নারায়ণগঞ্জ শহরের যানজট নিরসনে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী এমপি শামীম ওসমান কেন দলীয়নেতাকর্মীদের নিয়ে ‘ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ’ কার্যক্রমে নেমেছেন—এ নিয়ে নগরজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। নগরবাসী ও প্রশাসনের কেউ-কেউ শামীম ওসমানে এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন, কেউ-কেউ হঠাৎ এ ধরনের কার্যক্রমকে দেখছেন দৃষ্টি আকষর্ণের কৌশল হিসেবে। তারা এও বলছেন, এ কয় দিনের কর্মযজ্ঞ শেষে হলেই নগরী আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাবে। মাঝখান থেকে শামীম ওসমান নগরবাসীসহ দেশবাসীর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসতে চাইছেন।
এদিকে, মঙ্গলবার শুরু হওয়া তিনদিনের ওই কার্যক্রম শেষ হবে বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায়। এই দিন বিকেল ৪টায় শামীম ওসমান আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন করে এ ব্যাপারে তিনদিনের কর্মকাণ্ড বিষয়ে বিস্তারিত জানাবেন। সম্মেলনে যানজট নিরসন কল্পে একটি প্রস্তাবনাও সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক পুলিশকে দেওয়া হবে বলে জানা গেছে।
এদিকে, বুধবার দ্বিতীয় দিনেও শামীম ওসমান দুপুর ২টার পর কিছুক্ষণের জন্য চাষাঢ়া এলাকায় অবস্থান করেন। ওই সময়ে বলেছেন, আজকের মধ্যে যদি সব ধরনের যানবাহন ট্রাফিক আইন মেনে চলা শুরু না করে, তবে কাল থেকে সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে কার কথাই মানা হবে না। এ সময় তার সঙ্গে সরকারি তোলারাম কলেজের স্কাউট, ক্যাডেট, ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
শামীম ওসমান বলেন, অনেক বলেছি, না পেরে রাস্তায় নেমেছি। যেকোনও মূল্যেই শহরকে যানজটমুক্ত করব। নারায়ণগঞ্জে যানজটের জন্য মানুষ সময়মতো কোনও কাজ করতে পারে না। এই অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য আমাদের দলের নেতাকর্মীরা ও স্কাউটরা কাজ করছেন। সবাই মিলে কাজ করায় দুদিন ধরে শহরে যানজট অনেক কমে এসেছে। আমরা ইতোমধ্যে দেখিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছি, আমাদের শহরে আমরা ট্রাফিক আইন মেনে চললে যানজট নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। বৃহস্পতিবারের মধ্যে যদি সব ধরনের যানবাহন নিয়মশৃঙ্খলার মধ্যে না আসে, তবে সবার বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে কাউকে কোনও ছাড় দেওয়া হবে না।
নেতাদের ফটোসেশন
শহরের স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ট ব্যাংক মোড়ে ছিল নগর যুবলীগের সভাপতি শাহাদাত হোসেন সাজনু ও দুই নং রেল গেট এলাকায় জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি সাফায়েত আলম সানিসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন। তবে সকাল ১১টার পর দুপুর ২টা পর্যন্ত সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রায় সময়েই এসব নেতা আড্ডায় মত্ত ছিলেন। কিন্তু ফটো সাংবাদিকদের দেখামাত্র তৎপর ছিলেন তারা।
শামীম ওসমান সরলেই পাল্টে যায় যানজটের চিত্র
শামীম ওসমান দুইদিন যতক্ষণ চাষাঢ়ার রাস্তা থেকে যানজট নিয়ন্ত্রণে কাজ করেছেন, ততক্ষণ রাস্তায় যানজট কম ছিল। তিনি সরে যাওয়ার পরেই আবারও যানজট বেড়ে যায়। মঙ্গলবার বেলা ১টায় রাস্তায় নামেন শামীম ওসমান। ছিলেন ৩টা পর্যন্ত। বুধবার সকাল ১১টার পর রাস্তায় নামে আওয়ামী লীগ ও বিএনসিসির লোকজন। ছিল পৌনে ৩টা পর্যন্ত। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ শহরে মূলত যানজটের সৃষ্টি হয় সকাল ৯টা হতে ১১টা পর্যন্ত ও বিকেল ৫টার পর। সবচেয়ে বেশি যানজটের সৃষ্টি বিকেলের পর। কারণ ওই সময়ে শহরের ফুটপাতগুলোয় হকার বসে বেশি। এছাড়া বিভিন্ন মার্কেটের সামনে রিকশা পার্কিং করে রাখার কারণে যানজটের সৃষ্টি হয়। কিন্তু সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত শামীম ওসমানের উদ্যোগে যানজট নিরসনে কাজ হলেও বাকি সময় যখন যানজটের সৃষ্টি তখন কার্যক্রম না থাকার কারণে প্রকৃতভাবে যানজট নিরসনের প্রকৃত কারণ উদঘাটন করা যায়নি।
বহুতল ভবনের নিচে পার্কিং ব্যবস্থা নেই
নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়া থেকে শুরু করে প্রধান সড়কগুলোর পাশে অবস্থিত বহুতল ভবনগুলোয় কোনও ধরনের পার্কিং ব্যবস্থা না থাকায় গাড়িগুলো রাস্তার পাশে পার্কিং করে রাখা হয়। এছাড়া মার্কেটগুলোয়ও প্রচুর গাড়ি পার্কিংয়ে থাকে। অন্যদিকে, শহরের উকিলপাড়া এলাকায় রয়েছে রয়েছে বেশ কিছু হোসিয়ারি কারখানা। এ কারণে ওই কারখানাগুলোর সামনের বঙ্গবন্ধু সড়কে মালামাল লোড-আনলোডের জন্য গাড়ি পার্কিং করে রাখা হয়। এ কারণেও যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে।
৩২ বার রেল ক্রসিং
ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে প্রতিদিন ১৬টি ট্রেন দুবার করে আপ-ডাউন মিলিয়ে মোট ৩২ বার চলাচল করে। শহরের কেন্দ্রীয় রেল স্টেশনটি কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল সংলগ্ন। শহরের কেন্দ্রীয় রেল স্টেশনে যেতে তিনটি রেল ক্রসিং অতিক্রম করতে হয়। এর মধ্যে চাষাঢ়া রেল ক্রসিং যেটা নারায়ণগঞ্জ-পাগলা-নারায়ণগঞ্জ সড়কে অবস্থিত, দ্বিতীয়টি বঙ্গবন্ধু সড়কের ২নং রেল গেট ও তৃতীয়টি বাস টার্মিনাল সংলগ্ন এক নং রেল গেট। ৩২ বার ট্রেন চলাচল করার কারণে ৫মিনিটি করে ক্রস বার ফেলার কারণে ১৬০ মিনিট যান বন্ধ থাকতে হয়। আর এ কারণে পুরো শহরে দেখা দেয় যানজট। এ প্রসঙ্গে শামীম ওসমান বলেন, কেন্দ্রীয় রেল স্টেশনটি চাষাঢ়ায় স্থানান্তর করা গেলে শহরের প্রধান সড়কগুলোর ওপর যানজট অনেকাংশে কমে আসবে।
‘দায়িত্ব কার প্রশাসন, সিটি করপোরেশন না এমপির ’
নারায়ণগঞ্জ শহরের যানজট নিরসনের দায়িত্ব কার? ট্রাফিক পুলিশ, সিটি করপোরেশন না কি জনপ্রতিনিধিদের। বুধবার এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে এ প্রশ্নই ছুড়ে দেন একটি বেসরকারি কলেজের শিক্ষক আলমাস হোসেন। তিনি বুধবার দুপুর সোয়া ২টায় চাষাঢ়া খাজা সুপার মার্কেটের সামনে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ‘শামীম ওসমানের লোকজন যেভাবে কাজ করছেন, এতে যানজট নিরসন হচ্ছে। কিন্তু এত সংখ্যক ট্রাফিক পুলিশ নিয়োগ কি আদৌ সরকার দিতে পারবে?’
চাষাঢ়া পৌর মার্কেটের সামনের এক দোকান মালিক জানান, ‘পৌর মার্কেটের সামনে দুরন্ত পরিবহনের কাউন্টার রয়েছে। শুনেছি এটার কোনও অনুমোদন নেই। এখানে এলোপাথাড়ি গাড়ি রাখা হচ্ছে। এছাড়া এখানে সিএনজি ও টেম্পু স্ট্যান্ডের কারণে যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। দুদিন ধরে এখানে স্ট্যান্ড বসছে না।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ট্রাফিক কর্মকর্তা জানান, জনসচেতনা না বাড়ালে ট্রাফিক জ্যাম সরবে না। শহরের ফুটপাতগুলো হকারমুক্ত করতে না পারলে লোকজন বাধ্য হয়েই রাস্তা দিয়ে চলাচল করে। সে কারণে লোকজনদের আগে ফুটপাত ব্যবহারে অভ্যস্ত করতে হবে। তিনি আরও বলেন, শামীম ওসমানের উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। কিন্তু রাজনৈতিক অনেক কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে অবৈধ স্ট্যান্ড ও ফুটপাত দখলমুক্ত করা প্রয়োজন।’
নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) বদরুল আলম জানান, আমরা যানজট নিরসনে জন-প্রতিনিধিদের উদ্যোগকে স্বাগত জানাই।
এ ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জ জোনের ট্রাফিক পরিদর্শক মাহবুব শাহ জানান, ‘তারা আমাদের সাহায্য করছেন, এটি একটি ভালো দিক, যেখানে আমাদের ট্রাফিক কাজ করে মাত্র দুজন। সেখানে এখন দেড়শ জনের মতো কাজ করছেন। এ রকম হলে যানজট সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। দেড়শ জনের কাজ দুজন করলে একটু তো সমস্যা হবেই।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চাষাঢ়া গোল চত্বর সংলগ্ন পৌর মার্কেটের সামনে ছিল বেবি ট্যাক্সি স্ট্যান্ড যা সিটি করপোরেশন অনুমোদিত নয়। নারায়ণগঞ্জ থেকে শিমরাইল মোড় পর্যন্ত চলাচল করা দুরন্ত পরিবহনের কাউন্টারও এখানেই। ফলে এ স্থানে দুরন্ত পরিবহনের হিউম্যান হলার রেখে যাত্রী ওঠানোসহ বেবিস্ট্যান্ডের কারণে সবসময় গাড়ি পার্কিং থাকে। এতে করে যানজট লেগেই থাকে। মঙ্গলবার এই বেবিস্ট্যান্ড সরানো হলেও বুধবার ফের সেখানে ওই স্ট্যান্ড বসানো হয়েছে।
এছাড়া, শামীম ওসমান চলে গেলে বেলা ৩টার পর তেকে আবারও শহরের সেই পুরানো চিরচেনা যানজটের দৃশ্য দেখা যায়।
/এমএনএইচ/








