রাজশাহীতে ছোট গরুর চাহিদা বেশি, অনলাইনে নেই তেমন সাড়া

দুলাল আবদুল্লাহ, রাজশাহী
২৯ জুলাই ২০২০, ২১:১২আপডেট : ২৯ জুলাই ২০২০, ২১:৩৬

রাজশাহীর একটি গরুর হাট

কোরবানিকে সামনে রেখে রাজশাহীর হাটগুলো ক্রেতা-বিক্রেতাদের আগমনে জমে উঠেছে। কিন্তু অনলাইনে পশুরহাটে বিক্রেতা আছে, নেই তেমন ক্রেতা।

রাজশাহী সিটি করপোরেশন (রাসিক) এলাকায় সবচেয়ে বড় সিটি হাটে অন্য দিনের তুলনায় বুধবার (২৯ জুলাই) পশুর সংখ্যা বেশি ছিল। কিন্তু ক্রেতার তুলনায় কম ছিল। তবে স্থানীয় ও অন্য জেলা থেকে আগত ক্রেতাদের ভিড় বেশি ছিল। হাটে স্বাস্থ্যবিধির তোয়াক্কা না করে ঝুঁকি নিয়েই চলাফেরা করছেন ক্রেতা-বিক্রেতারা। তবে করোনার কারণে এবারের হাটে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের মধ্যে একটু দর কষাকষি বেশি। সবাই সাধ আর সাধ্যের মিল রেখেই পছন্দের কোরবানির পশু ক্রয় করে বাড়ি ফিরছেন।

বুধবার নোয়াখালী জেলা থেকে রাজশাহীতে কোরবানি পশু ক্রয় করতে এসেছেন ব্যবসায়ী মোখলেসুর রহমান। তিনি জানান, সিটি হাটে বড় গরুর সংখ্যা বেশি আছে। কিন্তু ছোট গরু ক্রেতার সংখ্যা প্রচুর। আমি দুই ট্রাক গরু ক্রয় করে যাবো। সকাল থেকে এক ট্রাক গরু ক্রয় করেছি। দাম খুব বেশি নয়, তবে পছন্দ করে গরু ক্রয় করে নিয়ে যাবো। তাই আস্তে আস্তে গরু ক্রয় করছি। এখানে সাপ্তাহিক হাট রবিবার ও বুধবার। কিন্তু ঈদের জন্য বৃহস্পতিবার ও শুক্রবারও হাট বসবে। তাই আরেক ট্রাক রাতের মধ্যে অথবা বৃহস্পতিবার ক্রয় করে ঢাকা ও নোয়াখালীর পথে ফিরবো। তিনি জানান, বুধবারের হাটে বাইরের পাইকারি ব্যবসায়ীরা আগের হাটের তুলনায় বেশি এসেছে।

জানা গেছে, বুধবার এই হাটে শহরসহ রাজশাহী জেলার বিভিন্ন এলাকা ও বাইরের ক্রেতা-বিক্রেতাদের আনাগোনায় জমজমাট হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে সাপ্তাহিক হাট হিসাবে সবচেয়ে বড় হাটে স্থানীয় ক্রেতাদের ভিড় বেশি। অন্য সময় বড় বড় সাইজের গরু ১ লাখ ২০ হাজার টাকা দাম হয়। সেই গরু এদিনে ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তাই অনেকেই শেষ মুহূর্তে লোকসান হতে পারে ভেবে বিক্রি করছে। আবার ক্রেতারা কম দামে গরু ক্রয় করে বাড়ি ফিরছেন।

হাটে স্বাস্থ্যবিধি না মেনে কেনাবেচায় মগ্ন ক্রেতা-বিক্রেতারা।

গোদাগাড়ী উপজেলার শিব সাগর এলাকার হাজিকুল জানান, সাড়ে ৫ মণ ওজনের একটি গরু ৯৩ হাজার টাকায় ক্রয় করেছেন।

পবা উপজেলা মুরারীপুর এলাকার খামারি আব্দুর রশিদ জানান, এবার অনেকটা ক্ষতি করে গরু বিক্রি করতে হলো। আমার দুইটি গরু ছিল। এরমধ্যে প্রায় ৮ হাজার টাকা লোকসান করে একটি বিক্রি করতে পেরেছি। এখনও একটি বিক্রি করতে বাকি আছে। খামার থেকেই বিক্রি করবো। কিন্তু ক্রেতা না পেলে রেখে দিতে হবে।

সার বেঁধে ট্রাকে তোলা হয়েছে ষাঁড়গরুগুলোকে।

নগরীর রাজপাড়া থানার লক্ষীপুর এলাকার সৈয়দ মোহাম্মদ জানান, বুধবার সকালে গরু ক্রয় করার জন্য হাটে এসেছি। কিন্তু ছোট সাইজের গরুর ক্রেতার সংখ্যা বেশি। হাটে গরুর সংখ্যা কম। কিন্তু অন্য জেলা থেকে পাইকাররা বেশি আসায় গরু কিনতে সমস্যা হচ্ছে। 

