১৯৭১ সারের ১৯ মার্চ, দেশ যখন অসহযোগ আন্দোলনে উত্তাল তখন গাজীপুরের শান্তিকামী জনতা স্বাধীনতার জন্য পাকিস্তানি হানাদারদের মুখোমুখি হয়ে প্রতিরোধ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। শহীদ হন নেয়ামত, হুরমত ও মনু খলিফা। তাই স্বাধীনতার ইতিহাসের এ দিনটি গাজীপুর তথা দেশবাসীর একটি গৌরবময় দিন। দিনটিকে জাতীয়ভাবে পালনসহ শহীদ পরিবারদের সদস্যদের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার দাবি উঠেছে।
স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মার্চের প্রথম দিকে দুই ধাপে জয়দেবপুর মুক্তি সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। প্রয়াত হাবিব উল্লাহ এমপির নেতৃত্বে প্রয়াত মণিন্দ্রনাথ কুমার গোস্বামী ও প্রয়াত শ্রমিক নেতা এমএ মুত্তালিবকে সদস্য করে ৩ সদস্যের হাইকমান্ড এবং বর্তমান মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হককে আহ্বায়ক করে অ্যাকশন কমিটি গঠন করা হয়। গাজীপুরের তৎকালীন নাম ছিল জয়দেবপুর। ১৯৭১ সালে জয়দেবপুর সেনানিবাসের ভাওয়াল রাজবাড়িতে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট কার্যালয় ছিল। সেখানে ২৫-৩০ জন ছাড়া সবাই ছিলেন বাঙালি সেনা কর্মকর্তা। পাকিস্তানিরা বাঙালি দমনের নীল নকশা নুযায়ী ১৫ মার্চের মধ্যে অস্ত্র জমা দেওয়ার নির্দেশ দেয়। বাঙালি সেনারা রাজি না হলে ১৯ মার্চ সকালে ঢাকা ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জাহানজেব অস্ত্র ও গোলা বারুদ নিতে জয়দেবপুর সেনানিবাসে আসেন। এ খবর জানাজানি হলে গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকা থেকে জনতা, লাঠি, তীর-ধনুক নিয়ে জয়দেবপুর বটতলায় জড়ো হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলে। ওই প্রতিরোধযুদ্ধে মনু খলিফা, কিশোর নিয়ামত, ফুটবলার হুরমত আলী ও কানু মিয়া শহীদ হন। আহত হন আরও অনেকে। জয়দেবপুরে হানাদারদের সঙ্গে এ সম্মুখ যুদ্ধে সারাদেশে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। সমগ্র বাংলাদেশে স্লোগান উঠে ‘জয়দেবপুরের পথ ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’।
১৯৭১ সনের ১৯ মার্চ জয়দেবপুর থেকে অস্ত্রসস্ত্র নিয়ে যাওয়ার সময় ছাত্র-জনতার প্রতিরোধ ঘটনার বর্ণনা দেন প্রত্যক্ষদর্শী ও প্রতিরোধে অংশ নেওয়া নুরুজ্জামান আকন্দ। তিনি তৎকালীন গাজীপুরের ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী ছিলেন। জয়দেবপুরের নিহত কিশোর নেয়ামত আলীর বাবা কাশেম আলী ইজারাদারের বাড়িতে লজিং থেকে ওই কলেজে পড়াশোনা করেন। এসময় কাশেম আলী ইজারাদারের ছেলে গোলন্দাজের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব গড়ে উঠে। নূরুজ্জামান আকন্দ বর্তমানে পীরে কামেল ও মাইজভান্ডার দরবার শরিফের অওলাদে রাসুল (সা.) সৈয়দ শফিউল বশর মাইজভান্ডারীর খলিফা।
ওই দিনের লোমহর্ষক ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, বেলা আনুমানিক ১১টার দিকে রাণী বিলাসমনি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা চান্দনা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে জয়দেবপুর থেকে পাকিস্তানি বাহিনীর অস্ত্র নিয়ে যাওয়ার ঘটনা জানায়। পরে ওই দুই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসহ আশপাশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি আসে। ওইসময় কলেজের ভিপি ছিলেন আসকর আলী সরকার। