টেংরাটিলা গ্যাস ফিল্ড অগ্নিকাণ্ডের ১১ বছর পরও সুনামগঞ্জের ওই এলাকায় নারী পুরুষ ও শিশুরা মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন। স্থানীয়রা আর্সেনিক দুষণ, অকাল গর্ভপাত, চোখে কম দেখা, চর্মরোগসহ নানা শারীরিক সমস্যায় আক্রান্ত বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ও বিশেষজ্ঞরা।
দোয়ারা বাজার উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. জিল্লুল হক জানান, গ্যাসফিল্ড এলাকার টেংরা, গ্রিসনগর, আজমপুর, টিলাগাঁও ও আলীপুরসহ বেশ কয়েকটি গ্রামের মানুষ মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছেন। টিউবওয়েলে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিকের জন্য আর্সেনিক আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। এছাড়া ক্যানসারের ঝুঁকিও রয়েছে।
উল্লেখ্য ২০০৫ সালে নাইকোর গ্যাস কুপ খননে অদক্ষতা ও দুর্নীতির কারণে ৭ জানুয়ারি ও ২৪ জুন পরপর দুই দফা অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে দেশের গ্যাস সম্পদ ও গ্যাসফিল্ড এলাকার পরিবেশ ও প্রতিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হয়। পরে বর্তমান সরকার আর্ন্তজাতিক আদালতে ক্ষতিপূরণ মামলা দায়ের করে। বর্তমানে আর্ন্তজাতিক আদালতে মামলাটি বিচারধীন রয়েছে।
দোয়ারাবাজার উপজেলায় ১৪২ জন আর্সেনিক আক্রান্ত রোগীর মধ্যে গ্যাসফিল্ড এলাকার আশপাশের গ্রামগুলোতে ৯২ জন রোগী রয়েছে। সরকারিভাবে আর্সেনিকের ওষুধ সরবরাহ না থাকায় তাদের চিকিৎসা কার্যক্রম ব্যহত হচ্ছে।
টেংরাটিলা গ্রামের আব্দুল আওয়াল আবাদী বলেন, অগ্নিকাণ্ডের ১১ বছর পরও এর প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারছেন না এলাকাবাসী। এখনও গ্যাসফিল্ডের চারপাশে মানুষের ঘরবাড়িতে বুদবুদ করে গ্যাস বের হচ্ছে।
একই গ্রামের মৎস্যচাষী শামীম আহমদ জানান,অগ্নিকাণ্ডের ফলে তার পুকুরে মাছের ফলন কমে গেছে। সারা বছর মাছকে খাবার দেওয়ার পরও মাছের ওজন বাড়েনি।
ফরিদ মিয়া (৩৬) বলেন, তার বাড়ির টিউবওয়েলে চাপ না দিলেও গ্যাসের চাপে পানি পড়ে এবং গ্যাস বের হয়। দিয়াশলাই দিয়ে আগুন ধরিয়ে দিলে আগুনের জ্বলন্ত শিখা ৭ থেকে ৮ ফুট উপরে উঠে। তার দুই ছেলে চোখের রোগে আক্রান্ত হয়েছে। মোছাম্মত আয়েশা আক্তার জানান, টিউবওয়েলের পানিতে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক থাকায় তাদের বাড়ির শিশুরা ৫-৬ দিন পরপর গোসল করে। রাতে বিদুৎ চলে গেলে ঘরে কুপি বাতি জ্বালাতে পারেন না গ্যাসের চাপে বসত ঘরে আগুন জ্বলে ওঠে।
আব্দুল মজিদ বীরপ্রতীক বলেন, বিদেশি বিশেষজ্ঞ দল স্পর্শকাতর এলাকা ঘুরে ৭ দিন ধরে তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করবে। কিন্তু নতুন করে কুপ খনন না করলে এলাকায় গ্যাসের চাপ কমবে না। এভাবে মানুষের বাড়ি ঘর পুকুরে বুদবুদ করে গ্যাস বের হবে। বীরপ্রতীক আব্দুল হালিম বলেন, এলাকায় বিপদজনকভাবে গৃহস্থালী কাজে গ্যাস ব্যবহার করা হচ্ছে। যে কোনও সময় বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটতে পারে।
আব্দুল খালেক জানান, গ্যাসের কারণে শ্বাসকষ্টে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
সুনামগঞ্জের টেংরাটিলা গ্যাসফিল্ড এলাকা পরিদর্শন করেছেন বাপেক্স ও পেট্রোবাংলার প্রতিনিধি দল এবং ১১ সদস্য বিশিষ্ট বিদেশি বিশেষজ্ঞরা। বুধবার সকাল ১১ থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত ইয়ান ভুরতুইক, ক্লিব বেটন ও ডায়না, নিকোলাসসহ ১১ সদস্য বিশিষ্ট একটি বিশেষজ্ঞ দল অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন। এসময় এলাকাবাসী তাদের স্বাস্থ্য সমস্য, বিশুদ্ধ পানীয়জল, পরিবেশ ও প্রতিবেশের কথা তুলে ধরেন।
বিশেষজ্ঞ দলের সঙ্গে ছিলেন বাপেক্সের ডিজিএম ভূতত্ব মিজানুর রহমান, ডিজিএম সেবা জাকির হোসেন, ব্যবস্থাপক ড. আশিকুর রহমান, আসিফ ইকরাম খান, ওয়াহিদুজ্জমান প্রমুখ। প্রতিনিধি দলটি বুধবার থেকে ৭ দিন অগ্নিকাণ্ডে গ্যাস সিপেজ ও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে ক্ষয়ক্ষতির বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করবেন।
নাইকো কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় সংক্রান্ত মামলায় বিদেশি বিশেষজ্ঞদল বাংলাদেশকে সহযোগিতা করবেন।
দোয়ারাবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলামকে বলেন, বিশেষজ্ঞ দল গ্যাসফিল্ড এলাকা ৭ দিন ধরে পরিদর্শন করে ক্ষয়ক্ষতির বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাবে।
/জেবি/এফএস/