খামারি সাইফুল ইসলাম জানান, হাটে দেশি গরুই বেশি। তবে করোনার জন্য দাম কম। মানুষ তেমন দাম বলছে না। এক লাখ টাকার গরুর দাম বলছে ৮০ থেকে ৮৫ হাজার টাকা।

ঢাকা থেকে আগত মোস্তাক আহম্মেদ নামের এক ব্যবসায়ী জানান, পশুর হাট নিয়ে একটু সমস্যায় আছি। তাই গরু কম কিনছি। হাটের ঠিকঠাক ব্যবস্থা করা গেলে বেশি পশু কিনবো। ঢাকায় এক লাখের বেশি দামের গরুর চাহিদা বেশি। এই হাটে বিভিন্ন জায়গার বড় গরু আসে।

হাটে দামদর

রাজশাহী সিটি হাটের ইজারদার আতিকুর রহমান কালু জানান, আজকের (বুধবার) হাটে ছোট গরুর দাম বেশি। বড় গরুর দাম কম। ঈদের আগের দিন (শুক্রবার) পর্যন্ত চলবে। 

নগরীর সিটি পশুহাট ছাড়াও রাজশাহী জেলায় বড় পশুহাট রয়েছে। এই হাটগুলো হচ্ছে বাগমারা উপজেলার তাহেরপুর, পুঠিয়া উপজেলার হাট বানেশ্বর, গোদাগাড়ী উপজেলার কাঁকনহাট, তানোর উপজেলার মুন্ডুমালা, বাগমারা উপজেলার ভবানীগঞ্জেও কোরবানির গরু উঠতে শুরু করেছে। সেই হাটগুলোতে জমে উঠেছে। তবে স্বাস্থ্যবিধি মানার কোনও লক্ষণ নেই।

এদিকে করোনাকালে কোরবানির পশু বিক্রি নিয়ে অনলাইন পশুহাট আশা জাগাচ্ছিল খামারি ও ব্যবসায়ীদের। এতে অনেক খামারি ও ব্যবসায়ী অনলাইন হাটে পশু নিয়ে হাজির হচ্ছেন। পরিচিত ও বড় খামারিরা এর মাধ্যমে কিছুটা উপকৃত হলেও ক্রেতা না থাকায় পশু নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন ক্ষুদ্র খামারিরা। এছাড়া অনেক বিক্রেতার প্রযুক্তি উপকরণ ও জ্ঞান না থাকায় অনলাইন পশুহাটের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

রাজশাহীতে সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসনের ইনোভেশন প্রোগামের ‘পশুরহাট’ নামক একটি অ্যাপ, ফেসবুক গ্রুপ ও খামারিদের নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ও পেজের মাধ্যমেই প্রচারণা চালিয়ে ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হচ্ছে। তবে তেমন সাড়া পাচ্ছেন না বিক্রেতারা। পশুরহাট ওয়েবসাইটটি রাজশাহী বিভাগসহ বাইরের আরও কয়েকটি জেলায় কাজ করছে। বুধবার (২৯ জুলাই) বিকাল পর্যন্ত এ হাটে ২ হাজার ১৪০ জন বিক্রেতা তাদের ২ হাজার ৪১৮টি গরু নিবন্ধন করেছে। তবে এখন পর্যন্ত এই হাটে ভিজিটরের সংখ্যা মাত্র ৫৭০ জন। এ পর্যন্ত এ হাট থেকে মাত্র ৩০০টি গরু বিক্রি হয়েছে। পশুরহাট নামক এই নতুন অ্যাপটি ব্যবহার করতে গিয়েও বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন বিক্রেতারা।

পাইকাররা হাট থেকে গরু কিনে নিয়ে যাচ্ছে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায়।

পবা উপজেলার মুসতাক ক্যাটল ফার্মের মালিক মুসতাক আহমেদ জানান, তিনি একজন ক্ষুদ্র খামারি। তার খামারে এবার ৯টি গরু কোরবানির জন্য প্রস্তুত ছিল। করোনার কারণে সবার মতো তিনিও হতাশার মধ্যে আছেন। এ পর্যন্ত তার ২টি গরু বিক্রি হয়েছে। এই ২টি গরুতে প্রায় ৬০ হাজার টাকা ক্ষতি হয়েছে। তিনি কয়েকদিন আগে অনলাইনে কয়েকটি গ্রুপ ও পশুরহাট সাইটে নিবন্ধন করে গরুর বিস্তারিত প্রদর্শন করেছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত কেউ যোগাযোগ করেনি।

আরেকজন খামারি গোদাগাড়ী উপজেলার কাঁকনহাট এলাকার নাদিম হায়দার জানান, তার তিনটি গরু বিক্রির জন্যে রাজশাহীর পশুরহাট অ্যাপসহ নিজের অ্যাকাউন্টে পোস্ট করেছেন। এখন পর্যন্ত তিনি কোনও সাড়া পাননি। এছাড়া পশুরহাট অ্যাপে জটিলতা থাকায় তিনি ছবি ও ভিডিও আপলোড করতে পারেননি।

