পড়াশোনার প্রতি ভীষণ আগ্রহী স্কুলছাত্রী পুষ্প (ছদ্মনাম) স্বপ্ন দেখেছিল লেখাপড়া করে করে মানুষের মতো মানুষ হবে, পরিবারের কষ্ট লাঘব করবে। হঠাৎ বাজলো বিয়ের সানাই।
পুষ্পের এবার দশম শ্রেণিতে থাকার কথা ছিল। কিন্তু কোলে ১০ মাসের শিশু নিয়ে সে এখন সংসারী। পড়াশোনা করে বড় মানুষ হয়ে ওঠার স্বপ্নটা তার ভেঙে গেছে। কুড়িগ্রামে এমন হাজারও পুষ্পের স্বপ্ন ভেঙে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত।
১৫ বছরের কমবয়সী মেয়েদের বিয়ের হার সবচেয়ে বেশি– এমন দেশগুলোর শীর্ষ তালিকায় বাংলাদেশ রয়েছে। জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক তহবিল ইউনিসেফ এর ২০১৪ সালের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী দেশে ১৮ বছরের কমবয়সী মেয়েদের বিয়ের হার ৬৬%। কুড়িগ্রামে এই চিত্র আরও ভয়াবহ, প্রায় ৭৮%, যা সর্বোচ্চ। বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে আইন থাকলেও এর যথাযথ প্রয়োগ ও সামাজিক সচেতনতার অভাবে বিয়ে রোধ করা যাচ্ছে না।
কুড়িগ্রাম জেলায় বাল্যবিয়ের পেছনে পরিবারগুলোর আর্থসামাজিক অবস্থানকে অন্যতম কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। দরিদ্রতা (সম্প্রতি প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী কুড়িগ্রামে দরিদ্রতার হার ৬৩.৭% যা বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি), সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা, নারীর সম্ভ্রমহানির ভীতি, কর্মসংস্থানের অভাব ইত্যাদি বিষয়কে বাল্যবিয়ের ক্ষেত্রে প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। গোটা জেলা জুড়ে এই সামাজিক ব্যাধির প্রকোপ থাকলেও চরাঞ্চলে সর্বাধিক।
শারীরিক বা মানসিক কোনও দিক থেকেই বিয়ের উপযুক্ত না হওয়ায় দাম্পত্য জীবনে পরিবার পরিকল্পনার কোনও ভূমিকা থাকে না। ফলে নানাবিধ যৌন রোগ ও স্বাস্থ্য ঝুঁকির সম্মুখীন হতে হচ্ছে তাদের। বাল্য বিয়ের শিকার এসব মেয়ে গর্ভকালীন ও সন্তান প্রসবের সময়ে উপযুক্ত স্বাস্থ্য সেবা পায় না। ফলে তার ও শিশুর উভয়ের জীবন মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ে যায়।
এ ব্যাপারে কথা হয় কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতলের ম্যাটারনিটি (মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র) ওয়ার্ড এর ডাক্তার মারুফা আক্তার জাহানের সঙ্গে। তিনি জানান, যেসব নারী প্রসবজনিত কারণে তাদের কাছে আসে সবার বয়স ১৮ বললেও অনেকের বয়স ১৮ বছরের নিচে। কারও কারও বয়স ১৪/১৫। এই অল্প বয়সে কেউ কেউ একাধিক সন্তানের মা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, অল্প বয়সে সন্তান ধারণের ফলে এরা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ভোগে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই মায়েরা পিপিএইচ, কোলন লেবার, অবসট্রাক্ট লেবার ইত্যাদি সমস্যায় ভোগে। আবার প্রি-ম্যাচিউরড ডেলিভারির ফলে এদের সন্তানেরা ভোগে লো-বার্থ ওয়েট সমস্যায়।
‘এন্ডিং চাইল্ড ম্যারেজ : প্রগ্রেস অ্যান্ড প্রসপেক্টস’ শীর্ষক ইউনিসেফ এর প্রতিবেদনটিতে বাংলাদেশের বাল্য বিয়ের বিভিন্ন দিক উঠে এসেছে। বাংলাদেশে ১৫ বছর হওয়ার আগেই শতকরা ৩৯ শতাংশ মেয়ের এবং ১৮ বছরের মধ্যেই ৭৪ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয়ে যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্বে বাল্যবিয়ের শিকার মেয়ের সংখ্যা এখন ৭০ কোটিরও বেশি। তাদের প্রতি তিনজনে একজনের বিয়ে হয়েছে ১৫ বছর বয়স হওয়ার আগেই।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিশ্বে ১৫ বছরের কমবয়সী মেয়েদের বাল্যবিয়ের হার সবচেয়ে বেশি।
