শিশু ধর্ষণের ঘটনায় উত্তপ্ত চট্টগ্রাম, যা ঘটেছে

নাসির উদ্দিন রকি, চট্টগ্রাম
২২ মে ২০২৬, ২২:৪২ আপডেট : ২২ মে ২০২৬, ২২:৪২

চট্টগ্রাম নগরীর বাকলিয়া থানাধীন চেয়ারম্যানঘাটা এলাকায় চার বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগকে কেন্দ্র করে বৃহস্পতিবার বিকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, ইট-পাটকেল নিক্ষেপ ও ভাঙচুরের ঘটনা। আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় পুলিশের একটি গাড়িতে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার শেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। এ ঘটনায় ১২ জন পুলিশ, ৫ সাংবাদিক এবং বেশ কয়েকজন বিক্ষুব্ধ লোকজনসহ আহত হন।

যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত

বৃহস্পতিবার বিকালে নগরীর বাকলিয়া থানাধীন চেয়ারম্যানঘাটা এলাকায় চার বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। শিশুটির মা পোশাক কারখানায় কাজে যান এবং বাবা রিকশা চালাতে বের হন। পরে মেয়েটিকে একা পেয়ে ডেকোরেশন কর্মচারী মনির হোসেন (৩২) ধর্ষণ করে বলে অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর এলাকার লোকজন উত্তেজিত হয়ে পড়েন। লোকজন অভিযুক্তকে খোঁজাখুঁজি করতে থাকেন। পরে একটি ভবনে অবস্থান নিশ্চিত করেন স্থানীয় লোকজন। লোকজন জড়ো হওয়ার চেষ্টা করলে ভবনটির গেটে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। পরে ভবনটিকে ঘিরে স্থানীয়রা অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকেন। ভবনটির গেট কয়েক দফা ভাঙার চেষ্টা করা হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। শিশুটিকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়।

অভিযুক্তকে ছিনিয়ে নিতে লোকজনের বিক্ষোভ

অভিযুক্ত মনিরকে আটক করে থানায় নিয়ে যাওয়ার সময় বিক্ষুব্ধ লোকজন পুলিশের গাড়ি আটকে দেয়। বিকাল ৪টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত পুলিশকে আটকে রাখে। এ সময় বিক্ষুব্ধ লোকজন অভিযুক্তকে তাদের হাতে তুলে দেওয়ার দাবি জানান। কাঁদানে গ্যাসের শেল, সাউন্ড গ্রেনেড, ফাঁকা গুলি ছুড়েও পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেও পারেনি। পরে রাত ১০টায় এলাকায় বিদ্যুৎ চলে গেলে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে পুলিশের পোশাক পরিয়ে কৌশলে ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে নেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ সময় বিক্ষুব্ধ লোকজন পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেয়। পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।

সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে চেয়ারম্যানঘাট থেকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে

অভিযুক্তকে আটক করে থানায় নিয়ে আসার পর পুলিশের পিছু পিছু বিক্ষুব্ধ লোকজনও চলে আসে। অভিযুক্তকে পুলিশের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে না পেরে বাকলিয়া এলাকায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে অবস্থান নেয়। রাত সাড়ে ১০টা থেকে স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে আরও বিপুলসংখ্যক জনতা অংশ নেয়। তারা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক বাকলিয়া এলাকা অবরোধ করে রাখে। এ সময় সড়কের উপর টায়ার জ্বালিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। সড়কের ওপর থাকা বেশ কয়েকটি যানবাহনও ভাঙচুর করে বিক্ষুব্ধ লোকজন। পরে পুলিশের সঙ্গে অংশ নেন এপিবিএন ও র‌্যাবের বিপুলসংখ্যক সদস্য। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী টিয়ার শেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। এ সময় পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। রাত ১টার পর বিক্ষোভকারীরা সড়ক ছেড়ে চলে গেলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসে।

১০ থেকে ১২ পুলিশ আহত   

সংঘর্ষে ১০ থেকে ১২ জন পুলিশ আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার (জনসংযোগ) আমিনুর রশিদ। তিনি বলেন, ‘গতকাল বাকলিয়ায় সংঘর্ষের ঘটনায় ১০ থেকে ১২ জন পুলিশ আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়েছে। বেশ কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর হয়েছে। এখানে পুলিশের দায়িত্বে বাধা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় মামলা দায়ের করার প্রস্তুতি চলছে। শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে শুক্রবার দুপুরে শিশুটির বাবা বাদী হয়ে বাকলিয়া থানায় মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় মনির হোসেন নামে একজনকে আসামি করা হয়েছে।’

