করোনাকালে বগুড়ায় এনজিও এবং বিভিন্ন সমিতির কিস্তি আদায় বন্ধ হয়নি। সরকারি নির্দেশের পরেও সাপ্তাহিক কিস্তি আদায়কারীরা ঋণ গ্রহিতাদের ওপর চাপ অব্যাহত রেখেছেন। কিস্তি পরিশোধের তারিখে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ‘কাবুলিওয়ালা’র মতো আচরণ করছেন। তাদের চাপে গত এক মাসে বিষপানে শিশুকন্যাসহ মা এবং রডকাটার শান দিয়ে গলাকেটে এক গ্রিল মিস্ত্রি আত্মহত্যা করেন। গ্রিল মিস্ত্রির স্ত্রী আদালতে ছয় এনজিও’র ১১ কর্মকর্তা-কর্মীর বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেছেন। এছাড়া ধুনটে এনজিও ঋণ নিয়ে বিরোধে হতাশ স্বামী দা দিয়ে কুপিয়ে স্ত্রীকে হত্যা করেছেন। অনেক ঋণ গ্রহীতারা ফের কিস্তি আদায় বন্ধে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের নির্দেশ কামনা করেছেন।
তবে জেলা সমবায় কর্মকর্তা মাসুদ পারভেজ এসব ঘটনার কিছুই জানেন না। তিনি বলেন, কিস্তির চাপে কেউ আত্মহত্যা করেছেন বা কোনও খুনের ঘটনা ঘটেছে কিনা সে সম্পর্কে কিছু জানা নেই। অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কিস্তি আদায়ে চাপ না দিতে সরকারি মৌখিক নির্দেশনা ছিল। নতুন করে আর কোনও নির্দেশ আসেনি।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক জিয়াউল হক বলেন, কিস্তি আদায় বন্ধে সরকারের নির্দেশনা এখনও কার্যকর আছে কিনা সে বিষয়ে কিছু জানা নেই। খোঁজ নিয়ে পরে বলা সম্ভব হবে।
সরেজমিন জেলার বিভিন্ন স্থানে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দরিদ্র বিশেষ করে স্বল্প আয়ের মানুষ ব্যাংকে যেতে না পেরে বিভিন্ন এনজিও এবং সমিতির কাছে ঋণ গ্রহণ করে। এসব সমিতির মাঠকর্মীরা সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে সঞ্চয় ও কিস্তি আদায় করে থাকেন। অভাবের কারণে কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হলে সমিতির লোকজন তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। অনেক সময় হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে।
বগুড়া সদরের নওদাপাড়া এলাকার লেদমিস্ত্রি মহিদুল হাসান কিনু (৩০) ‘মেঘলা ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ’র জন্য কয়েকটি এনজিও থেকে তিন লাখ টাকার বেশি ঋণ নেন। করোনার কারণে তিনি ঠিকমতো কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হন। মাঠকর্মীদের চাপে তিনি দিশেহারা হয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে তিনি ও স্ত্রী বুলবুলি খাতুন (২০) তাদের ৬ বছর বয়সী শিশুকন্যা মেঘলা আকতার নিপুকে নিয়ে সহমরণের সিদ্ধান্ত নেন। গত ১০ নভেম্বর রাতে ওই দম্পতি বিষাক্ত গ্যাস ট্যাবলেট সেবন করেন। তারা তাদের একমাত্র মেয়ে নিপুকেও তা সেবন করান। তিন জন অসুস্থ হয়ে পড়লে রাত ৪টার দিকে তাদের বগুড়ার শজিমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দু’দিনে মা ও মেয়ে মারা যান। নিপু সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন।
সদর থানার ওসি হুমায়ুন কবির জানান, ঋণের কিস্তির চাপে এ আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। এ বিষয়ে থানায় ইউডি মামলা হয়েছে।
