প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য আর ঈদের আনন্দ দুই মিলে পর্যটকদের ভিড়ে মুখর এখন মৌলভীবাজারের পর্যটনকেন্দ্রগুলো। ঈদের ছুটিতে জেলায় পর্যটকদের ভিড় প্রতিদিনই বাড়তে শুরু করেছে। রবিবার (২২ মার্চ) ঈদের দ্বিতীয় দিন সকাল থেকেই পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে দর্শনীয় স্থানগুলো। এর আগে ঈদের দিন বিকাল থেকেই দর্শনার্থীদের ভিড় শুরু হয়।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য়ে ভরপুর জেলার শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ অঞ্চলকে ঘিরে রয়েছে বিস্তীর্ণ সবুজ চা-বাগান, বৈচিত্র্যময় বিভিন্ন নৃ-জাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতি এবং মনোমুগ্ধকর পরিবেশ। জেলার ৯৩টি চা বাগানের সবুজের সমারোহ, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের জীববৈচিত্র্য, মাধবকুণ্ড ও হামহাম জলপ্রপাত, মাধবপুর লেকসহ বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয়।
পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানান, রমজানের একমাস আগে থেকেই ফাঁকা ছিল পর্যটনকেন্দ্রগুলো। তবে ঈদের ছুটি শুরু হতেই প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে পেয়েছে পর্যটনকেন্দ্রগুলো। এবার ঈদে লাখো পর্যটক মৌলভীবাজার ভ্রমণে আসতে পারেন এবং প্রায় অর্ধ শতকোটি টাকার ব্যবসা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, শ্রীমঙ্গল ভানুগাছ সড়কের ১০নং এলাকা থেকে বধ্যভূমি দিকে অল্প এগোতেই অতিরিক্ত পর্যটকের চাপে যানজট শুরু হয়েছে। দীর্ঘক্ষণ বসে থেকে অনেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও বিভিন্ন যানবাহন থেকে নেমে পড়ছেন। প্রায় দেড় কিলোমিটার এলাকা হেঁটে তারা বিটিআরআই চা বাগান এলাকা ঘুরে দেখেন। আবার চা বোর্ডের নিয়ন্ত্রণাধীন টি রিসোর্টের সামনে থেকেই মানুষের ঢল থাকায় যানজটে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকতে হচ্ছে। ফলে সব ধরনের দর্শনার্থীরা পায়ে হেঁটে যাচ্ছেন বিভিন্ন কেন্দ্রে।
স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে শ্রীমঙ্গল উদ্দেশে এসেছেন রফিকুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি। পরিবার নিয়ে তিনি হেঁটে হেঁটে বধ্যভূমির দিকে যাচ্ছিলেন। তিনি বলেন, ‘বন বিভাগের অফিসের সামনে থেকে একটু এগোতেই দেখি ব্যাপক যানজট। কিছুক্ষণ বসে থেকে পরিবার নিয়ে হেঁটেই রওনা দিলাম বধ্যভূমি ও বিটিআরআই চা বাগানে।’
শ্রীমঙ্গল পর্যটন সেবা সংস্থার সভাপতি মো. সেলিম আহমেদ জানান, ‘জেলার শতাধিক পর্যটনকেন্দের মধ্যে শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জই পর্যটকদের প্রথম পছন্দ। এ দুই উপজেলাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে দেড় শতাধিক রিসোর্ট, ইকো কটেজ ও হোটেল-মোটেল। তিনি বলেন, ‘ঈদের লম্বা ছুটিতে শতভাগ বুকিং হয়েছে।’
ব্যবসায়ীরা জানান, রমজানের আগে থেকেই পর্যটক না থাকায় পরিবহন ও পর্যটন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যবসায় স্থবিরতা নেমে আসে। তবে ঈদের ছুটিকে সামনে রেখে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর আশায় প্রতিষ্ঠানগুলো সাজানো হয়েছে।
অপরদিকে, পর্যটকদের আকর্ষণ করতে প্রায় সব হোটেল-রিসোর্টে রাখা হয়েছে বিশেষ অফার ও সুযোগ-সুবিধা। একই সঙ্গে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ট্যুরিস্ট পুলিশ, থানা পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঠে রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার রাধানগর এলাকায় অবস্থিত প্রায় অর্ধশত রিসোর্ট ও কটেজে ২২ থেকে ২৪ মার্চ পর্যন্ত প্রায় শতভাগ বুকিং সম্পন্ন হয়েছে। শহরের কোলাহল থেকে দূরে প্রকৃতির সান্নিধ্যে সময় কাটাতে পর্যটকরা শহরের বাইরের রিসোর্ট ও কটেজে বেশি আগ্রহী। এ ছাড়া এসব স্থানে কক্ষসংখ্যা কম থাকায় আগাম বুকিং হয়ে যায়। সব মিলিয়ে অর্ধশত কোটি টাকার ব্যবসার সম্ভাবনা রয়েছে।
এ অঞ্চলের জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রগুলোর মধ্যে রয়েছে– বাংলাদেশ চা গবেষণা কেন্দ্র (বিটিআরআই), হাইল হাওর, বাইক্কা বিল, চা জাদুঘর, চা কন্যার ভাস্কর্য, সাত রঙের চা, বধ্যভূমি-৭১, বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন, রাবার বাগান, বন্যপ্রাণী সেবাকেন্দ্র, খাসিয়া পুঞ্জি, মনিপুরী সম্প্রদায়ের তাঁতশিল্প, গারোপল্লী, ভাড়াউড়া লেক, শংকর টিলা, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, ধলই চা বাগানে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান স্মৃতিসৌধ, ক্যামেলিয়া লেক, হরিণছড়া গলফ মাঠসহ আরও অনেক স্থান।
পাঁচ তারকা হোটেল গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গলফের জেনারেল ম্যানেজার আরমান খান বলেন, ‘ঈদে বিদেশি পর্যটক তুলনামূলক কম এলেও দেশি পর্যটকের চাপ বেশি। এবারও আমাদের ৭-৮ দিনের জন্য বুকিং শতভাগ হয়েছে।’
বালিশিরা রিসোর্টের পরিচালক রাসেল আহমেদ বলেন, ‘পুল বুকিং সম্পন্ন হয়েছে। পর্যটক সমাগম আরও বেশি হবে।’
ট্যুরিস্ট পুলিশ শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ জোনের ওসি মো. কামরুল হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘ঈদে পর্যটকদের নিরাপত্তায় টহল জোরদার রয়েছে এবং সব সংস্থার সমন্বয়ে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।’
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ছুটিতে থাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত শ্রীমঙ্গল উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মুহিবুল্লাহ আকন বলেন, ‘পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়ে ইতোমধ্যে আমরা হোটেল ও রিসোর্ট মালিকদের নির্দেশনা দিয়েছি। কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। আশা করছি, আমরা শান্তি-শৃঙ্খলাভাবে ঈদ উৎসব উদযাপন করতে পারবো।’









