হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে ইকোনমিক জোন স্থাপনের প্রতিবাদে দিন দিন মারমুখী ও প্রতিবাদী হয়ে উঠেছে হাজার হাজার চা শ্রমিক। ইকোনমিক জোন স্থাপন ঠেকাতে আগামী ২৫ জানুয়ারি সারাদেশের মহাসড়ক অবরোধের ঘোষণা দিয়েছেন চা শ্রমিকরা। ফলে দিন যতই ঘনিয়ে আসছে ততই প্রতিবাদ মুখর হয়ে উঠছেন তারা।
ইকোনমিক জোন স্থাপন এলাকায় দেশীয় অস্ত্র, বুকে প্লেকার্ড-ফেস্টুন,তীর-ধনুক হাতে নিয়ে রণসাজে সজ্জিত হয়ে গায়ে রঙ মেখে ও মাতায় জাতীয় পতাকা বেঁধে প্রতিনিয়ত প্রতিবাদ করে আসছে শ্রমিকরা। তাদের এ সকল রণসাজ দেখলে মনে হয় যেন যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে কোনও ঘেরিলা বাহিনী। প্রতিদিনই শ্রমিকরা দুই ঘণ্টা কর্মবিরতি দিয়ে আন্দোলন করছে। ইতোমধ্যে প্রতিবাদ সভা, বিক্ষোভ মিছিল, ধর্মঘট, স্মারকলিপি, মহাসমাবেশসহ নানা কর্মসূচি পালন করেছে আন্দোলনরত শ্রমিকরা।
এবার তাদের আন্দোলনের ঘোষণা সারাদেশের মহাসড়ক অবরোধ। মহাসড়ক অবরোধের ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই শ্রমিকরা নিয়মিত বৈঠক ও অন্যান্য জেলার শ্রমিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে আসছে। এসব শ্রমিকরা দাবি তুলছেন- ‘জান দেব তবুও মাটি দেব না।’
শ্রমিকরা জানান, এখানে ইকোনমিক জোন স্থাপন হলে তারা জমি হারানোর পাশাপাশি গৃহহারা হয়ে পড়বে। আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে তাদের। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ইকোনমিক জোন স্থাপনে শ্রমিকদের কোনও ক্ষতি হবে না। শ্রমিকদের স্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জেলার চুনারুঘাট উপজেলার চান্দপুর চা বাগান, বেগমখাঁন চা বাগান ও জোয়ালভাঙ্গা চা বাগান এলাকায় ৫১১ একর জমির উপর স্পেশাল ইকোনমিক জোন স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করে সরকার। ইকোনমিক জোন স্থাপনের সিদ্ধান্তের পর থেকেই সেখানকার হাজার হাজার শ্রমিক প্রতিবাদ করে আসছে। তবে শ্রমিকদের প্রতিবাদে কোনও কর্ণপাত করেনি প্রশাসন।
গত ১২ ডিসেম্বর ইকোনমিক জোনের পিলার স্থাপনের জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাশহুদুল কবীরসহ প্রশাসনের একটি টিম ঘটনাস্থলে গেলে হাজার হাজার চা-শ্রমিক প্রতিবাদ জানান। এ সময় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ বাধে। এক পর্যায়ে শ্রমিকদের প্রতিবাদের মুখে পিলার স্থাপন না করে ফিরে যান প্রশাসনের কর্মকর্তরা। মূলত এরপর থেকেই প্রতিদিন ঘটনাস্থলে দেশীয় অস্ত্রহাতে অবস্থান নেয় শ্রমিকরা। পালন করে আসছে বিভিন্ন কর্মসূচি। গঠন করা হয় ভূমিরক্ষা কমিটি।
সর্বশেষ গত সোমবার সকাল থেকেই শ্রমিকরা আবারও বিক্ষোভ মিছিল ও ঘটনাস্থলে অবস্থান নেয়। পরে প্রতিবাদ সভায় শ্রমিকরা জানান, রক্তের বিনিময় হলেও চা শ্রমিকদের ধান চাষের জমিতে ইকোনমিক জোন ঠেকানো হবে। কোন অবস্থায় ইকোনমিক জোন স্থাপন হতে দেওয়া হবে না। প্রশাসন বল প্রয়োগ করলে রক্তের বন্যা বয়ে যাবে।
