নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুনের ঘটনার মামলার চার্জশিটে ‘মারাত্মক ত্রুটি’ রয়েছে- হাইকোর্টের এমন মন্তব্যে আবারও ‘আলোর পথ’ দেখছে বাদী পক্ষের আইনজীবী। চার্জশিটের বিরুদ্ধে না-রাজি আবেদনে যে ৮টি ত্রুটির কথা স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছিল তার যুক্তিকথাও তুলে ধরছেন তারা। তবে পুলিশ আবারও দাবি করেছে, তাদের চার্জশিট শতভাগ নির্ভুল।
নিহতের পরিবারগুলো বলছে, আমরা আশা করি উচ্চ আদালতে ন্যায়বিচার পাব। কারণ চার্জশিটে অনেক আসামির নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। আবার নূর হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদ না করে এত বড় একটি ঘটনায় চার্জশিট গ্রহণযোগ্য নয়। নূর হোসেনের পক্ষে নেপথ্যে কারা কাজ করতো, র্যাবকে দেওয়া ৬ কোটি টাকার লেনদেনসহ আরও অনেক বিষয় উহ্য রয়ে গেছে চার্জশিটে। এ ছাড়া গ্রেফতারকৃত আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক জিয়াউল আহসানসহ অনেকের নাম আসলেও তাদের আসামি করা হয়নি।
এক মামলার না-রাজি
সাত খুনের ঘটনায় নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি ও নিহত অ্যাডভোকেট চন্দন সরকারের জামাতা বিজয় পাল পৃথক দুটি মামলা দায়ের করেন। এর মধ্যে বিউটির মামলায় নূর হোসেনসহ ৬ জনকে অভিযুক্ত ও বিজয় পালের মামলায় অজ্ঞাত আসামি করা হয়। ঘটনার ১১ মাস পর গত ৮ এপ্রিল মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সংস্থা জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) দুটি মামলায় অভিন্ন চার্জশিটে নূর হোসেন, র্যাব কর্মকর্তাসহ ৩৫ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট জমা দেয়। তাদের মধ্যে ২৩ জন গ্রেফতার রয়েছে আর ১২জন পলাতক।
তবে বিউটির মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় এজাহারভুক্ত ৫ আসামি- সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সেক্রেটারি হাজী ইয়াছিন মিয়া, ইকবাল, হাসমত আলী হাসু, থানা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক আমিনুল হক রাজু ও শ্রমিক দল নেতা আনোয়ারকে। এ ঘটনায় ১১ মে আদালতে সেলিনা ইসলাম বিউটি চার্জশিটের বিরুদ্ধে না-রাজি প্রদান করেন। পরে ৮ জুলাই শুনানিতে চার্জশিটের বিরুদ্ধে না-রাজি আবেদন খারিজ করে দেন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত। এরপর ২১ জুলাই জজ কোর্টে না-রাজি রিভিশন পিটিশন দায়ের করেন সেলিনা ইসলাম বিউটি। গত ৯ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ এনায়েত হোসেন না-রাজি খারিজের বিরুদ্ধে রিভিশন খারিজ করে দেন। পরে উচ্চ আদালতে যান বিউটির আইনজীবীরা।
হাইকোর্টের মন্তব্য
সাত খুনের মামলার অভিযোগপত্রে (চার্জশিট) মারাত্মক ভুল আছে বলে জানিয়ে হাইকোর্টের বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম বলেন, ‘এ মামলার চার্জশিটে একটি মারাত্মক ত্রুটি আছে। আমি জানি, কিন্তু এখন বলবো না, খুঁজে বের করেন। নতুন করে অধিকতর তদন্ত করতে এবং এ আবেদনের আদেশের দিন দেরি করে না নেওয়াই ভালো।’ আইনজীবীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘এ মামলার আসামি যারা ভেতরে আছে তারা সুবিধা পেতে পারে, এ কথাগুলো মাথায় রেখে কাজ করবেন।’
ত্রুটি
বিউটির মামলার আইনজীবী সাখাওয়াত হোসেন খান জানান, ৯ পৃষ্ঠার না-রাজি দরখাস্তে উল্লেখ করা হয়েছে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা চার্জশিটে কিছু মৌলিক ভুল করেছেন। নূর হোসেন তার ৫ ভাইকে নিয়ে হত্যার পরিকল্পনা করেছেন। অথচ তাদের নাম চার্জশিটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে আরও ১৬ জনের নাম আসলেও তাদের নাম আসেনি চার্জশিটে। এজাহারভুক্ত ৫ আসামিকেও অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
চার্জশিটের ত্রুটি প্রসঙ্গে আদালতে দায়ের করা না-রাজি আবেদনে বেশ কয়েকটি কারণ উল্লেখ করা হয়।
১। ২০১৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারি সকাল ১০টার দিকে এজাহারে থাকা আসামি কাউন্সিলর নূর হোসেনের নেতৃত্বে প্রকাশ্যে তার লোকজন নিয়ে নিহত নজরুলের বাসার সামনে অস্ত্র হাতে মহড়া দেয়। উক্ত মহড়ায় অত্র মামলার এজাহারভুক্ত আসামি হাজী ইয়াসিন মিয়া, হাসমত আলী হাসু, আমিনুল ইসলাম রাজু, আনোয়ার হোসেন আশিক, ইকবাল হোসেন অস্ত্র হাতে অংশগ্রহণ করেন। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা অন্যায়ভাবে অভিযোগপত্রে (চার্জশিটে) উক্ত ৫ আসামির নাম অব্যাহতির আবেদন করেছেন। প্রকৃতপক্ষে উক্ত আসামিগণ অত্র মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেনের প্রধান সহযোগী। নূর হোসেনের সঙ্গে উক্ত আসামিরাও উক্ত অপহরণ, খুন, গুম-এর পরিকল্পনাকারী এবং অর্থের যোগানদাতা। র্যাবকে অপহরণ, হত্যা ও গুম এ তারাও প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করেছে।
২। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মামলার প্রথম থেকেই অভিযোগপত্র (চার্জশিটে) থেকে বাদ দেওয়া ৫ জন আসামির প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট ছিলেন। কারণ এজাহারে নাম থাকলেও ৫ জনের কাউকেই তদন্তকারী কর্মকর্তা গ্রেফতার করেননি। উক্ত আসামিরা গ্রেফতার হলে পুলিশ রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে ৭ খুনের সঙ্গে তাদের প্রত্যক্ষভাবে জড়িত থাকার বিষয়টি প্রকাশ পেত। এজাহারনামীয় ৬ আসামি পলাতক থাকলেও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা তদন্তকালে শুধু ১নং আসামি নূর হোসেনের অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোক করার জন্য আবেদন করেন। অথচ অভিযোগপত্রে বাদ যাওয়া উক্ত ৫ আসামির নাম এজাহারে থাকলেও তাদের অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোকের কোনও পদক্ষেপ নেননি।