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে সংবাদ পেয়ে ভিপি আসকর আলী সরকার, মাইরাল চেয়ারম্যানের ছেলে দেলোয়ার হোসেন, ছাত্রনেতা নিয়ত আলী ওরফে আমজাদসহ তারা সব নেতাকর্মী, শিক্ষার্থী একযোগে জয়দেবপুরের উদ্দেশে রওনা হন। ততক্ষণে পাকিস্তানি বাহিনী অস্ত্র-গোলাবারুদ নিয়ে রাজবাড়ী ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে পড়ে। অস্ত্রশস্ত্রসহ কমপক্ষে ১৫টি জিপ গাড়িতে করে দুপুর আনুমানিক ১টার দিকে পাকিস্তানি বাহিনীর সদস্যরা রাজবাড়ি থেকে বের হয়। ওইসব নেতাকর্মী শিক্ষার্থীরা রাজবাড়ি সড়কের বর্তমান পোস্ট অফিসের সামনে অবস্থান নেয়। প্রতিরোধের মুখে পড়ে হানাদার বাহিনী। দুই পক্ষের মধ্যে দূরত্ব ছিল আনুমানিক ৫০০ ফুট। ছাত্র-জনতা অবরোধে অনড় থাকলে পাকিস্তানি বাহিনীর সদস্যরা গুলি চালাতে বাধ্য হবে বলে ঘোষণা দেয়। এক পর্যায়ে একটি বাঁশির আওয়াজ শোনা যায়। তাৎক্ষণিক পাকিস্তানি বাহিনীর সদস্যরা গাড়ি থেকে লাফিয়ে নেমে অবরোধকারীদের লক্ষ্য করে সড়কের দুই পাশে অস্ত্র তাক করে অবস্থান নেয়। এবারও অবরোধ তুলে নিতে অনুরোধ করে। কিছুক্ষণ পর আবারও আরেকটি বাঁশির আওয়াজ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মুহুর্মুহু গুলি ছোড়ে হানাদার বাহিনীর সদস্যরা নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শী ও প্রতিরোধযোদ্ধা নূরুজ্জামান আকন্দ জানান, এসময় তার বাম পাশের এক শিক্ষার্থীর উরুতে গুলি লেগে ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে। ছাত্র-শিক্ষার্থী দিদ্বিদিক ছোটাছুটি শুরু করে। গুলির আওয়াজের মধ্য দিয়েই জয়দেবপুর বাজারের অলিগলি দিয়ে ছাত্র-জনতা ছোটাছুটি করে। মনু খলিফা, কিশোর নিয়ামত (বন্ধুর ছোট ভাই), ফুটবলার হুরমত আলী ও কানু মিয়াসহ বেশ কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হন। পরে তার বন্ধু গোলন্তাজকে সঙ্গে নিয়ে জয়দেবপুর বাজার থেকে গুলিবিদ্ধ কিশোর নেয়ামতকে উদ্ধার করে বিআইডিসি সড়কের একটি ডিসপেন্সারিতে নিয়ে যান। সেখানে পল্লী চিকিৎসক গুলিবিদ্ধ কিশোর নেয়ামতকে মৃত ঘোষণা করেন। একইসঙ্গে নিহত হন মনু খলিফা, ফুটবলার হুরমত আলী ও কানু মিয়া।
এদিকে জয়দেবপুর বটতলা ব্যারিকেড ভেঙে ঢাকায় যাওয়ার পথে পাকিস্তানি সেনারা চান্দনা চৌরাস্তায়ও শক্ত প্রতিরোধের মুখে পড়ে। এখানেও পাকিস্তানি সেনারা নির্বিচারে গুলি চালায়। এসময় ভোগড়া গ্রামের সাহসী যুবক ফুটবলার হুরমত আলী এক হানাদার সেনার রাইফেল ছিনিয়ে নিতে গিয়ে অপর এক সেনার গুলিতে শহীদ হন।
শহীদ নিয়ামতের ভাই কেরামত আলীর অভিযোগ, স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও তাদের দৈন্য দশা কাটেনি। এখনও টিকে আছে শহীদ নিয়ামত আলীর রেখে যাওয়া মাটির ঘর। তিনি জানান, ১৯ মার্চ নগরের জয়দেবপুরের তাদের মারিয়ালি এলাকা থেকে তার ভাই নেয়ামতসহ গ্রামের বীর জনতা প্রতিরোধ স্থলে যান মিছিল নিয়ে। দাফন হয়েছে তাদের পারিবারিক কবরস্থানে। মনু খলিফাকেও দাফন করা হয় এক সঙ্গে।
তৎকালীন মুক্তি সংগ্রাম পরিষদের সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সাত্তার মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে সাংবাদিকদের বলেন, বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে সেদিন বীর বাঙালি পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করে। কিন্তু স্বাধীনতার এত বছর পরও দিনটিকে জাতীয়ভাবে পালন করা হচ্ছে না। বীরত্বগাঁথা সেদিনটিকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় পালনের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদের কাছে জোর দাবি করে শহীদ পরিবারের সদস্যদের যথাযথ সম্মান দেয়ার আহ্বান জানান তিনি।
শহীদ পরিবারের লোকজন জানান, স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও শহীদদের স্বজনদের দিন কাটছে নানা কষ্টে। শহীদ পরিবারের নামে বরাদ্দ করা জমি, সুবিধাদি দেওয়াসহ তাদের রয়েছে নানা দাবি। অবশ্য ১৯ মার্চের প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে চান্দনা চৌরাস্তায় নির্মাণ করা হয়েছে স্মারক ভাস্কর্য ‘জাগ্রত চৌরঙ্গী’ এবং জয়দেবপুর বটতলায় ‘মুক্তমঞ্চ’। প্রতি বছর পরম শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় গাজীপুরবাসী এ দিনটি উদযাপন করেন। এবারও রয়েছে নানা আয়োজন।
এ ব্যাপারে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী মন্ত্রী বলেন, ১৯ মার্চ জাতির জন্য ঐতিহাসিক একটি দিন। দিবসটি জাতীয়ভাবে পালনের জন্য বিভিন্ন মহল থেকে দাবি ওঠেছে। ভবিষ্যতে এটি জাতীয়ভাবে পালনের যেন স্বীকৃতি পেতে পারে সে চেষ্টা চলছে।