২০১৪ সালের জুন মাসে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে কুড়িগ্রাম জেলার ৩টি উপজেলায় (সদর উপজেলা, রাজারহাট উপজেলা এবং উলিপুর উপজেলা) পাইলট প্রকল্পের কাজ শুরু করা হয়। ‘সার্ভিস ইনোভেশন ফান্ড’ এর অর্থায়নে ‘বাল্যবিয়ে প্রতিরোধকল্পে বিয়ে নিবন্ধনপূর্ব মোবাইল ফোন ক্ষুদে বার্তাভিত্তিক সার্টিফিকেশন প্রকল্প’ যা বাস্তবায়নে ছিল জেলা প্রশাসন।
এ প্রকল্প অনুযায়ী সম্পূর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতির সাহায্যে একটি সফটওয়্যার ব্যবহার করে বর-কনের জন্মনিবন্ধন নম্বর ব্যবহারের মাধ্যমে সঠিক বয়স নির্ধারণ করে বিয়ে নিবন্ধন (রেজিস্ট্রি) করতে হবে সংশ্লিষ্ট নিবন্ধককে। এবং মেয়ের বয়স ১৮ বছর এবং ছেলের বয়স ২১ বছরের কম হলে বিয়ে নিবন্ধক বিয়ে নিবন্ধন (রেজিস্ট্রি) করতে পারবেন না।
আর বর-কনের বয়স নির্ধারিত বয়স অনুযায়ী হলে, পরবর্তী ধাপে বিয়ে নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পাদনের জন্য সম্মতি দেওয়া শেষে একটি আইডি/ট্র্যাকিং নম্বর সম্বলিত অটোমেটেড ভার্চুয়াল সনদ তৈরি হবে। সংক্ষিপ্ত এই ভার্চুয়াল সার্টিফিকেটে একটি ট্র্যাকিং আইডি ও সনদ কখন তৈরি হয়েছে এর সময় উল্লেখ থাকবে।
বর-কনের বিয়ে সংক্রান্ত ডাটা এন্ট্রি একবার নিশ্চিতকরণ হয়ে গেলে (সনদ তৈরি হয়ে গেলে) পরবর্তীতে অন্য কোথাও এই বর-কনের জন্মনিবন্ধন নম্বরটি বিয়ে নিবন্ধনের জন্য একই সফটওয়্যারে প্রবেশ করালে তার পূর্ব-বিয়ে সংক্রান্ত তথ্য প্রদর্শন করবে।
১২ মাস মেয়াদি এ প্রকল্প গত ২০১৪ সালের ১১ জুন উদ্বোধন করেছিলেন রংপুর বিভাগীয় কমিশনার জনাব মুহাম্মদ দিলওয়ার বখ্ত। উদ্বোধন হওয়ার পর অনেকটা সময় পার হলেও বাস্তবে এর কোনও সফলতা পাওয়া যায়নি। বরং সদর উপজেলাতেই প্রকল্প চলাকালীন এবং প্রকল্পপরবর্তী সময়ে পুরাতন পদ্ধতিতে এখনও বিয়ে সম্পন্ন হচ্ছে।
কুড়িগ্রাম শহরের একটি বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই প্রতিবেদককে জানান, তাদের স্কুল থেকে ২০১৬ সালে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৪৭ শিক্ষার্থীর মধ্যে ১৪জনই বিবাহিত। শহরের অন্যান্য বিদ্যালয়েও মাধ্যমিক স্তরের শ্রেণিগুলোয় কিছু কিছু বিবাহিত শিক্ষার্থী রয়েছে যা বাল্যবিয়ে প্রমাণ করে। অন্য দুটি উপজেলার চিত্র আরও ভয়াবহ।
প্রকল্পের ‘কনসেপ্ট নোট’ থেকে জানা যায়, কুড়িগ্রাম সদর উপজেলায় বিয়ে ঝুঁকিতে থাকা ১৮ বছরের নিচের মেয়ে শিশু ও ২১ বছরের নিচের কিশোরের পরিবার সংখ্যা ৭২,৫৯২। আর এ উপজেলার ৮টি ইউনিয়নে (৯টি পৌর ওয়ার্ড) বিয়ে নিবন্ধকের সংখ্যা ৮ জন। এত বিপুল সংখ্যক বিয়েঝুঁকিতে থাকা পরিবারের বিপরীতে এত স্বল্প সংখ্যক নিবন্ধকের মাধ্যমে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধের প্রকল্প বাস্তবায়ন বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে।
প্রকল্প এলাকা হওয়ার পরও এখনও বিয়ে নিবন্ধনে সব ক্ষেত্রে জন্মনিবন্ধন নম্বর ব্যবহার করা হচ্ছেনা। বরং বিধিবহির্ভূতভাবে আগের মতো বিয়ে সম্পন্ন করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বয়স প্রমাণের জন্য সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড কাউন্সিলর কর্তৃক তথ্যের রদবদল ঘটিয়ে অতঃপর সেই জন্মনিবন্ধনপত্র দেখিয়ে বিয়ে করানো হচ্ছে।
