রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিম উল্লাহর বিতর্কিত কর্মকাণ্ড অব্যাহত রয়েছে। বছরের পর বছর ক্যাম্পাসে না আসা, গোপনে পেছনের দরজা দিয়ে চলে যাওয়ার ঘটনার পর এবার তার সঙ্গে ঢাকায় লিয়াজোঁ অফিসে দেখা করে ফটোসেশন না করায় বিভাগীয় প্রধানের পদটি হারালেন শিক্ষক উমর ফারুক বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ নিয়ে উপাচার্য ও শিক্ষক উমর ফারুকের ফোনালাপের একটি অডিও ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে।
ফাঁস হওয়া ফোনালাপ থেকে জানা যায়, উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং বিভাগের শিক্ষক উমর ফারুককে ফোন দিয়ে ঢাকায় তার সঙ্গে দেখা এবং ফটোসেশন করে নিয়োগপত্র নেওয়ার কথা বলেন। ঢাকায় গিয়ে নিয়োগপত্র নেওয়ার ব্যাপারে অপারগতা প্রকাশ করার পরপরই তাকে বাদ দিয়ে একই বিভাগের শিক্ষক আমির শরীফকে বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব দেন উপাচার্য।
ফাঁস হওয়া ফোনালাপ অনুযায়ী, উপাচার্য শিক্ষক উমর ফারুককে ফোনে বলেছেন, রবিবার তার ঢাকা অফিসে দেখা করতে এবং ফটোসেশন করে বিভাগীয় প্রধানের কাগজ নিয়ে যেতে। কিন্তু তিনি বারবার উপাচার্যকে বোঝাতে চেয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এবং তার কার্যালয় থাকার পরও কেন তার সঙ্গে ফটোসেশনে অংশ নিতে ঢাকায় যেতে হবে।
এ ব্যাপারে সহযোগী অধ্যাপক উমর ফারুক জানান, এ ঘটনায় তার নাম থাকায় ভীষণ বিব্রতবোধ করছেন। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, বিভাগীয় প্রধান হিসেবে তিনি এক নম্বরে ছিলেন। কেন তাকে বাদ দেওয়া হলো সেটা তিনি জানেন না।
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অ্যাকাউন্টিং বিভাগের দুজন শিক্ষক জানিয়েছেন, এবার যাকে বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সেই আমির শরীফ এর আগে এ দায়িত্ব পালন করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী একজন শিক্ষক তিন বছর বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব পালন করতে পারেন। এরপর আরেকজন এ দায়িত্ব পান। সে হিসেবে উমর ফারুক ছিলেন এক নম্বরে। এছাড়াও আরও কমপক্ষে ৫ জন শিক্ষক বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব পালন করার পর শিক্ষক আমির শরীফের এ দায়িত্ব পাওয়ার কথা। যেহেতু উপাচার্যের কথামতো ঢাকায় যাননি উমর ফারুক এবং তার সঙ্গে ফটোসেশনে অংশ নেননি, এ কারণে তাকে বাদ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি খুবই দুঃখজনক।
এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের জেন্ডার অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের প্ল্যানিং কমিটিতে অবৈধভাবে একাই দুই সদস্যের পদ নিয়ে প্ল্যানিং কমিটির অন্য সদস্যের স্বাক্ষর ছাড়াই নিয়োগ বোর্ড সম্পন্ন করে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে উপাচার্যের বিরুদ্ধে। বিভাগটির শিক্ষকদের অভিযোগ, প্ল্যানিং কমিটির কোনও সভা ছাড়াই ভিসি শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছেন। এমনকি প্ল্যানিং কমিটির অন্য সদস্যের অগোচরেই এই নিয়োগ হয়েছে। যোগ্য শিক্ষক থাকার পরও সম্পূর্ণ অবৈধভাবে বিভাগটির বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্বও নিয়ে রেখেছেন উপাচার্য।
শিক্ষকদের আরও অভিযোগ, কয়েকটি বিভাগের বিভাগীয় প্রধানের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরে বিভাগীয় প্রধান নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে না। এর কারণ হিসেবে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে যেসব শিক্ষকের বিভাগীয় প্রধান হওয়ার কথা তাদের অনেকেই ভিসির দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলার জন্য বিভাগীয় প্রধানের পদ দেওয়া হচ্ছে না।
এ ব্যাপারে রসায়ন বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান সহযোগী অধ্যাপক তারিকুল ইসলাম বলেন, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি করতে উপাচার্য একক পরিচালনায় লিখিত পরীক্ষা চালু করেছেন। বাছাই বোর্ডকে পাশ কাটিয়ে সব বিভাগের নিয়োগ লিখিত পরীক্ষায় একাই প্রশ্ন করেন, একাই উত্তরপত্র মূল্যায়ন করেন। বাছাই বোর্ডের সদস্যদের নামমাত্র কন্ট্রিবিউশনে উপাচার্যের দেওয়া লিখিত পরীক্ষার নম্বরের ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয় শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী।
এ ব্যাপারে বঙ্গবন্ধু শিক্ষক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মশিউর রহমান বলেন, উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ে না এসে ঢাকায় লিয়াজোঁ অফিসে বসে নিয়োগ বাণিজ্য, স্বেচ্ছাচারিতা, অনিয়ম-দুর্নীতি করছেন।
অধিকার সুরক্ষা পরিষদের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মতিউর রহমান বলেন, যেহেতু ভিসির মেয়াদ আর কিছু দিন পরেই শেষ হয়ে যাবে, তাই তিনি আগে যে অনিয়মগুলো করছিলেন, সেসব কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়াভাবে শুরু করেছেন।
শিক্ষক সমিতির সাবেক সভাপতি ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, ভিসি ক্যাম্পাস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার কারণে তিনি যেসব সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আইন-রীতি কোনও কিছুই অনুসরণ করছেন না।
সার্বিক বিষয়ে জানতে উপাচার্যের মোবাইলে কয়েক দফা ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।









