মিয়ানমারে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর চালানো নির্যাতন-নিপীড়নের তথ্যানুসন্ধানে কক্সবাজারের উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) প্রধান কৌঁসুলি করিম আসাদ আহমাদ খান। মঙ্গলবার সকালে আইসিসির ১৬ সদস্যের প্রতিনিধি দল ক্যাম্পে যায়।
রোহিঙ্গা প্রতিনিধি দলের কয়েকজন নেতা জানিয়েছেন, আইসিসির প্রধান কৌঁসুলির সঙ্গে সাক্ষাৎকালে রোহিঙ্গারা নতুন করে মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির হাতে কীভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে এবং এর আগে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর সদস্যরা কীভাবে তাদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে সেই বর্ণনা দেন। বাংলাদেশে তারা কীভাবে পালিয়ে এসেছেন সে বিষয়ে কথা বলেন। এ সময় রোহিঙ্গা নারী সদস্যরা তাদের ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অত্যাচার, নির্যাতন ও ধর্ষণের বর্ণনা দেন।
রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর চালানো নির্যাতন, হত্যা ও ধর্ষণের ঘটনায় ২০১৯ সালের ১১ নভেম্বর নেদারল্যান্ডসের হেগ শহরে জাতিসংঘের শীর্ষ আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া। ওই মামলা তথ্য সংগ্রহে তৃতীয় বারের মতো কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করছেন আইসিসির প্রধান কৌঁসুলি।
এ সময় করিম আসাদ আহমাদ খান চলমান মামলা শেষ করতে রোহিঙ্গাদের আরও সহযোগিতা কামনা করেন। পাশাপাশি সম্প্রতি আদালতের মাধ্যমে একটা সিন্ধান্ত আসবে বলে আশ্বস্ত করেন তিনি। পরে বিকালে আইসিসির প্রতিনিধি দল ক্যাম্প ত্যাগ করে।
বৈঠকে থাকা উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা বনি আমিন বলেন, ‘আইসিসির প্রধান কৌঁসুলি আমাদের মামলার পরিস্থিতি তুলে ধরেন। এ বিষয়ে শিগগিরই আদালত একটি সিদ্ধান্ত দিতে পারে বলে জানান। তখন আমাদের পক্ষে জানতে চাওয়া হয়, এ মামলা কখন শেষ হবে, কবে আমরা রাখাইনে ফিরে যেতে পারবো? জবাবে, প্রকৃতপক্ষে মামলা কখন শেষ হবে, সেটি নিশ্চিত করে বলা সম্ভব না। তবে তারা খুব আন্তরিকভাবে মামলার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। দ্রুত সময়ে শেষ হবে, তবে সে সময়টা কবে বলা যাচ্ছে না। আশা করা যায়, একটা সুফল আসবে। পাশাপাশি মামলা শেষ না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের আরও সহযোগিতা চান আইসিসি প্রধান কৌঁসুলি।
‘রাখাইনে চলমান যুদ্ধে সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির হাতে নতুন করে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী আরাকান আর্মির নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। অনেকে এ দেশে পালিয়ে আসছে। তাদের (আরকান আর্মির) বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হবে কিনা বৈঠকে তা জানতে চাওয়া হয়। জবাবে আইসিসি প্রধান বলেন, “আমারও এ ধরনের ঘটনার শিকার হওয়া নির্যাতিতদের তথ্য পাচ্ছি। সেগুলো নোট করে রাখছি। তবে এই মুহূর্তে সে বিষয়ে কিছু বলা যাচ্ছে না।” ’
আইসিসির প্রধান কৌঁসুলি সাড়ে ৯টা থেকে বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত লম্বাশিয়া ক্যাম্পে অবস্থান করে রোহিঙ্গা নেতাদের সঙ্গে কথা বলেন। এরপর বেলা ১২টার দিকে তিনি ক্যাম্প-৪-এ পৌঁছান। তার সঙ্গে রয়েছেন ১৬ সদস্যের প্রতিনিধি দল। সেখানে দুপুর ২টা পর্যন্ত কথা বলেন রোহিঙ্গাদের সঙ্গে। বেলা আড়াইটার দিকে তিনি ক্যাম্প ত্যাগ করেন। এর আগে, সোমবার সকালে ঢাকায় পৌঁছান তিনি। একইদিন দুপুরে বিমানের একটি বিশেষ ফ্লাইটে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনের উদ্দেশ্যে কক্সবাজারে পৌঁছান।
অতিরিক্ত শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ সামছু-দ্দৌজা বলেন, ‘আইসিসি প্রধান কৌঁসুলির নেতৃত্বে ১৬ প্রতিনিধি টিমের একটি দল ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন। এ সময় দলটি বেশ কিছু রোহিঙ্গার সেঙ্গ আলাদাভাবে কথা বলেন।’
উল্লেখ্য, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ২০১৭ সালের আগস্ট রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে। সে সময় ধর্ষণ, হত্যা ও ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়াসহ জাতিগত নির্মূল অভিযান থেকে বাঁচতে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে প্রতিবেশী বাংলাদেশে আশ্রয় নেন। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা তাদের ওপর নির্বিচারে হত্যা, ধর্ষণ, জ্বালাও-পোড়াওয়ের ভয়াবহ বিবরণ তুলে ধরেন। যাকে জাতিগত নির্মূল অভিযান হিসেবে আখ্যায়িত করেছে জাতিসংঘ।