পশুরহাট ওয়েবসাইটের নির্মাণ প্রতিষ্ঠান এসএফ টেকনোলজিস লিমিটেডের সিইও শাহীন রেজা জানান, অনলাইন গরুহাটগুলো মূলত ক্রেতা ও বিক্রেতাদের মধ্যে একটা যোগাযোগ তৈরি করে দিচ্ছে। এখানে তারা মতবিনিময় করে বিশ্বস্ততার মাধ্যমে ক্রয়-বিক্রয় করছেন। আর তাদের যে পশুরহাট সাইটটি আছে, সেখানে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়কে নিজেদের তথ্য নিয়ে নিবন্ধন করতে হবে। ক্রেতা ছবি দেখে পশু পছন্দ করে মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিজ দায়িত্বে পশু ক্রয় করবেন। এখানে ক্রেতা-বিক্রেতাদের কোনও সার্ভিস চার্জ দিতে হবে না। যাবতীয় লেনদেন তারা নিজের দায়িত্বে করবেন। সাইট কর্তৃপক্ষ কোনও দায় নেবে না। তবে এই সাইটটি যেহেতু জেলা প্রশাসন তদারকি করছে সুতরাং কোনোরকম অন্যায় হলে প্রমাণ সাপেক্ষে তারা ব্যবস্থা নেবেন।

খামার থেকে অনলাইনে বিক্রি হচ্ছে গরু

তিনি আরও জানান, এ বছর অনলাইনে পশু কেনাবেচা প্রথম শুরু হওয়ায় বিভিন্ন কারণে এ হাট তেমন জমে উঠছে না। নতুন হওয়ায় তাদের সাইট নিয়েও কিছু সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে, যেগুলো তারা সমাধান করার চেষ্টা করছেন। তবে সাইটটি এখন সারা বছরই ব্যবহার করা যাবে। আগামীতে সাইটটিকে আরও সমৃদ্ধ করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।

তবে এর উল্টো পিঠও আছে। রাজশাহীতে ফেসবুকে পরিচিত কয়েকটি ফার্ম অনলাইনে ভালো সাড়া পাচ্ছে। এরইমধ্যে ভালো দামে তারা গরু বিক্রি করেছেন। এমনই একজন গরু খামারি আরাফাত রুবেল জানান, অনলাইন মার্কেটে তিনি ভালো সাড়া পেয়েছেন। তার গ্রাহকরা ছবি, ভিডিও ও লাইভে এসে গরু পছন্দ করে অর্ডার দিয়েছেন। গরু হাতে পাওয়ার আগেই তাকে পেমেন্ট করেছেন। পরে তিনি গরু সরবরাহ করেছেন।

তিনি আরও জানান, তিনি ফেসবুকে অনেক আগে থেকেই তার খামারের প্রচারণা চালিয়ে এসেছেন। এতে গ্রাহকরা যে গরুটা পছন্দ করেছেন, সে গরুটি যখন বাছুর অবস্থায় ছিল সে ছবিটিও তারা তার পেজে দেখতে পাচ্ছেন। এতে গ্রাহকের বিশ্বাস তৈরি হয়েছে। হঠাৎ করে অনলাইনে আসলে হয়তো এ বিশ্বাস তৈরি করতে সমস্যা হতো।

রাজশাহী জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. অন্তিম কুমার সরকার জানান, অনলাইনে পশু বেচাকেনা এই প্রথমবার শুরু হওয়ায় ক্রেতা-বিক্রেতাদের কিছু সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। তবে তা সমাধানে তারা কাজ করে যাচ্ছেন। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারাও নিজেদের ফেসবুক পেজসহ গ্রুপে অনলাইন গরুহাটে ক্রেতা-বিক্রেতাদের নিবন্ধন করতে উদ্বুদ্ধ করছেন। খামারিদের গরুহাট সাইটে নিবন্ধন করতে সহযোগিতা করছেন। অনলাইন হাটে অনেকেই ভালো সাড়া পাচ্ছেন। নাবা ক্যাটল ফার্মের মতো বড় খামারিরা অনলাইনের মাধ্যমেই তাদের পশু বিক্রি করছেন।

এ বিষয়ে রাজশাহীর অতিরিক্ত জেলা প্রাশাসক (সার্বিক) শরিফুল হক জানান, অনলাইনের মাধ্যমে গরু কেনাবেচার প্রতি তারা গুরুত্ব দিয়েছেন। এ বছর প্রথম অনলাইনে পশুহাট শুরু হওয়ায় তেমন জমে উঠছে না। তবে এ বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা খামারিদের নিয়ে কাজ করছেন। পশুরহাট সাইটটি নিয়েও তারা কাজ করছেন। এখানে খামারিদের অংশগ্রহণ নিশ্চিতে জোর দেওয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত রাজশাহীর অনেক খামারি এ হাটে নিবন্ধন করেছেন। হাট সম্পর্কে জানাতে বিজ্ঞাপনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে এখন যেহেতু ক্রেতা কম ও যাদের এক দুইটি গরু আছে তারা এ হাট সম্পর্কে তেমন জানেন না।

/টিএন/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম