ময়মনসিংহ বিভাগের চার জেলায় নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের মামলায় গত এক বছরে সাজার হার মাত্র সাত শতাংশেরও কম। আইনজীবী ও পুলিশ জানায়, সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাব এবং আপস-মীমাংসার কারণেই শেষ পর্যন্ত আদালতে এসব মামলায় আসামিদের সাজা হয় না। তবে মানবাধিকার নেতারা বলছেন, পুলিশের গাফিলতির কারণেই অধিকাংশ মামলায় অপরাধীর সাজা হচ্ছে না, খালাস পেয়ে যাচ্ছে। এদিকে, নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনা কমিয়ে আনতে প্রতিটি থানায় ময়মনসিংহ রেঞ্জ পুলিশের ধর্ষণ প্রতিরোধ টিম কাজ শুরু করেছে।
ময়মনসিংহ বিভাগের চার জেলার আদালতের তথ্য মতে, গত এক বছরে নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের ৪৫০টি মামলার রায়ে মাত্র ৩১টির সাজা হয়েছে এবং আসামি খালাস পেয়েছে ৪১৯টিতে। এই হিসাবে সাজার হার শতকরা ৬ দশমিক ৮৮ শতাংশ। এর মধ্যে ময়মনসিংহ জেলায় ২১৬ মামলায় সাজা হয়েছে ৯টিতে এবং খালাস ২০৭টিতে। নেত্রকোনা জেলায় ৯২ মামলায় সাজা হয়েছে ১২টির এবং খালাস মামলার সংখ্যা ৮০টি। জামালপুর জেলায় ৭৪ মামলায় সাজা হয়েছে মাত্র একটির এবং খালাস হয়েছে ৭৩টি। এছাড়া শেরপুর জেলায় ৬৮ মামলার মধ্যে ৯টিতে সাজা এবং ৫৯ মামলা খালাস হয়েছে। সাজার হার কম এবং মামলা খালাশের পেছনে আপস-মীমাংসা এবং প্রসিকিউশনের দুর্বলতাকে দায়ী করেছেন সরকার পক্ষের আইনজীবীরা।
ময়মনসিংহ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিশেষ পিপি অ্যাডভোকেট বদর উদ্দিন জানান, মামলা দায়েরের পর দুই পক্ষের মধ্যে আপস-মীমাংসার কারণে মামলার রায়ে সাজা খুব কম হচ্ছে। এছাড়া মামলার প্রসিকিউশনে কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতিও এক্ষেত্রে দায়ী বলে দাবি করেছেন তিনি।
প্রকৃত অর্থে নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের মামলায় কখনও খালাস হয় না দাবি করে জেলা মানবাধিকার কমিশনের সভাপতি অ্যাডভোকেট এএইচএম খালেকুজ্জামান জানান, নারী নির্যাতনের অনেক মামলা সাধারণত পারস্পরিক শত্রুতা কিংবা নানান মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে হয়ে থাকে। পুলিশের মামলা তদন্ত করার ক্ষেত্রেও গাফিলতি আছে। একটি ধর্ষণের মামলায় ঘটনার পরপরই আলামত সংগ্রহ করা, সময়মতো ভিকটিমের মেডিক্যাল পরীক্ষা করানোসহ ডিএনএ টেস্ট করানোর কাজটি তদন্তকারী অফিসার যথাযথভাবে করেন না। এছাড়া মামলা দায়েরের পরপরই পুলিশ সন্তুষ্ট হয়ে কোনও একটি পক্ষের দিকে ঝুঁকে যায়। এর ফলে মামলায় আদালতে সাক্ষ্য-প্রমাণ যথাযথভাবে উপস্থাপিত হয় না। এসব কারণেই নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের মামলায় সাজা না হয়ে খালাস হচ্ছে বলে যাচ্ছে দাবি করেছেন তিনি।
এদিকে নারী নির্যাতন ও ধর্ষণ প্রতিরোধে ময়মনসিংহ রেঞ্জের প্রতিটি থানায় পুলিশ পরিদর্শকের (তদন্ত) নেতৃত্বে আট সদস্যের একটি ধর্ষণ প্রতিরোধ টিম গঠন করা হয়েছে। এই টিমে দুজন নারী পুলিশ সদস্যও আছেন। টিম থানা এলাকায় টহল দেওয়াসহ খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে ভিকটিমকে সব ধরনের সাপোর্ট দেওয়াসহ আসামিকে আটক করতে কাজ করবে। নারী নির্যাতন ও ধর্ষণ নিয়ন্ত্রণে এই টিমের সার্বক্ষণিক কাজ করার কথা রয়েছে।
তবে এসব মামলায় পুলিশের গাফিলতির বিষয়টি অস্বীকার করেন ময়মনসিংহ রেঞ্জ পুলিশের ডিআইজি ব্যারিস্টার হারুন অর রশিদ। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, মামলা দায়েরের পর তদন্ত কাজে স্বচ্ছতা আনতে ডিজিটাল পদ্ধতিতে রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয় থেকে তদন্তকারী কর্মকর্তার কার্যক্রমকে মনিটরিং করা হচ্ছে। এজন্য রেঞ্জ কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টারে ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিজিটাল মনিটরিং সিস্টেম চালু করা হয়েছে।
স্থানীয়ভাবে আপস-মীমাংসার কারণে নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের মামলায় সাজার হার খুব কম বলে জানান তিনি।