জেলা প্রশাসনের ‘প্রজেক্ট কনসেপ্ট নোটে’ প্রকল্প এলাকায় ১০০% জন্মনিবন্ধন অর্জিত হওয়ার দাবি করা হলেও কুড়িগ্রাম পৌরসভায় এর কোনও সত্যতা পাওয়া যায়নি। এমনকি এখনও পর্যন্ত কোনও বিয়ে নিবন্ধককে প্রজেক্ট কনসেপ্ট ও এর পদ্ধতি সম্পর্কে জানানো হয়নি।
কথা হয় পৌর এলাকার ৬,৭ ও ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বিয়ে নিবন্ধক (কাজী) মাওলানা নুরুজ্জামানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বাল্যবিয়ে প্রতিরোধকল্পে বিয়ে নিবন্ধন পূর্ব মোবাইল ফোন ক্ষুদে বার্তাভিত্তিক সার্টিফিকেশন প্রকল্প’ বিষয়ে শুনেছি। তবে এ ব্যাপারে আমাদেরকে এখনও কোনও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনও উপকরণও আমাদেরকে দেওয়া হয়নি। এখনও অনেক ক্ষেত্রে হাতে তৈরি জন্মনিবন্ধন সনদ ব্যবহার করে বিয়ে নিবন্ধন করা হচ্ছে।
১৮ বছরের নিচে মেয়েদের বিয়ে নিবন্ধন করেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মেয়ের অবিভাবকরা জন্মনিবন্ধনের কাগজ এনে দিলে আমাদের আর কিছু করার থাকেনা। এ ক্ষেত্রে মেয়ের সত্যিকারের বয়স ১৮ বছরের কম হলেও বয়স প্রমাণের জন্য সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড কাউন্সিলর কর্তৃক জন্ম নিবন্ধন সনদ দেখিয়ে বিয়ে সম্পন্ন করা হচ্ছে।
টেরেডেস হোম কুড়িগ্রামের চাইল্ড প্রডাকশন অফিসার মিমি গোমেজ বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, তাদের প্রকল্পভুক্ত এলাকা সদরের ভোগডাঙা ইউনিয়নে এখন পর্যন্ত প্রকল্প সেবাভুক্ত ১৫৯৫জন বিবাহিত মেয়ে রয়েছে যাদের সকলের বয়স ১৮ বছরের নিচে। প্রতি মাসেই এই ইউনিয়নে নতুন নতুন মেয়ে কারো না কারো স্ত্রী হয়ে আসছে, যারা বাল্য বিয়ের শিকার।
‘কনসার্ন বাংলাদেশ’ নামক একটি এনজিও-র গবেষনায় দেখা গেছে চরে বসবাসরত প্রায় ৭৭% মানুষ দারিদ্র্যপীড়িত এবং ৮৬% মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে বাস করে। এই মানুষগুলো খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষার মত মৌলিক মানবাধিকার হতে শহরের মানষের তুলনায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে। গবেষণায় আরও জানা যায়, চরাঞ্চলের সাত বছর বয়সের ওপরে শিশুদের শিক্ষার হার ৭% যা জাতীয় পর্যায়ে ৪৫%। মেয়েদের মধ্যে এ হার বেশ কম। মাত্র ২০%।
সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল গফুর জানান, বাল্যবিয়ে তুলনামূলকভাবে চরাঞ্চলে বেশি। কারণ এখানকার ছেলে-মেয়েরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরপরই ঝরে পড়ে। পর্যাপ্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয় থাকলে পরিস্থিতি অন্যরকমও হতে পারতো বলে তিনি জানান।
স্কুল পেরিয়ে কলেজে উঠলেই এ সংখ্যা দুই থেকে তিনগুণ বেড়ে যায়। কুড়িগ্রাম সরকারি মহিলা কলেজে ২০১৫-২০১৬ শিক্ষাবর্ষে যে সব শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে তাদের মধ্যে প্রায় অর্ধশতাধিক বিবাহিত যাদের বয়স ১৬ থেকে ১৭ বছর।
প্রকল্পের এমন ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক জনাব খান মোহাম্মদ নুরুল আমিন বলেন, প্রকল্পের মেয়াদ শেষ। এখন প্রকল্পের অবহিতকরণ সভা হচ্ছে। উইনটেল লিমিটেড নামক একটি প্রতিষ্ঠান সফটওয়্যার সম্বলিত মোবাইল ফোন দেওয়ার কথা থাকলেও তারা এখনও পর্যন্ত তা দিতে না পারেননি। তাই বিয়ে নিবন্ধকদের কাছে সংশ্লিষ্ট উপকরণ পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে বাল্য বিয়ে প্রতিরোধে আমরা সচেতন রয়েছি।
/এইচকে/








