নারায়ণগঞ্জের ধলেশ্বরী নদীতে ট্রলার ডুবিতে নিহত ৬ মাটিকাটা শ্রমিকের গ্রামের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার উধুনিয়া ও বাঙ্গালা ইউনিয়নের ৩টি গ্রামে তাদের বাড়ি। বৃহস্পতিবার ভোরে তাদের লাশ উধুনিয়া ইউনিয়নের গাবেশ্বর, ফাজিলনগর ও বাঙ্গালা ইউনিয়নের বানিয়াকৈর গ্রামে আনা হলে দেখার জন্য হুমরি খেয়ে পড়েন গ্রামবাসী ও স্বজনেরা।এসময় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়।
ট্রলার ডুবিতে নিহতরা হলেন,উধুনিয়া ইউনিয়নের গাবেশ্বর গ্রামের মমতাজ উদ্দিনের ছেলে নেজাব উদ্দিন (৩২)ও সেজাব উদ্দিন (৩৬),শহিদ মিয়ার ছেলে শরিফুল ইসলাম (১৮),আজিজল প্রামাণিকের ছেলে শাহিন আলম (৩০),ফাজিলনগর গ্রামের চয়নদী শেখের ছেলে মোতালেব হোসেন এবং বাঙ্গালা ইউনিয়নের কালিয়াকৈর গ্রামের সিদ্দিক আলীর ছেলে সুজন (৩০)।
স্থানীয়ভাবে জানা গেছে,নারায়ণগঞ্জ জেলার আলীরটেক ইউনিয়নের গোগনগর এলাকার ধলেশ্বরী নদীতে বুধবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে ট্রলার ডুবির ঘটনা ঘটে।ওই সময় উল্লাপাড়া উপজেলার ৩৬ জন শ্রমিক নৌকায় ছিলেন।২৯ জন সাঁতরে তীরে উঠতে পারলেও স্রোতের কারণে ৬ জন তলিয়ে যান। পরে বিআইডাব্লিটিএ’র ডুবুরি দল রাতে তাদের লাশ উদ্ধার করে।
সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া উপজেলার উধুনিয়া ইউনিয়নের গারেশ্বর গ্রামে বৃহস্পতিবার সরেজমিনে গ্রামবাসী ও স্বজনদের আহাজারি দেখা যায়। নিহত শ্রমিকদের জন্য কবর খননের কাজে নিয়োজিত জহির উদ্দিন (৬৫)ও আব্দুস সালাম (৪০) জানান, এ অঞ্চলের কোনও গ্রামেই এক সঙ্গে ৬ জনের মৃত্যুর খবর তাদের জানা নেই।তারা শোককে বুকে চেপে পাশাপাশি ৪টি কবর খনন করেছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ওই ৬টি পরিবার হত দরিদ্র ও ভূমিহীন। নিহত ৬ ব্যক্তি ছিল পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাদের মৃত্যুতে পরিবারগুলো একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেছে।
জানা যায়, আজিজুল হকের ছেলে শাহিন (২৮) দুই সন্তানের জনক। বাবা-মা, স্ত্রী রাশিদা খাতুন ও ৫ বছরের মেয়ে মিম ও ৩ বছরের ছেলে রাব্বীকে নিয়ে ছিল তার সংসার। তার মৃত্যুতে শাহিনের পরিবারের নেমে এসেছে অন্ধকার।
পাগল প্রায় স্ত্রী রাশিদা জানান,শাহিন মৃত্যুর আগে ফোনে একমাত্র ছেলে-মেয়ের কি কি লাগবে তা জানতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার আর কেনাকাটা করে বাড়ি ফেরা হলো না । লাশ হয়ে ফিরে হতবাক করে দিয়েছে পরিবার ও গ্রামবাসীকে।নিহত শাহিনের বাবা জানান, তার পরিবারের ভরণ-পোষণের জন্য কর্মক্ষম আর কেউ নেই।
একই গ্রামের শহিদের ছেলে শরীফুল ইসলাম (১৮)ওই পরিবারের একমাত্র সন্তান। তার মৃত্যুতে পরিবারে চলছে আহাজারি। বুকফাটা আর্তনাদে মা সালেকা খাতুন বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন।বাবা শহিদের সংজ্ঞাহীন দেহ ধরে আছেন প্রতিবেশীরা।
গারেশ্বর গ্রামের মন্তাজ আলীর দুই ছেলে নেজাব (৩৬) ও সুজাবের (৩২) মৃত্যুতে পাথর হয়ে গেছেন তাদের বাবা।ভূমিহীন ওই পরিবারের নেজাবের স্ত্রী কদভানু ও ৩ ছেলে করিম (৯), কবির (৭),নবীরকে (৫)নিয়ে তাদের পরিবার। বাবাকে হারিয়ে তারা দিশেহারা।অপর ভাই সুজাবের স্ত্রী আনজিরা খাতুন স্বামীকে হারিয়ে পাগল প্রায়।
ফাজিল নগর গ্রামের চয়েনদ্বীর ছেলে মোতালেব (৩০) ভূমিহীন ও হতদরিদ্র। তার মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে গ্রামটিতে। শোকে কাতর পরিবারের সদস্যদের আহাজারিতে পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছে।
অপরদিকে,পাশ্ববর্তী বাঙ্গালা ইউনিয়নের বানিয়াকৈর গ্রামের ইদ্রিস আলীর ছেলে সুজন (৩০) পরিবারের একমাত্র কর্মকক্ষ সদস্য। তার মৃত্যুতে পুরো পরিবার দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
এদিকে উল্লাপাড়া সহকারী কমিশনার (ভূমি) আকরাম আলী ও উধুনিয়া ইউপি চেয়ারম্যান এম এ হামিদ গ্রামগুলোতে গিয়ে শোকাহত পরিবারের স্বজনদের সান্ত্বনা দেন এবং নিহতের দাফন-কাফনের ব্যবস্থা করেন।
এর আগে বুধবার রাতে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসন নিহত প্রত্যেক পরিবারকে দাফনের জন্য ২০ হাজার টাকা করে অনুদান দেন।
/জেবি/এমএসএম








