যে তৈরি পোশাক খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির শক্ত ভিত, সেই শিল্পখাতে এবার প্রতিবেশী দেশ ভারতে বিনিয়োগ করতে চলেছে বাংলাদেশ। আর এর জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নিজের রাজ্য গুজরাটকে–পশ্চিম ভারতের যে রাজ্যটির শিল্পবান্ধব বলে পরিচিতি আছে।
এর জন্য গুজরাটের রাজধানী আহমেদাবাদের কাছে কাডি নামের জায়গা- যা ভারতের ‘কটন সিটি’ নামে পরিচিত- সেটা বাংলাদেশি শিল্পপতিদের খুব পছন্দ হয়েছে বলেও জানা গেছে।
গুজরাট সরকারের শিল্প কমিশনার মমতা ভার্মা বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, বাংলাদেশে থেকে বিজিএমইএ, এফবিসিসিআই ও বাংলাদেশ কটন অ্যাসোসিয়েশনের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল গত সেপ্টেম্বর মাসেই গুজরাটে ঘুরে গেছেন। কাডিতে প্রায় ২৫০-৩০০ কোটি ভারতীয় রুপি খরচ করে তারা একটি অত্যাধুনিক টেক্সটাইল পার্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী– আর সে জন্য ঢাকায় ফিরে গিয়ে তারা গুজরাট সরকারের কাছে ১০০ একরের মতো জমি বরাদ্দ করার অনুরোধও জানিয়েছেন।
মিস ভার্মা বলছেন, ‘এমনিতেই বাংলাদেশ গুজরাট থেকে প্রচুর পরিমাণে ‘ইয়ার্ন’ বা কাপাস সুতো আমদানি করে তাদের গারমেন্ট শিল্পের জন্য। ফলে গুজরাটের পার্কে তারা যদি নিজেরাই ইয়ার্ন তৈরি করে নিতে পারেন সেটা বাংলাদেশের জন্য অর্থনৈতিকভাবে ভীষণ সাশ্রয়ী হবে। প্রাথমিকভাবে তারা ইয়ার্ন তৈরির ওপর জোর দিলেও পরে এই কারখানায় গারমেন্ট বা তৈরি পোশাকও বানানো হতে পারে বলে আমাদের তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন।’
ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য প্রসারের ক্ষেত্রে এই প্রস্তাবিত টেক্সটাইল পার্ক যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা পদক্ষেপ তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য এই সিদ্ধান্তের তাৎপর্য বোধহয় আরও বেশি– কারণ এই প্রথম তারা দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশে লগ্নি করতে যাচ্ছেন। বাংলাদেশে রাজনৈতিক ডামাডোলের কারণে শিল্পের পরিবেশ যে মাঝে মাঝেই বিঘ্নিত হয়, সেটাও হয়তো এর মাধ্যমে কিছুটা আর এর জন্য তারা ভরসা রেখেছেন ভারতের সবচেয়ে পশ্চিমের রাজ্য গুজরাটেই– কারণ এখানে শিল্প সংস্থাগুলো অনেক মসৃণভাবে কাজ চালাতে পারে, আর বিদেশি লগ্নিকারীদের জন্য গুজরাটে সবচয়ে বড় গ্যারান্টি হলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজে। জমির সংস্থান থেকে শিল্প স্থাপনের সব লাইসেন্স পাওয়ার প্রক্রিয়াটাও ভারতের বাকি প্রায় সব রাজ্যের চেয়ে গুজরাটে অনেক ভাল, কাজেই আহমেদাবাদের কাছে কাডি কেন বাংলাদেশের শিল্পপতিদের পছন্দ হয়েছে তা বুঝতে অসুবিধা হয় না।
বাংলাদেশ গারমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) একজন সদস্য, যিনি গত সেপ্টেম্বরে গুজরাটে ঘুরে গেছেন, তিনি এই প্রতিবেদককে জানান গুজরাটের মেহসানা জেলার কাডিতে এখনও শিল্প স্থাপনের মতো প্রচুর জমি আছে। এই কটন সিটিতে এখনও শতাধিক কটন মিল রমরম করে চলছে। তাই প্রস্তাবিত টেক্সটাইল পার্কে কাঁচামাল পেতেও সমস্যা হওয়ার কথা নয়। তবে গুজরাট সরকারের কাছ থেকে জমি পাওয়ার সবুজ সংকেত না-মিললে বিজিএমইএ বা এফবিসিসিআই এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে টেক্সটাইল পার্ক নিয়ে কোনও ঘোষণা করতে রাজি নয়।
বিশ্ব বাণিজ্যের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি অর্থ বছরে বাংলাদেশ চীনকেও টপকে বিশ্বের সর্বাধিক কটন আমদানিকারী দেশ হতে চলেছে। আমদানি করা এই কটনই বাংলাদেশের গারমেন্ট শিল্পের প্রধান কাঁচামাল, আর তার অধিকাংশই আসে প্রতিবেশী ভারত থেকে। কটন বা কাপাস তুলার উৎপাদনে যারা বিশ্বে প্রথম।
কিন্তু গুজরাটে প্রস্তাবিত টেক্সটাইল পার্কের মাধ্যমে বাংলাদেশ এখন সরাসরি ভারতের মাটিতে গিয়েই ইয়ার্ন তৈরি করতে চাইছে– যা বদলে দিতে পারে বাংলাদেশের গারমেন্ট শিল্পের পুরো ভূগোল আর অংকটাই!
/এফএ/আপ-এনএস/








