নারায়ণগঞ্জের চাঞ্চল্যকর সাত খুনের দুটি মামলার মধ্যে একটি মামলার বাদী সেলিনা ইসলাম বিউটির সাক্ষ্য গ্রহণের সময়ে তাকে প্রচণ্ডভাবে জেরা করেন আসামি পক্ষের আইনজীবীরা। ওই সময়ে কিছু ক্ষেত্রে সেলিনা ইসলাম বিউটি ঠিকমত জবাব দিতে ব্যর্থ হলে তাকে সহায়তা করেন পিপি (পাবলিক প্রসিকিউটর) অ্যাডভোকেট ওয়াজেদ আলী খোকন। তিনি আদালতে দেওয়া আসামিদের জবানবন্দি ও মামলার সূত্র ধরে তথ্য প্রদান করেন।
ওই সময়ে বাদী পক্ষের আইনজীবী ও আসামিরা পিপির উদ্দেশে বলেন, ‘পিপি সাহেব তাহলে বাদীকে বসিয়ে রেখে আপনিই কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে যান।’ তখন আসামিপক্ষের কয়েকজনও একই কথা বলেন। ওই সময়ে নূর হোসেনসহ কয়েকজনকে মুখ টিপে হাসতে দেখা যায়।
বৃহস্পতিবার সকাল পৌনে ১১টায় থেকে দুপুর দেড়টা পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ এনায়েত হোসেনের আদালতে সাক্ষ্য গ্রহণের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
সাক্ষ্য গ্রহণের জেরার এক পর্যায়ে অ্যাডভোকেট খোকন সাহা যিনি মহানগর আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি পদে আছেন, তিনি সেলিনা ইসলাম বিউটিকে নানা ধরনের প্রশ্ন করেন। বলেন, ‘আপনি নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার খান সাহেব ওসমানী স্টেডিয়াম চেনেন কি না।’ তখন বিউটি বলেন, ‘যেহেতু আমি নারায়ণগঞ্জের মেয়ে সেহেতু অবশ্যই চিনবো।’
এক পর্যায়ে খোকন সাহাকে পাল্টা প্রশ্ন করে বিউটি বলেন, ‘একজন আইনজীবীকে খুন করা হয়েছে। আর আপনি একজন আইনজীবী হয়ে কীভাবে এ মামলা পরিচালনা করছেন? আপনি তো আপনার সহকর্মী আর ভাইয়ের রক্তের সঙ্গে বেঈমানি করছেন। খুনের ঘটনার পর আপনি আমার বাসায় গিয়ে বলেছেন সহায়তা করবেন। এখন আসামিদের পক্ষে কাজ করছেন।’
প্রতিউত্তরে খোকন সাহা বলেন, ‘আমি আসলে এখন একজন আইনজীবী হিসেবে মামলায় সহায়তা করছি।’
অ্যাডভোকেট এম এ রশিদ যিনি নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার থানা আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি তিনি সেলিনা ইসলাম বিউটিকে প্রশ্ন করেন, ‘আপনি কী দেখেছেন যে আপনার স্বামীসহ ৭ জনকে অপহরণ করা হয়।’
উত্তরে বিউটি বলেন, ‘আমি যদি দেখতাম তাহলে কী আর আমার স্বামীকে মারতে পারতো। আর আপনি একজন আইনজীবী। যদি আজ আপনার বোন এরকম স্বামীহারা হতো তাহলে কেমন লাগতো? ৭ জন মানুষ খুন হলো ৭টি পরিবার নিঃস্ব হলো। অথচ আপনারা আসামিদের সহায়তা করছেন।’
জবাবে এম এ রশিদ বলেন, ‘আমি একজন আইনজীবী হিসেবে মামলাটির সহায়তা করছি।’
আদালতে উপস্থিত আসামি পক্ষে সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল আশরাফুজ্জামান, জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সেক্রেটারি খোকন সাহা, সাবেক পিপি সুলতানউজ্জামান, এম এ রশিদ ভূইয়া, আনিসুর রহমান মোল্লাসহ অর্ধশত আইনজীবী বাদীকে জেরা করেন।
আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট ওয়াজেদ আলী খোকন জানান, সাত খুনের দুটি মামলা হয়। এর মধ্যে একটি মামলার বাদী বিজয় কুমার পাল হলেন নিহত অ্যাডভোকেট চন্দন সরকারের জামাতা ও অপর বাদী সেলিনা ইসলাম বিউটি হলেন নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রী। গত ২৯ ফেব্রুয়ারি বিজয় কুমার পালের সাক্ষ্য গ্রহণ হয়েছে।
পিপি আরও জানান, সাত খুনের দুটি মামলায় চার্জশিটভুক্ত আসামির সংখ্যা ৩৫ জন। এর মধ্যে ইতোমধ্যে গ্রেফতার হয়েছেন ২৩ জন। বৃহস্পতিবার ২৩ জনকে আদালতে উপস্থিত করা হয়। এদের মধ্যে নূর হোসেন, এম এম রানা ও তারেক সাঈদের পক্ষে আইনজীবীরা উচ্চ আদালতে আবেদনের কথা বলে সাক্ষী মুলতবির আবেদন করেন। কিন্তু উচ্চ আদালতের কোনও আদেশ না থাকায় ও রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তির কারণে ওই মুলতবির আবেদন নাকচ করে দেওয়া হয়। তবে তিন আসামির পক্ষের আইনজীবীরা পরে সময় আবেদন করায় আগামী ১০ মার্চ পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেন আদালত। এ কারণে এ তিন আসামির পক্ষে সাক্ষী জেরা হয়নি। তবে এদিন পলাতক ১২ জন ও উপস্থিত অপর ২০ জনের পক্ষে সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে।
সাক্ষ্য প্রদান শেষে সেলিনা ইসলাম বিউটি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছি। এজাহারে আমি যা যা লিখেছি তার বর্ণনা দিয়েছি। আমি সাত খুনের খুনিদের ফাঁসি চাই। আমার স্বামী নজরুল ইসলাম জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক ছিলেন। আমার স্বামী জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। আর নূর হোসেন জামায়াত বিএনপি করতেন। নূর হোসেন ও তার লোকজন চাঁদাবাজি সন্ত্রাসী টেন্ডারবাজি মাদক বিক্রিসহ নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন। আমার স্বামী প্রতিবাদ করতেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘নূর হোসেন ও তার লোকজনের অপকর্মের প্রতিবাদ করায় আমার স্বামীর সঙ্গে বিরোধ ছিল। সেই বিরোধের কারণেই নূর হোসেনের পরিকল্পনায় আমার স্বামীসহ সাত জনকে হত্যা করা হয়েছে।’
/এজে/এইচকে/








