খাগড়াছড়ি জেলার মানিকছড়ি উপজেলার গুচ্ছগ্রামের মৌলভী পাড়ায় এক যুবলীগ লীগ নেতার নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে বিদ্যুতের খুঁটি ও সংযোগ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে এলাকাবাসীর কাছ হতে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে গণস্বাক্ষরে একটি লিখিত অভিযোগ করেও প্রতিকার পাচ্ছেন না ভুক্তভোগী এলাকাবাসী। তবে অভিযুক্ত মানিকছড়ি উপজেলা যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আসাদুল ইসলাম সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, স্থানীয় আওয়ামী লীগের কিছু নেতা তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে।
সরেজমিনে মানিকছড়ি গুচ্ছগ্রাম মৌলভী পাড়ায় গেলে ওই এলাকার বাসিন্দা শেফালী বেগম জানান, তিনি মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে হাত পেতে, ভিক্ষা করে পরিবার চালান। মানিকছড়ি উপজেলা যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আসাদুল ইসলাম এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগের কথা বলে তার কাছ থেকে পাঁচ হাজার টাকা নিয়েছেন। কিন্ত এখনও কোনও বিদ্যুৎ সংযোগ পাননি। তার মতো আরও ২০০ এলাকাবাসী হতে ৫/১০ হাজার টাকা করে নিলেও এখন পর্যন্ত বিদ্যুৎ সংযোগ লাগেনি।
একই এলাকার হালিমা বেগম বলেন, ‘এলাকার মসজিদ থেকে মাইকে ঘোষণা দিয়ে আমার কাছ থেকে তিন হাজার টাকা নেয় যুবলীগ নেতা আসাদুল। তার এই কাজে সহযোগিতা করে যুবলীগ সদস্য শাহজাহান ও ইব্রাহীম হোসেন লিটন। সিন্ডিকেটের সদস্যরা টাকা না দিলে খুঁটি পাবো না বলায় টাকা দিয়েছি। এখন খুঁটি, বিদ্যুৎ সংযোগ বা বিদ্যুৎ কোনোটাই পাইনি। তাই গত ১৩ জুলাই আমরা পুরো এলাকাবাসী জেলা প্রশাসক বরাবরে আবেদন করেছি। কিন্তু এখন র্পযন্ত কোনও প্রতিকার পাইনি।’
৫ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. আব্দুল হাই, এলাকাবাসী আব্দুল হাকিম, টুটুল সরকার এবং মোয়াজ্জেম ফকির জানান, আসাদুল গত বছর এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগের কথা বলে খরচের জন্য প্রতি পরিবার থেকে তিন হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা করে নিয়েছে। কিন্তু এক বছরেও কাজ হয়নি। চলতি বছর মসজিদের মাইক থেকে ঘোষণা দিয়ে আরও টাকা দাবি করে। প্রায় ৫০ পরিবার থেকে অবৈধভাবে কয়েক লাখ টাকা আদায় করে। এখন আসাদুলের কাছে বিদ্যুৎ সংযোগের কথা বললে সে এখন নতুন করে পরিবার প্রতি ১০/১৫ হাজার করে টাকা দাবি করছে। টাকা দিলে বিদ্যুতের খুঁটি দেওয়া হবে, না হলে বিদ্যুৎ পাবে না বলে জানিয়ে দিচ্ছে। ফলে তারা জেলা প্রশাসকের কাছে প্রতিকার চেয়ে দরখাস্ত দিয়েছেন।
আবদুল হাই আরও বলেন, ‘এ ব্যাপারে কেউ প্রতিবাদ করলে সিন্ডিকেটের সদস্যরা এলাকাবাসীকে নানা হুমকি ধমকি দিচ্ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যেখানে বলেছেন পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিটি ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া হবে, সে ক্ষেত্রে টাকা দিয়েও বিদ্যুৎ পাচ্ছি না। আমরা এর প্রতিকার ও সু-বিচার পেতে প্রধানমন্ত্রীর সু-দৃষ্টি কামনা করছি।’
এ বিষয়ে আসাদুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতির নেতৃত্বে একটি চক্র ষড়যন্ত্র শুরু করছে। মসজিদের মাইকে এলাকায় বিদ্যুতায়ন নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা কথা বলেছেন। এলাকায় প্রায় দুই হাজার পরিবারের বসবাস। গ্রামের মসজিদ কমিটি পুনর্গঠন, মসজিদ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা এবং এলাকার উন্নয়ন করা নিয়ে বিরোধ থাকায় চক্রটি আমাকে হেনস্থা করতে বিভিন্ন জায়গায় অভিযোগ করছে। এর আগেও আমার বিরূদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ করেছে। তদন্তও হয়েছে। কিন্তু সত্যতা পাওয়া যায়নি।’
আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিদ্যুতায়নের কাজ এলাকায় চলছে। ৫২টি খুঁটি ইতোমধ্যে বসানো হয়েছে। টানা হয়েছে তার। পর্যায়ক্রমে বিদ্যুত সংযোগ হবে। তবে এসব কাজের ঠিকাদার তো আমি না। প্রত্যেকে নিজের বাড়িতে খুঁটি চায়। এর প্রতিবাদ করেছি বলেই আমাকে দুর্নীতিবাজ বানানোর চেষ্টা করছে। তদন্ত হলে সত্যতা পাওয়া যাবে।’
মানিকছড়ি উপজেলা যুবলীগ সভাপতি সেমায়ুন ফরাজী বলেন, ‘খুঁটি বাণিজ্যের সঙ্গে আসাদুল জড়িত নন। কারণ আজ থেকে কয়েক মাস আগে এই বিষয়টি নিয়ে মানিকছড়ি থানায় বৈঠক হয়েছে। এলাকাবাসী সেদিন যে বক্তব্য দিয়েছে, তাতে আসাদুল নির্দোষ। এই সংক্রান্ত লিখিত আছে। বর্তমানে বিষয়টি নিয়ে মানিকছড়ি উপজেলা ছাত্রলীগ থেকে চাঁদাবাজির অভিযোগে বহিষ্কৃত টুটুল সরকার এবং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সভাপতি মিলে ষড়যন্ত্র করছে। তদন্ত হলে সত্যতা বেরিয়ে আসবে।‘
খাগড়াছড়ি নির্বাহী প্রকৌশলী স্বাগত সরকার জানান, তিনিও অভিযোগটি শুনেছেন। শুধু মানিকছড়ি নয় বিভিন্ন জায়গায় এধরণের অভিযোগ আসছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জেলা প্রশাসক প্রতাপ চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ‘এলাকাবাসীর গণস্বাক্ষরের দরখাস্তটি আমার চোখে পড়েনি। খোঁজ নেওয়া হবে। দরখাস্ত দিলে বিষয়টি তদন্ত করে দেখবে প্রশাসন। অভিযোগের সত্যতা পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।‘








