যে কোনও উন্নয়নমূলক কাজের সঙ্গে রয়েছে রাজশাহী জেলা পরিষদ। রাজশাহীবাসীর বৃহত্তর স্বার্থে এক হয়ে সিটি মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন ও সদরের সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশাসহ সবার সঙ্গে কাজ করতে চায় জেলা পরিষদ। বৃহস্পতিবার (১৭ ডিসেম্বর) দুপুরে রাজশাহী জেলা পরিষদের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী সরকার।
জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বলেন, সার্ভে ইনস্টিটিউটের পরিত্যক্ত জায়গায় মার্কেট নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়। সেটি ২০১৮ সালের ১১ ফেব্রুয়ারির মাসিক সভার সিদ্ধান্ত। এরপরে ২০১৯ সালে ৭ জানুয়ারির সভায় ওই স্থানে ‘রাজশাহী কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার’ নির্মাণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। পরে একই বছরের ২৪ ডিসেম্বর জেলা পরিষদের আয়বৃদ্ধির পদক্ষেপ হিসেবে সার্ভে ইন্সটিটিউটের জায়গায় একটি বহুতল মার্কেট ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়।
তিনি আরও বলেন, ২০২০ সালের ১৫ ডিসেম্বর নগরবাসীর দাবি এবং সংসদ সদস্য ও সিটি মেয়রের সম্মতি ও প্রত্যাশায় নগরের প্রাণকেন্দ্রে সোনাদিঘির পাড়ে জেলা পরিষদ রাজশাহীর মালিকানাধীন পুরাতন সার্ভে ইন্সটিটিউটের জায়গায় জেলা পরিষদের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় ও অর্থায়নে দৃষ্টিনন্দন ‘রাজশাহী কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার’ নির্মাণের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান জানান, সিঅ্যান্ডবি মোড়ে জেলা পরিষদের জমিতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরাল নির্মাণের জন্য ১৯.৬৩ শতাংশ জমি প্রদানের সিদ্ধান্ত হয় ২০২০ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির সভায়। এর আগে সিটি মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন ও সাংসদ বাদশা জেলা পরিষদে এসে তাদের অভিমত ব্যক্ত করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে সিঅ্যান্ডবি মোড়ে জেলা পরিষদের জমিতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরাল নির্মাণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
তিনি বলেন, শহীদ মিনার নির্মাণে সরকারের সিদ্ধান্তÍই ফলো করা হবে। সরকারকে জানানো হয়েছে, সরকারের যে নির্দেশনা আসবে সে মোতাবেক কাজ করা হবে।
সংবাদ সম্মেলনে রাজশাহী জেলা পরিষদের সদস্য জয়জয়ন্তি সরকার মালতি, নারগীস বিবি, শিউলি রানি সাহা, আবুল ফজল প্রামাণিক, আসাদুজ্জামান মাসুদ, গোলাম মোস্তফা উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে রাজশাহীতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে। বুধবার (১৬ ডিসেম্বর) বিজয় দিবসের সকাল ১১টায় রাজশাহী মহানগরীর প্রাণকেন্দ্র সোনাদিঘি এলাকায় ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড সার্ভে ইনস্টিটিউটের পরিত্যক্ত জায়গায় এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি ও ভাষাসৈনিক বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট গোলাম আরিফ টিপু। এরপর তিনি সেখানে একটি প্রতীকী শহীদ মিনারে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পরে সেখানে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, রাজশাহী মহানগর উদ্যোগে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। এরপর বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার অসংখ্য মানুষ শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
শ্রদ্ধা নিবেদনের পর ১৪ দল, রাজশাহীর উদ্যোগে সেখানে একটি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে বক্তব্য রাখেন ১৪ দল, রাজশাহীর সমন্বয়ক, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, রাজশাহী মহানগরের সভাপতি ও রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র এ.এইচ.এম খায়রুজ্জামান লিটন, রাজশাহী সদর আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা, ভাষাসৈনিক আবুল হোসেন, ভাষাসৈনিক মোশাররফ হোসেন আখুঞ্জি, বীর মুক্তিযোদ্ধা ড. শামসুল আলম বীর প্রতীক প্রমুখ।