৩। অত্র মামলায় গ্রেফতারকৃত আসামিদের মধ্যে বেশিরভাগ আসামিই নিজেদের দোষ স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেছেন। তাতে ৭ খুনের ঘটনা উদঘাটিত হয়েছে। এর মধ্যে গ্রেফতারকৃত অভিযোগপত্রের অন্তর্ভুক্ত আসামি আলী মোহাম্মদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির ১১ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, ‘এক বা দেড় মাস আগে মিজমিজি ২নং ওয়ার্ডের সিটি করপোরেশনের রাস্তার কাজে বড় ঝামেলা তৈরি হয়। ওই রাস্তার কাজ করার সময় নূর হোসেনের খালাতো ভাই মোবারক রাস্তার পাশে টিনের ঘর তৈরি করেছিল। নজরুল ইসলাম মোবারককে টিনের ঘর সরাতে বললে নিহত নজরুলের সঙ্গে নূর হোসেনের ঝগড়ার সূত্রপাত হয়। ওই সময় নূর হোসেন ৪০/৫০ জন লোক নিয়ে ওই রাস্তার পাশে যেয়ে গুলি ছুড়ে দোকানপাট ভাঙচুর করে। ওই সময় নূর হোসেনের বাসায় নূর হোসেনের ভাই নূর ইসলাম, নূর সালাম, জজ মিয়া, নুরুদ্দিন, নুরুল হক এবং ভাতিজা বাদল বসা ছিল। ওইসময় নূর হোসেনকে আলী মোহাম্মদ বলেন, ভাই নজরুলকে নিয়ে এত ভাল লাগে না। নজরুল খুব বাড়াবাড়ি শুরু করেছে। আপনি হুকুম দেন ওকে শেষ করে দেই। তখন নূর হোসেনে বলেন এটা আমার ব্যাপার এটি আমি দেখবো।’ আলী মোহাম্মদের জবানবন্দি থেকে বোঝা যায় ৭ খুনের অপহরণ, হত্যা ও গুমের পরিকল্পনার নূর হোসেনের উপরোক্ত পাঁচ ভাই নূর ইসলাম, নূর সালাম, জজ মিয়া, নুরুদ্দিন, নুরুল হক এবং ভাতিজা কমিশনার বাদল জড়িত। অথচ তদন্তকারী কর্মকর্তা তাদের কাউকে গ্রেফতার করেনি এবং ঘটনার পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত থাকার পরেও তাদের অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
৪। অত্র মামলার গ্রেফতারকৃত আসামি আলী মোহাম্মদের ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিসহ অন্যান্য জবানবন্দিতে রিয়াজ নামের একজন আসামির নাম এলেও তাকে গ্রেফতার করা হয়নি এবং অভিযোগপত্রে পিতার নাম ঠিকানা না থাকার মিথ্যা অজুহাতে আসামির দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তার নাম চার্জশিটভুক্ত করা হয়নি। পিতার নাম ঠিকানা পেলে পরবর্তীতে সম্পূরক অভিযোগপত্রে দাখিলের কথা বলা হয়েছে। অথচ ইতোপূর্বে এজাহারকারিনীর পক্ষে রিয়াজের নাম ঠিকানা তদন্তকারী কর্মকর্তার নিকট সরবরাহ করা হয়েছিল। উক্ত রিয়াজের পিতার নাম মৃত মোসলেহ উদ্দিন। তার বাড়ি সিদ্ধিরগঞ্জের আটি এলাকায়।
৫। অভিযোগপত্রে উল্লেখিত আসামি আলী মোহাম্মদ নূর হোসেনের সহযোগী। ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে হাসান, বিডু, মুহিত, ফারুক, আসলাম, ভাগিনা মামুন, ফয়সাল, রুবেল, ক্যাশিয়ার কাশেম, জিত, নাজু, আলম, তাজিন বাবু, ছাদেক, সামাদ এবং আরিফুল হক হাসান (জাতীয় শ্রমিকলীগের সাবেক সভাপতি আব্দুল মতিন মাস্টারের পুত্র), সাইফুল ইসলাম, ইলিয়াছ, মাসুম, জব্বার, মিজানদের নাম আসলেও তাদের নাম অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তাদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়েও কোনও তদন্ত করা হয়নি।
৬। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কয়েকজনকে স্বাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি রেকর্ড করিয়েছেন। অথচ উক্ত স্বাক্ষীদের কেউ কেউ প্রত্যক্ষভাবে হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেছেন। তাদেরকে আসামি হিসেবে অভিযোগপত্রে নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
