ডিএনএ মেলার পরও ১০ বছর ধরে সন্তানের অপেক্ষায় মা

বগুড়া প্রতিনিধি
১৬ জুলাই ২০২৩, ১৭:২৮আপডেট : ১৬ জুলাই ২০২৩, ১৭:৫৩

বগুড়া শহরের একটি ক্লিনিকে গৃহবধূ তাজমিনা আকতার সিজারিয়ান অপারেশনে জমজ (ছেলে-মেয়ে) সন্তানের জন্ম দেন। মাত্র পাঁচ হাজার টাকার জন্য তার ছেলে সন্তানকে বিক্রি করে দেয় ক্লিনিকের লোকজন। সন্তানহারা মাকে বোঝানো হয়, ছেলে সন্তানটি মৃত ছিল। তাই তাকে ‘ডাস্টবিনে’ ফেলে দেওয়া হয়েছে। এরপর কেটে গেছে প্রায় ১০ বছর। 

সন্তান ফিরে পেতে তিনি আদালতের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। কয়েকবার সংবাদ সম্মেলনও করেন। ডিএনএ রিপোর্ট পজেটিভ এলেও তা পরিবর্তন করা হয়। তার অজান্তে হাইকোর্ট থেকে মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে। এমনকি সন্তান ফিরে পেতে দুই দফা ১৭ দিন হাজত খেটেছেন। গ্রাম্য শালিসে ছেলেটি তার প্রমাণ হলেও সে আদেশও অবজ্ঞা করা হয়েছে। 

বগুড়ার গাবতলী উপজেলার নেপালতলী ইউনিয়নের ইতালী প্রবাসী হেলাল উদ্দিনের স্ত্রী তাজমিনা আকতার জানান, তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা রেখে ২০১২ সালে তার স্বামী বিদেশ যান। আলট্রাসনোগ্রাফি রিপোর্টে তার পেটে জমজ সন্তান রয়েছে উল্লেখ করা হয়। ২০১৩ সালের ২৮ জুলাই সকাল ৯টার দিকে বগুড়া শহরের নূরানী মোড় এলাকায় আইভি ক্লিনিকে অপারেশনের মাধ্যমে বাচ্চা প্রসব করানো হয়। ক্লিনিকের চিকিৎসক আমিনুল ইসলাম বুলু ও অন্যরা জানান, ছেলে বাচ্চাটা নির্জীব হওয়ায় মারা গেছে। লাশ ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হয়েছে। 

আলট্রাসনোগ্রাফির রিপোর্টও গায়েব করা হয়। ১০দিন পর মেয়েকে নিয়ে বাড়ি ফিরে আসেন। সন্তান চুরির ব্যাপারে তার সন্দেহ হলেও প্রমাণের অভাবে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারেননি। তাজমিনা প্রায় সাতমাস পর ২০১৪ সালের মার্চে স্বামীর জন্মসনদ নিতে গাবতলীর নেপালতলী ইউনিয়ন পরিষদে যান। সেখানে ঈশ্বরপুর গ্রামের নিঃসন্তান আনোয়ার হোসেন ও চায়না বেগম দম্পতির কাছে ছেলে সন্তান দেখে তিনি বুঝতে পারেন এটি তার ক্লিনিক থেকে চুরি হওয়া সন্তান। ওই দম্পতি টীকা কার্ডে সাত মাস বয়স কেটে চার মাস করার জন্য চেয়ারম্যানের কাছে আসেন।

এরপর তিনি গ্রাম্য শালিস বসান। সেখানে চায়না বেগম জানান, ছেলেটি তার নয়; তিনি ক্লিনিক থেকে কিনেছেন। এরপর চায়না বেগম সন্তান ফেরত দিতে রাজি হলেও গ্রামের দালালদের কারণে ব্যর্থ হন। 

তাজমিনা জানান, এরপর তিনি সন্তান ফিরে পেতে ২০১৮ সালে বগুড়ার দ্বিতীয় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ক্লিনিকের নার্স সাহানা আকতার, আয়া মনোয়ারা, আনোয়ার হোসেন, তার স্ত্রী চায়না বেগম ও চায়নার বাবা খলিলুর রহমানসহ সাত জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। আদালত ডিএনএ করার নির্দেশ দেন। ফি জমা দেওয়ার পর পুলিশ তাজমিনাকে দুই দিন বগুড়া হাজতে রাখেন। এরপর তাজমিনা, তার ছেলে ও চায়না বেগমকে ডিএনএ করার জন্য ঢাকা মেডিক্যালে নেওয়া হয়। নমুনা সংগ্রহের পর তাজমিনাকে কাশিমপুর কারাগারে পাঠানো হয়। সেখানে দুই দিন রাখার পর বগুড়া কারাগারে পাঠানো হয়। একজন পর তিনি জামিনে ছাড়া পান। তিন মাস পর বগুড়ার আদালতে ডিএনএ পজেটিভ রিপোর্ট আসে। কিন্তু কারসাজি করে সে রিপোর্ট নেগেটিভ দেখানো হয়। 