সমাবেশে মেয়র এ.এইচ.এম খায়রুজ্জামান লিটন বলেন, রাজশাহীতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার আরও অনেক আগে স্থাপিত হওয়া উচিত ছিল। দেরিতে হলেও আজকে এই শহীদ মিনার উদ্বোধনের মধ্যে দিয়ে রাজশাহী আপামর জনতা তাদের দাবি দাওয়া আদায়ের লক্ষ্যে এই জায়গাকে সবসময় ব্যবহার করতে পারবে। এটা রাজশাহীবাসীর প্রাণের দাবি ছিল। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার স্থাপিত হওয়ার মধ্যে দিয়ে নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়ন হলো।
মেয়র লিটন আরও বলেন, শহীদ মিনার একটা আবেগের জায়গা। এখানে সভা-সমাবেশ হবে। মানুষ এসে তার মনের কথা বলবে। ঢাকায় যেমন বিশিষ্ট কোনও ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করলে তার মরদেহ শহীদ মিনারে রেখে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করা হয়, তাকে শেষ বিদায় জানানো হয়, এখানেও তেমন হবে। দ্রুতই সবাইকে নিয়ে সভা করে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় হাত দেবো।
মেয়র লিটন আরও বলেন, রাজশাহীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারটি দৃষ্টিনন্দন ও উন্মুক্ত পরিবেশ। সারাবছর এটি খোলা থাকবে। জনগণের দাবি আদায়ের কেন্দ্রবিন্দু হবে। আসুন এখনও যদি শহীদ মিনারের ব্যাপারে দ্বিমত থাকে, আমাদের সাথে বসতে পারেন। তবে রাজশাহীর মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সকল মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়েছে, আমরা একজোট হয়েছি। আগামী ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে ভাষা শহীদদের স্মরণ করা হবে।
ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও রাজশাহী-২ আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, জেলা পরিষদ এখন নিজেদের টাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নির্মাণের কথা বলছে। কিন্তু টাকা তো চাইতে হবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে। সে টাকা আগেই প্রধানমন্ত্রী আমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। একবার ট্রেন প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে এলে সেই ট্রেন ঘুরে এসে আবার নতুন করে ছাড়ে না। অতএব, সেইসমস্ত বক্তব্য অবান্তর, অবাস্তব, অরাজনৈতিক, মুক্তিযুদ্ধ এবং ভাষা আন্দোলনের প্রতি অবমাননাকর এমনকি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর জন্য অবমাননাকর।
ফজলে হোসেন বাদশা আরও বলেন, রাজশাহীতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হতে আমরা দেব না। এটা আমাদের দৃঢ় প্রতিজ্ঞা। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার বাস্তবায়নের জন্য মাননীয় সিটি মেয়র মিটিং ডাকবেন। সংসদ সদস্য হিসেবে আমি এই মিটিংয়ে যাবো। মাননীয় মেয়রের এই উদ্যোগকে আমি পূর্ণাঙ্গভাবে সমর্থন করি। ভাষা আন্দোলনের সময় যারা রাজশাহী কলেজে প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণ করেছিলেন, তারা আজ ২০২০ সালে এসেও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নির্মাণের জন্য এখানে এসেছেন। তাই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এখানে হবে, কেউ বাধা দিতে পারবেন না।
রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকার বলেন, রাজশাহীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার আমাদের অহঙ্কার। আজকের এই দিনে শহীদ মিনার স্থাপনের যাত্রায় শামিল হতে পেরে আনন্দ বোধ করছি। আশা করি, রাজশাহীবাসীর প্রাণের এই দাবি খুব দ্রুত বাস্তবায়ন হতে চলেছে। এই শহীদ মিনারের চত্বরে দাঁড়িয়ে রাজশাহীর রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের মনের ভাব প্রকাশের স্থান হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে।