চানপুর বাগানের শ্রমিক কালা পাত্র বলেন, আমাদের জমি নিয়ে গেলে ছেলে-পুলে নিয়ে না খেয়ে মরতে হবে। তাই জমি না দিয়ে আমরাই মরে যাব। এ জন্যই এখানে অবস্থান করছি।
বেগমগঞ্জ চা বাগানের মহিলা শ্রমিক কণক লতা বলেন, এখানে ইকোনমিক জোন স্থাপন হলে আমরা জমির অধিকার থেকে চির দিনের জন্য বঞ্চিত হবে। ছেলে মেয়েদের নিয়ে না খেয়ে মরতে হবে।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ চা-বাগান শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রধান উপদেষ্টা কাঞ্চন পাত্র বলেন, আমরা জেলা প্রশাসককে ৭ দিনের আল্টিমেটাম দিয়েছিলাম এতে কোন কাজ হয়নি। পরবর্তীতে মহাসমাবেশ করে ২৫ জানুয়ারি সারাদেশের মহাসড়ক অবরোধের ঘোষণা দিয়েছি। সেই লক্ষে এখন কাজ করছি।
তিনি জানান, তাদের বাপ-দাদার জমির উপর যদি ইকোনমিক জোন স্থাপন করা হয় তাহলে চা শ্রমিকরা ঘরে বসে থাকবে না। রাস্তায় নেমে পড়বে। তখন প্রশাসন শ্রমিকদের সামলাতে পারবে না।
বাংলাদেশ চা-বাগান শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও চা বাগান ভূমি রক্ষা কমিটির সদস্য সচিব নৃপেন পাল জানান, তাদের আল্টিমেটামে কোন কাজ না হওয়ায় বাংলাদেশের ২৫৮টি চা-বাগানের শ্রমিকরা ২১ জানুয়ারি থেকে এক সঙ্গে কাজ বন্ধ করে দিবে। ইতোমধ্যে তাদের দাবি আদায়ের জন্য বাংলাদেশের সকল চা শ্রমিকরা এক হয়ে আন্দোলন করার জন্য এক্যবদ্ধ হয়েছে বলে জানান তিনি।
বাংলাদেশ চা-বাগান শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক রাম ভজন কৈরি জানান, এখানে ইকোনমিক জোন স্থাপন হলে হাজার হাজার শ্রমিকের অস্থিত্ব হুমকির মুখে পড়বে। তাই তাদের দাবি, ইকোনমিক জোন স্থাপনের জন্য সরকার সিদ্ধানটি পুনর্বিবেচনা করবে।
চান্দপুর চা বাগানের ব্যবস্থাপক শামীম আহমদ বলেন, চা শ্রমিকরা বাগানে কোন কাজ না করে প্রতি দিনই আন্দোলন করে যাচ্ছে। এতে বাগানের উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে। ফলে সরকার বিপুল পরিমান রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক সাবিনা আলম জানান, ইকোনমিক জোন স্থাপনের ব্যাপারে ইতোমধ্যে জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে। পিলার বসানোর কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। আন্দোলনরত শ্রমিকদের সঙ্গে আবারও জেলার সকল এমপিদের নিয়ে শিগগিরই আলোচনা করা হবে।
তিনি জানান, ইকোনমিক জোন স্থাপন হলে শ্রমিকদের স্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। স্কুল, হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হবে। এতে করে চা শ্রমিকদের ভাগ্যেরও উন্নয়ন হবে। তাদের কোন ক্ষতি হবে না। শ্রমিকদের উন্নয়নে সরকার আন্তরিক রয়েছে। তবে তিনি আগামী ২৫ জানুয়ারি মহাসড়ক অবরোধের ব্যাপারে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি।
/আরএ/








