তিকে, অন্য ভাতাভোগী ও স্বাবলম্বীকে রাখেননি। মেয়র ও নারী কাউন্সিলরও তালিকা দেওয়ার কারণে এটা হতে পারে।
৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আশরাফুজ্জামান সাগরের চাচা ধনী ও বিলাসবহুল বাড়ির মালিক আসাদুজ্জামান লিটন দুস্থ হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর প্রণোদনার টাকা পেয়েছেন। এ ওয়ার্ডে ভারত প্রবাসী মুক্তার হোসেন ও তার স্ত্রী রুনু বেগম, বগুড়া-২ আসনের এমপি শরিফুল ইসলাম জিন্নাহর ভগ্নিপতি এসএম মাকসুদার রহমান প্রণোদনা পেয়েছেন।
কাউন্সিলর আশরাফুজ্জামান সাগর জানান, তার চাচা লিটন জমি বিক্রি করে ভবন নির্মাণ করেছেন। তিনি আসলে গরিব তাই প্রণোদনার
টাকার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া তিনি তালিকায় আর কোনও ভুল করেননি। প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে কেউ ভুল তথ্য দিয়েছে।
৮ নম্বর ওয়ার্ডে অমল চন্দ্র কর্মকার ও তার স্ত্রী শ্যামলী রানী কর্মকার, প্রবাসী রতন সরকার, প্রবাসী মো. শামীম, ওমর ফারুককে দু’বার এবং জুয়েলারী ব্যবসায়ী ভবনের মালিক পল্টু অধিকারীকে প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে।
কাউন্সিলর রেজানুর তালুকদার রাজিব জানান, তিনি একই পরিবারের একাধিক ব্যক্তিকে বা ধনীদের তালিকাভুক্ত করেননি।
এ ব্যাপারে দুপচাঁচিয়া পৌরসভার সাবেক মেয়র বেলাল হোসেন জানান, বর্তমান মেয়র বিএনপি নেতা জাহাঙ্গীর আলম ও তার ঘনিষ্ঠ কাউন্সিলররা স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ অমান্য করে একই পরিবারের একাধিক ব্যক্তি, ধনী ও প্রবাসীদের প্রণোদনার ব্যবস্থা করেছেন। অথচ নিজেদের ভোটার না হওয়ায় অনেক অসহায় দরিদ্রকে তালিকায় আনা হয়নি।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আশরাফুল আরেফিন জানান, দুপচাঁচিয়া পৌর এলাকার ৯টি ওয়ার্ডে এক হাজার ৬৬২ জন প্রধানমন্ত্রীর প্রণোদনার অর্থ পেয়েছেন বা পাচ্ছেন। প্রণোদনা প্রদানে কোনও অনিয়মের অভিযোগ পেলে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।
মেয়র জাহাঙ্গীর আলম তার বিরুদ্ধে আনা অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ দৃঢতার সঙ্গে অস্বীকার করে বলেন, যারা লজ্জায় অভাবের কথা বলতে পারেন না এমন মধ্যবিত্তকেও তালিকাভুক্ত করতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। তাই এমন লোকজন তালিকাভুক্ত হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর এই প্রণোদনা মূলত তাদের জন্যই। এটা প্রধানমন্ত্রী বারেবারে তার ভাষণে বলেছেন। তবে তড়িঘড়ি করে তালিকা তৈরি করায় কিছু ভুলত্রুটি হতে পারে।








