`আমার মেয়ে আছে, ঘরে উঠতি বয়সী ছেলে আছে। মেয়েকে রাস্তায় বের হতে হয়। এমনিতেই নানা ধরনের সমস্যার মধ্যে কাটাতে হয় আমাদের। এর মধ্যে যদি মেয়ের কিছু হয় আমরা করবোটা কী।' অসহায়ের মতো তাকিয়ে নিজেকেই যেন প্রশ্ন করলেন মোহম্মদপুর আসাদগেট নিউ কলোনির বাসিন্দা আলিমুর (ছদ্মনাম)। শুধু আলিমুর না ওই কলোনির অনেকের অবস্থাই এমন।
লালমাটিয়ার উল্টোদিকের মাঠের পাশ ঘেঁষে আসাদগেট নিউ কলোনি। এখানে ১১৪ পরিবারের সদস্যরা এখন উচ্ছেদ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। অনেকে অবশ্য ভয়ে কলোনি ছেড়েছেন বলে জানা গেছে। স্থানীয় চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের হুমকিতে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছেন না কলোনির বাসিন্দারা। বাড়ির নারী-পুরুষ কেউই পারতপক্ষে একা বের হন না। সম্প্রতি এ কলোনির ১৫ জন নারীকে মারধর করার ঘটনার পর থেকে বেশিরভাগ বাসিন্দার মনে ভীতির সঞ্চার হয়েছে।
দুপুর নাগাদ কলোনিতে গিয়ে দেখা গেলো, একেবারে নিশ্চুপ চারপাশ। অভিযোগ রয়েছে, বাড়ির মেয়েরা বাইরে বের হলে হয়রানির শিকার হন।
আমার নাম প্রকাশ করবেন না দয়া করে- এই অনুরোধ জানিয়ে কলোনির একাধিক মুক্তিযোদ্ধার পরিবার জানায়, ‘আমাদের সামর্থ্য নেই অন্য কোথাও যাওয়ার। জহির রায়হানকে সঙ্গে নিয়ে শহীদুল্লাহ কায়সারকে খুঁজতে গিয়ে শহীদ হয়েছেন এমন পুলিশ কর্মচারীর পরিবারও এখানে থাকে যাদেরকে এখন স্বাধীনতাবিরোধি বানানোর পায়তারা চলছে। ভয়ে আমরা একা কেউ চলাফেরা করি না এখন। সবাই মিলেমিশে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছি।’ এরইমধ্যে ৩৬টি পরিবারেক নানাভাবে বুঝিয়ে এলাকা ত্যাগ করতে বাধ্য করেছে ওয়ার্ড কমিশনারের লোকজন। কিন্তু তারা বাসা ছাড়লেও এখনও পর্যন্ত বাসার চাবি নিজের কাছেই রেখে দিয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা বলেন, সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলছি দেখলেই অত্যাচার শুরু হবে। অশ্লীল ভাষায় গালমন্দ করা হচ্ছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
নিউ কলোনির সাতটি (৯ থেকে ১৫) ভবন এবং আরও কতগুলো ভবন তৈরি হয়েছিল ষাটের দশকের প্রথমদিকে। তৎকালীণ পূর্ব পাকিস্তান সরকার এগুলো মূলত বেসরকারি স্বল্প আয়ের লোকদের জন্য নির্মাণ করেছিল। পরবর্তীতে কিছু ভবন ভেঙে ছয়তলা তৈরি করে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে স্বল্পমূল্যে দীর্ঘমেয়াদি কিস্তিতে ফ্ল্যাটগুলো বিক্রি করে দেওয়া হয়। এখন পুরনো এই সাতটি ভবনই রয়েছে যেখানে ১১৪টি পরিবার ৪০-৫০ বছর ধরে বসবাস করে আসছেন।
এলাকাবাসী বলছেন, কর্তৃপক্ষ তথা সরকার এসব ভবন রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের কাজ প্রায় ২০ বছর আগে থেকে বন্ধ করে দিয়েছে। সে সময়কার হিসেব অনুযায়ী, নির্দিষ্ট করে দেওয়া ভাড়া পরিশোদের মাধ্যমে ৩০ বছর পর এই ফ্ল্যাট বরাদ্দপ্রাপ্তদেরই সম্পত্তি বিবেচিত হওয়া কথা।
হঠাৎই এসব ভবন ভেঙে সরকারি চাকুরেদের ফ্ল্যাট বানানোর পরিকল্পনা হওয়ায় এই পরিবারগুলো পড়েছেন বিপাকে। আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নিউকলোনির বর্তমানে ১৫ নম্বর ভবনের পেছনের ফাঁকা জায়গায় সাতটি ভবনের ১১৪টি পরিবারের জন্য ৮৭৫ বর্গফুটের ফ্ল্যাটসংবলিত একটি বহুতল ভবন তৈরি করা হবে এই আশ্বাস দিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য করা হচ্ছে। কিন্তু চুক্তি না করে, কিভাবে কতদিনে ফ্ল্যাট দেওয়া হবে সেই কাগজপত্র না দিলে তারা কোনও ভরসা পাচ্ছেন না তাদের এতোদিনের বাসস্থান ছেড়ে যাওয়ার।
তারা বলছেন, এলাকার ক্ষমতাশালী মাসুদ বারী নানা ছলচাতুরি করে ৩৬ পরিবারকে রাজি করিয়েছে এলাকা ত্যাগে এবং আমরা কিছু মানুষ রাজি হচ্ছি না এটা প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।
যদিও যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তারা সবটাই অস্বীকার করে গেছেন। তারা বলছেন, ইতোমধ্যে ১১৪ পরিবারের ৮০ পরিবার এলাকা ছেড়েছে। সেসব ফ্ল্যাট ভাঙার কাজও শুরু হয়েছে। নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা দাবি করা মাসুদ বারী বলেন, ‘আমারও পরিবার আছে। ১১৪টি পরিবারকে ফ্ল্যাট দেওয়া হবে বলা হচ্ছে যখন তখন সেই সুযোগটা আমি নিতে চাই।’
তিনি আরও বলেন, এখানে ফ্রি থাকতে থাকতে এখানকার বাসিন্দাদের অভ্যাস খারাপ হয়ে গেছে। যদিও ফ্ল্যাটগুলো বানানোই হয়েছিল স্বল্পআয়ের মানুষদের জন্য। বর্তমানে তারা ২ হাজার টাকা ভাড়া ও বিল দিয়ে এখানে বাস করছেন।
এদিকে, আন্দোলনকারী পঞ্চাশোর্ধ এক নারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলছেন, ‘আমাদের সঙ্গে এতোবছর একসাথে থেকে মাসুদ বারী কেন আমাদের বিপরীতে কাজ করছেন সেটা ভেবে দেখার আছে।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নেত্রী মানেন দাবি করে তিনি আরও বলেন, ‘এতো বছরের আমাদের যে রাজনৈতিক মাঠে থাকা সেটা কেবল নেত্রীর পথ অনুসরণ করে চলা। এখন সেটাকেও আজ ভিন্নপথে নেওয়ার পায়তারা চালাচ্ছে। আমরা প্রতিবাদে মাঠে আছি, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত মাঠে থাকব।’
/এসটি/