এরপর ২০২২ সালে ডিএনএ রিপোর্টের নারাজি দিলে ওই বছরের ৯ জানুয়ারিতে তাকে আবারও বগুড়া জেলহাজতে নেওয়া হয়। পরদিন তাকে পুলিশ প্রহরায় ওই সন্তান ও তার পালক মা চায়নাসহ কয়েকজনকে ঢাকা মেডিক্যালে নেওয়া হয়। ডিএনএ সংক্রান্ত অফিসে গিয়ে জানতে পারেন, আগের রিপোর্ট পজেটিভ। তাই তারা দ্বিতীয় বার ডিএনএ না করে ফেরত দেন। ২০১৯ সালের ১৩ জুলাই ন্যাশনাল ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরির টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজার প্রফেসর শরীফ আকতারুজ্জামান স্বাক্ষরিত দুটি রিপোর্টের একটিতে প্রায় ৬৯ মিল ও অপরটিতে জিরো দেখানো হয়েছে। বগুড়ার আদালতে বিচার না পেয়ে তাজমিনা আকতার ২০২২ সালের ৮ ডিসেম্বর হাইকোর্টে রিট করেন। সেখান থেকে বগুড়ার দ্বিতীয় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে নথি তলব করা হয়। নিম্ন আদালত ১৪ ডিসেম্বর ডিএনএর নেগেটিভ রিপোর্টটি পাঠান। 

এরপর হাইকোর্ট ডিএনএ অফিসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে তলব করে পজেটিভ রিপোর্ট পান। এ ছাড়া ক্লিনিকের চিকিৎসক প্রভাবশালী মহলকে ম্যানেজ করে বাদীকে (তাজমিনা) না জানিয়ে মামলাটি প্রত্যাহার করে নেন। তাজমিনা আকতার সম্প্রতি হাইকোর্টে লিভ টু আপিল করেন। বিচারপতিরা বিবাদীদের নোটিশ করেছেন।

ডিএনএ কাজে ঢাকায় যাওয়া বগুড়া পুলিশ লাইন্সের এসআই আবদুর রহমান বলেন, ‘ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ তাজমিনার জমজ সন্তানের মধ্যে ছেলেটিকে বিক্রি করে দিয়েছে। আর এ ঘটনায় তার শ্বশুর পক্ষের লোকজন জড়িত আছে। তাজমিনার স্বামী ইতালী প্রবাসী হেলালুর রহমান প্রচুর সম্পদের মালিক ও অর্থশালী। ছেলে সন্তান থাকলে সে ওইসব পাবে। এ কারণে ওই আত্মীয়রা ক্লিনিক ও অন্যদের সঙ্গে যোগসাজস করে সন্তানকে ফিরে পেতে বাধা দিয়ে আসছে। সঠিক তদন্ত করলে এর সত্যতা মিলবে।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘মামলাটিকে নষ্ট করতে ডিএনএ রিপোর্টও জাল করা হয়েছে। ওই নারী মামলার বাদী হলেও তাকে দুই দফা ১৭ দিন হাজতে রাখা হয়।’

বগুড়ার গাবতলীর নেপালতলী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান এসএম লতিফুল বারী মিন্টু বলেন, ‘তাজমিনার অভিযোগ সত্য। হারিয়ে যাওয়া সন্তান আহসান হাবিব ও কাছে থাকা মেয়ে তাসনিয়া আকতারের চেহারা ও অন্যান্য হুবহু মিল রয়েছে।’

বাদীর আইনজীবী রবিউল ইসলাম বলেন, ‘মামলাটি সঠিক। ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ তার বাচ্চাকে বিক্রি করে দিয়েছে। আদালতের লোকজন প্রভাবশালীদের যোগসাজসে ডিএনএ রিপোর্ট জালিয়াতি করেছে। বাদীকে না জানিয়ে হাইকোর্টের মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে। আশা করি, তাজমিনা আকতার সুবিচার পাবেন।’

এ প্রসঙ্গে বগুড়ার দ্বিতীয় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের স্পেশাল পিপি আশেকুর রহমান সুজন বলেন, ‘তাজমিনা আকতার অন্যের বাচ্চাকে নিজের দাবি করে মামলা করেছিলেন। যদিও বাচ্চাটিকে পালক বাবা-মা পালন করছেন।। ডিএনএ রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছে। দুই বাচ্চার মধ্যে চেহারার কোনও মিল নেই। অভিযোগ প্রমাণ করতে না পেরে নিজেরা হাইকোর্ট থেকে মামলা প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এ মামলার ব্যাপারে কোনও অবহেলা করা হয়নি। এ ছাড়া হাইকোর্টের কোনও নোটিশ আসেনি।’

/এসএন/
সম্পর্কিত
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
কিশোর গ্যাং ধরে তাবলীগে পাঠাবো: পুলিশ সুপার
কদমতলীতে ইন্টারনেট সার্ভিসের ৩ কর্মীকে মারধর
সর্বশেষ খবর
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম