মুক্তিযুদ্ধে হানাদারদের নির্মমতার ভয়ানক ইতিহাসের সাক্ষী খুলনার গল্লামারী। পাকিস্তান আমলে খুলনা রেডিও স্টেশনটি ছিল গল্লামারীতে। বর্তমানে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল অংশে ছিল এই রেডিও সেন্টার। এর একতলা মূল ভবনটি একাত্তরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অন্যতম প্রধান নির্যাতন কেন্দ্র ছিল। যুদ্ধের পুরো সময়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সদস্যরা অসংখ্য মানুষকে ধরে এনে মূল ভবনের ভেতরে এবং বাইরে গাছে ঝুলিয়ে নির্মমভাবে নির্যাতন করতো। তারপর রাতের অন্ধকারে গল্লামারীর মাঠে নিয়ে হত্যা করতো আর লাশ ফেলে রাখতো। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই ভবনটি এখন দ্বিতল ভবন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ ও প্রকাশনা বিভাগের দায়িত্ব প্রাপ্ত পরিচালক আতিয়ার রহমান জানান, এই ভবনের সামনে থাকা টিনশেডের এই ঘরটিও হানাদারদের টর্চার সেল হিসেবে ব্যবহৃত হত। যুদ্ধের সময়ের স্মৃতি হিসেবে এই টিনশেডের ঘরটি এখনও অবিকল তেমনই রাখা হয়েছে। শুধু রেডিও সেন্টারের সেই একতলা ভবনটি আধুনিকায়ন করাসহ দোতলা করা হয়েছে। বর্তমানে এখানের স্মৃতিময় কিছু কথা দিয়ে দ্বিতীয় গেটের বাইরে একাত্তরের আর্কাইভ ও যাদুঘর এর উদ্যোগে একটি স্মৃতিফলক স্থাপন করা হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণা করাসহ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নামে বইয়ের লেখক গৌরাঙ্গ নন্দী বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় গল্লামারীতে ময়ুর নদীর ওপর কোনও সেতু ছিল না। ছিল একটি পোল। তখন খুলনা-সাতক্ষীরা সড়কও হয়নি। এলাকাটি ছিল নির্জন। সরকারি রেডিও সম্প্রচার বন্ধ করা ও এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিতে হানাদাররা তৎকালীন সময়ের এই রেডিও সেন্টারের দখল নেয় এবং তাদের টর্চার সেলে পরিণত করে। মানুষকে ধরে নিয়ে এখানে ঘর ও ঘরের সামনে থাকা গাছে ঝুলিয়ে রেখে নির্যাতন করা হত। নির্যাতনের ফলে অনেকে মারা যেতেন। আবার অনেককে গুলি করে ও বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে অথবা জবাই করে হত্যা করা হত। পরে তাদের লাশ গল্লামারী এলাকার বিলের স্রোতে ভাসিয়ে দেওয়া হত। স্বাধীন হওয়ার পর রেডিও সেন্টারের ভবন ও টিনশেডের ওই ঘরে অনেকেই নির্যাতিতদের রক্তমাখা জামা কাপড় ও ব্যবহার্য নানা জিনিসপত্র দেখেছেন।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. ফায়েক উজ্জামান বলেন, গল্লামারীসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের এ এলাকা মুক্তিযুদ্ধের নির্মমতার ভয়াবহ ইতহাস বহন করছে।
খুলনা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ হারুনুর রশীদ বলেন, মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহ ঘটনার সাক্ষী সমগ্র গল্লামারী এলাকা। এই এলাকাতেই পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়। এ এলাকার প্রতিটি মাটি কনায় হানাদারদের নির্যাতনের স্মৃতি রয়েছে। এসব কারণে গল্লামারী বধ্যভূমি প্রকল্পটি পূর্ণাঙ্গ হওয়া সময়ের দাবি।








