মোংলা বন্দরের পশুর চ্যানেলে ড্রেজিং প্রকল্পের বালু ডাম্পিং ইস্যুতে চীনা কোম্পানি-বন্দর কর্তৃপক্ষ ও গ্রামবাসী মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে। কৃষি জমি ও মৎস্য খামারের ক্ষতিপূরণ না দিয়ে জোর করে ডাইক নির্মাণ ও বালু ডাম্পিং প্রচেষ্টার অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। সোমবার (৫ এপ্রিল) সকাল ৯টায় থেকে দুপুর ১২টা নাগাদ নারী-পুরুষসহ শত শত গ্রামবাসী তাদের ফসলি জমি ও চিংড়ি ঘের রক্ষার দাবিতে সমবেত হন পশুর নদীর তীরবর্তী চিলা ইউনিয়নের সুন্দরতলা এলাকায়। এ সময় মানববন্ধন সমাবেশসহ সংবাদ সম্মেলনে গ্রামবাসীর পক্ষে মো. আলম গাজী লিখিত বক্তব্যে নানা অভিযোগ উত্থাপন করেন।
গ্রামবাসীরা বলছেন, ফসলি জমি ও জলাভূমির শ্রেণিবিন্যাশে হুমকির মুখে পড়বে জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয়দের জীবন-জীবিকা। আর চলতি ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের মৌসুমে উড়ো বালুর আগ্রাসনে বসবাসের অনুপযোগী পরিবেশের শঙ্কায় চরম হতাশার মধ্যে পড়েছেন শত শত গ্রামবাসী। তাদের দাবি, বন্দর কর্তৃপক্ষ ও চীনা কোম্পানি পূর্ব পরিকল্পনা ছাড়াই নামমাত্র ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দিয়ে ফসলি জমি ও মৎস্য ঘেরে বালু ডাম্পিং প্রচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে। এ অবস্থায় জমির মালিক-সাধারণ মানুষ বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন।
লিখিত বক্তব্যে মো. আলম গাজী বলেন, ‘বন্দর কর্তৃপক্ষ ও ড্রেজিং কাজে নিয়োজিত চীনা কোম্পানি জমির মালিকদের কিছু না জানিয়ে কৃষি জমি-মৎস্য ঘের শুকিয়ে বালু ডাম্পিং করার জন্য গত দু’সপ্তাহ ধরে ডাইক নির্মাণ শুরু করেছে। পরে তারা এ বিষয়ে আপত্তি জানালে ১০ বছরের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে আসছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু কৃষি-মৎস্য ঘেরের জমিতে বালু ডাম্পিং করা হলে জীবন-জীবিকার উৎস বন্ধ হবে।’
গ্রামবাসী জানান, যে জমিতে তারা ধান উৎপাদন করেন সেই একই জমিতে মৎস্য চাষ করে সংসার চালাতে হয়। তাই ধান উৎপাদন ও মাছের চাষ বন্ধ হলে বেকারত্বসহ নানা সমস্যায় পথে বসবে অসংখ্য পরিবার। এ ছাড়া বালু ভরাটের কারণে আগামী ৫০ বছরের জন্য চরম দুরবস্থা এবং আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে স্থানীয় বাসিন্দাদের। তাই ফসলি ও মৎস্য চাষের জমিতে নদী ড্রেজিংয়ের বালু ডাম্পিংয়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন জমির মালিক ও গ্রামবাসী। আর এ জন্য কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা। এ অবস্থায় বন্দর কর্তৃপক্ষ-চীনা ড্রেজিং কোম্পানির মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছেন তারা।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন-বাপার বাগেরহাট জেলা সমন্বয়কারী নুর আলম শেখ বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দাদের মতামত নিয়ে প্রকল্প গ্রহণ করা উচিত। আলোচনা ছাড়াই প্রকল্প গ্রহণ ঠিক হয়নি। জমির মালিকদের যে ১০ বছরের ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে সেক্ষেত্রে জটিলতা রয়েছে। এ ছাড়া দীর্ঘ সময়ের জন্য ফসলসহ পরিবেশগত ক্ষতির মুখে পড়বেন ফসলি জমির মালিক ও সাধারণ মানুষ।’
এ বিষয় মোংলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কমলেশ মজুমদার জানান, ড্রেজিং প্রকল্পের বালু ডাম্পিং করার জন্য ১০ ফুট উচ্চতার ডাইক নির্মাণ ও আট ফুট পর্যন্ত বালু ভরাট করার কথা থাকলেও অতিরিক্ত উচ্চতায় করা হচ্ছে। এ ছাড়া এলাকাবাসীর উত্থাপিত নানা অভিযোগের ভিত্তিতে উপজেলা ভূমি কর্মকর্তাকে সঙ্গে নিয়ে সরেজমিন পরিদর্শনে অনেক অসঙ্গতি পাওয়া যায়। এ সব বিষয় জেলা প্রশাসককে অবগত করা হয়েছে।
মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ সূত্র জানায়, ৭৯৪ কোটির টাকা ব্যয়ে মোংলা বন্দরের পশুর চ্যানেলের ইনার বার ড্রেজিং প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। আর ড্রেজিং প্রকল্পের কাজের জন্য দুটি চীনা কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। গত ১৩ মার্চ থেকে শুরু হয়েছে নদী খননের কাজ। নদী খননের বালু ডাম্পিং করার জন্যে এক হাজার একর ফসলি জমি ও মৎস্য ঘের এলাকা ক্ষতিপূরণ দিয়ে নেওয়া হবে। এ ছাড়া ৫শ’ একর সরকারি খাস জমি চিহ্নিত করা হয়েছে।
নদীর বালু ডাম্পিং বিষয়ে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী (সি ও হা) ড্রেজিং প্রকল্প কর্মকর্তা শওকত আলী জানান, জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে জমির প্রকৃত মালিক ও ক্ষতিগ্রস্তদের ১০ বছরের জন্য ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে তালিকা প্রণয়নসহ প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ রয়েছে। শিগগিরই প্রকৃত জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণের অর্থ প্রদান করা হবে। সুবিধাভোগীরা এ নিয়ে নানা চক্রান্ত করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।