৭। মামলার অভিযোগপত্রের স্বাক্ষীর কলামে আসামিপক্ষের কয়েকজনকে স্বাক্ষী হিসেবে দেখানো হয়েছে। যার কারণে আসামিপক্ষে সুবিধা পাওয়ার সুযোগ থাকে।
৮। যেহেতু উক্ত অপহরণ খুন ও গুমের পেছনে পরিকল্পনা অর্থ যোগানকারীদের বিষয়টি তদন্তকারী কর্মকর্তা সম্পূর্ণরূপে উদঘাটন করার জন্য প্রধান আসামি নূর হোসেনকে দেশে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করেননি। নূর হোসেনকে দেশে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করলে অবশ্যই এজাহারনামীয় আসামিদের নাম আসতো।
পুলিশ সুপারের বক্তব্য
উচ্চ আদালত ‘ত্রুটিপূর্ণ’ মন্তব্য করলেও এর প্রতিক্রিয়ায় কোনও পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখাতে রাজী হননি জেলা পুলিশ প্রধান ও সাত খুন মামলার তদারক ড. খন্দকার মহিদউদ্দিন। তিনি বলেছেন, ‘আমরা আদালতের মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে কোনও প্রতিক্রিয়া দেব না। তবে আমি সাত খুন নিয়ে আমার দেওয়া আগের বক্তব্যের প্রতি অনঢ় রয়েছি। এখানে উল্লেখ্য যে, পুলিশ সুপার এর আগে বলেছিলেন, ‘সাত খুনের ঘটনায় পৃথক দুটি মামলাতেই গ্রেফতারকৃত ২১ আসামিই আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি ও ১৪জন সাক্ষী স্বীকারোক্তি দিয়েছে। ২১ আসামির মধ্যে ১০ জনের স্বীকারোক্তিতেই উঠে এসেছে কে পরিকল্পনাকারী। তদন্ত শেষে আমরা নূর হোসেনের জন্য ৬ মাস অপেক্ষা করেছিলাম। মামলায় দুটি চার্জশিট দিলেও অভিযোগ মূলত একই। একটি আদালত গ্রহণ করেছে এবং মামলার বাদীও তদন্তে সন্তেুাষ প্রকাশ করে ধন্যবাদ দিয়েছেন। আরেকটি না-রাজি দিয়েছেন অপর বাদী। তারা কী কারণে না-রাজি দিয়েছেন তা আমার জানা নেই। তবে রাজনৈতিক বিষয় থাকলে সেটা তাদের মধ্যে থাকতে পারে। আমাদের প্রতিবেদন শতভাগ নির্ভুল ও চমৎকার। এর পর আর জিজ্ঞাসাবাদের কোনও প্রয়োজন নাই। আমরা চাই না বাদী বিচার বঞ্চিত হউক।’
এ ব্যাপারে সাত খুনের ঘটনায় নিহত কাউন্সিলর নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটির মামলার আইনজীবী অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান জানান, যেহেতু উচ্চ আদালতে আমাদের আবেদনের শুনানি চলছে সেহেতু এখনই এ ব্যাপারে মন্তব্য করতে চাচ্ছি না। যা বলার আদালতেই উপস্থাপন করবো।
অন্যদিকে সেলিনা ইসলাম বিউটি বলেন, উচ্চ আদালতে ন্যায়বিচার পাব আশা করছি। কারণ চার্জশিটে অনেক আসামির নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। আবার নূর হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদ না করে এত বড় একটি ঘটনায় চার্জশিট গ্রহণযোগ্য নয়। নূর হোসেনের পক্ষে নেপথ্যে কারা কাজ করতো, র্যাবকে দেওয়া ৬ কোটি টাকার লেনদেনসহ আরও অনেক বিষয় উহ্য রয়ে গেছে চার্জশিটে।
এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাদী পক্ষের একজন আইনজীবী বলেছেন, ‘গ্রেফতারকৃত আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক জিয়াউল আহসানসহ অনেকের নাম আসলেও তাদের আসামি করা হয়নি।’
/এফএ/
আপ-এসটি