অন্যদিকে অ্যাডভোকেট রাশেদুর রহমান মরিস জানান, শাজাহানপুর উপজেলার চোপীনগর দক্ষিণপাড়া গ্রামের কৃষক লুৎফর রহমানের ছেলে বেলাল হোসেন (২৮) ওয়েল্ডিং ওয়ার্কশপের মালিক। তিনি ছয়টি এনজিও থেকে তিন লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ওয়ার্কশপ করেন। করোনাকালে ব্যবসায় মন্দাভাবে তিনি কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হন। সরকারি নির্দেশ অমান্য করে এনজিও’র লোকজন তাকে কিস্তি পরিশোধে চাপ দেয়। গত ১৫ সেপ্টেম্বর কিস্তি পরিশোধের দিন ছিল। কিস্তি পরিশোধের টাকা ধার না পেয়ে তিনি হতাশ হয়ে পড়েন। দুপুরে বাড়িতে প্রথমে বিষপান করেন। এরপর রড কাটার ইলেকট্রিক শান দিয়ে গলায় আঘাত করেন। বিকালে তিনি বগুড়া শজিমেক হাসপাতালে মারা যান।
এ ঘটনায় থানা মামলা না নেওয়ায় স্ত্রী হাসিনা খাতুন ১ অক্টোবর বগুড়ার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেন। আসামি করা হয়, সাজেদা ফাউন্ডেশনের মাঝিড়া শাখার ম্যানেজার মনিরুজ্জামান ও মাঠকর্মী মাজেদুল ইসলাম, রিয়েল সেভিংস অ্যান্ড ক্রেডিট কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডের দুবলাগাড়ী শাখার ম্যানেজার ফরহাদ হোসেন ও মাঠকর্মী জেসমিন আকতার, সোসাইটি ফর সোস্যাল সার্ভিসের নয়মাইল শাখার ম্যানেজার আমিরুল হাসান ও মাঠকর্মী মঞ্জুরুল ইসলাম, বাংলাদেশ এক্সটেনশন এডুকেশন সার্ভিসেসের মাঝিড়া শাখার ম্যানেজার সাইদুর রহমান ও মাঠকর্মী লাকী খাতুন, সোসিও ইকোনোমিক ব্যাংকিং অ্যাসোসিয়েশনের মাঝিড়া শাখার ম্যানেজার হেলাল উদ্দিন এবং টিএমএসএস’র মাঝিড়া শাখার ম্যানেজার আব্দুল মান্নান ও মাঠকর্মী নাহারকে।
বিচারক খালিদ মাহমুদ এ বিষয়ে তদন্ত করে ১০ জানুয়ারির মধ্যে প্রতিবেদন দিতে পিবিআইকে নির্দেশ দেন। এ বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা ইন্সপেক্টর আবু ওবাইদা বলেন, তদন্ত চলছে, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশ ছাড়া কিছু বলা সম্ভব নয়।
এছাড়া ধুনট উপজেলার চৌকিবাড়ি ইউনিয়নের পাঁচথুপি সরোয়া গ্রামে এনজিও থেকে নেওয়া ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এশারত আলী হতাশ হয়ে পড়েন। এ নিয়ে বাকবিতণ্ডার এক পর্যায়ে তিনি গত ১০ অক্টোবর রাতে স্ত্রী শেফালী খাতুনকে (৫২) বটি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেন। সকালে পুলিশ এশারত আলীকে শেরপুরের চান্দাইকোনা বাজার থেকে গ্রেফতার করে।
ধুনট থানার ওসি কৃপা সিন্ধু বালা জানান, কিস্তির টাকা পরিশোধ করা নিয়ে বিরোধেই এ হত্যার ঘটনা ঘটে।
এদিকে সোমবার সকালে বগুড়া শহরের সুলতানগঞ্জপাড়ায় গিয়ে দেখা গেছে, বাইসাইকেল নিয়ে সমিতির লোকজন বাড়ি বাড়ি ঘোরাঘুরি করছেন। গৃহবধূরা কিস্তির বই হাতে বের হয়ে আদায়কারীকে সঞ্চয় ও কিস্তির টাকা পরিশোধ করছেন। কেউ টাকা দিতে না পারলে সমিতির লোকজনকে খারাপ ব্যবহার করতে দেখা যায়।
এক গৃহবধূ জানান, তিনি সংসারের প্রয়োজনে শক্তি নামে একটি এনজিও থেকে ৩০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছেন। এক বছরে তাকে প্রতি সপ্তাহের সোমবার কিস্তি ৭৫০ টাকা ও সঞ্চয় ১০০ টাকা পরিশোধ করতে হয়। তবে তিনি এনজিও’র বিরুদ্ধে কিছু বলতে রাজি হননি।
অন্য গৃহবধূরা জানান, কিস্তি দিতে না পারলে সমিতির লোকজন তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। অনেক সময় বাড়ি থেকে জিনিসপত্র বের করে নিয়ে যাওয়ার হুমকি দেন।
ভুক্তভোগীরা এ করোনাকালে সমিতির কিস্তি আদায় বন্ধ রাখতে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন।