নির্যাতনের শিকার শিশুকে দেখতে হাসপাতালে জামায়াত নেতৃবৃন্দ

নগরের বাকলিয়ায় ধর্ষণের শিকার চার বছরের শিশুকে দেখতে শুক্রবার চমেক হাসপাতালে যান চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াত নেতৃবৃন্দ। এ সময় তারা শিশুটির শারীরিক খোঁজখবর নেন এবং দায়িত্বরত চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলেন।

হাসপাতাল থেকে বের হয়ে জামায়াত আমির মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, ‘শিশুটি এখনও ভীতসন্ত্রস্ত, তার পরিবারও আতঙ্কিত। আমরা তাদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছি। একটি নিষ্পাপ শিশুর প্রতি এ ধরনের নৃশংস ও অমানবিক ঘটনা অত্যন্ত মর্মান্তিক ও উদ্বেজনক। এই ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।’

ধর্ষকের শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ

রামিসাসহ চট্টগ্রামের বাকলিয়ায় চার বছরের শিশু ধর্ষণের ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতার ও শাস্তির দাবিতে আজ চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে ইসলামী ছাত্রশিবির বাদ জুমা অলি খাঁ মসজিদের সামনে থেকে এক বিক্ষোভ মিছিল বের করে। মিছিলটি নগরীর বিভিন্ন সড়ক পদক্ষিণ করে। একই দাবিতে বিক্ষোভ করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি।

কে এই মনির হোসেন

ধর্ষণে অভিযুক্ত মনির হোসেন কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর থানাধীন ঘারঘাটা এলাকার মো. আলমের ছেলে। থাকে নগরীর বাকলিয়া থানাধীন ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের মিয়াখান নগর এলাকায়। পেশায় একজন ডেকোরেশন কর্মচারী।

পুলিশ যা বলছে

শিশু ধর্ষণ ও বৃহস্পতিবার গভীর রাত পর্যন্ত সৃষ্ট উত্তেজনা নিয়ে বাকলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সোলাইমান বলেন, ‘অভিযুক্ত আসামি মনির হোসেনকে শুক্রবার আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। আদালতে ধর্ষণের দায় স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি প্রদান করেছেন।’

এ ঘটনায় সংবাদমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে ওসি বলেন, ‘অভিযুক্ত মনির হোসেনকে গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে আসার প্রস্তুতির মুহূর্তে কিছু দুষ্কৃতকারী পুলিশকে সরকারি কাজে বাধা দেয়। পুলিশের ওপর ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে পুলিশ সদস্যদের গুরুতর আহত করে। পুলিশকে বহনকারী কয়েকটা পিকআপ গাড়িতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। আহত পুলিশ সদস্যদের হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত দুষ্কৃতকারীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করার প্রস্তুতি চলছে।’

জেলা প্রশাসক যা বলেছেন

ভুক্তভোগী শিশুটিকে দেখতে শুক্রবার দুপুরে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) যান চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। সেখানে শিশুটির শারীরিক অবস্থার খোঁজ-খবর নেন। সেখান থেকে বের হয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘ঘটনার পর শুধু প্রতিবাদ করলেই হবে না, অপরাধ ঘটার আগেই সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

‘এই নিষ্ঠুর ঘটনায় সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো। শিশুটির বর্তমানে শারীরিকভাবে কিছুটা অসুস্থ হলেও ভয়াবহ মানসিক ট্রমার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। আমি মেয়েটিকে দেখে এসেছি, তার সঙ্গে কথা বলেছি। সে এখন কিছুটা ভালো আছে।’

/এমএএ/
সম্পর্কিত
চলন্ত বাসে নারীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, গাড়ির ৩ স্টাফের যাবজ্জীবন
প্রেমিকের সঙ্গে দেখা করতে এসে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার তরুণী, গ্রেফতার ৩
ধর্ষণ ও ব্ল্যাকমেইলিংয়ের অভিযোগ: ঢাবি ছাত্রকে ৩০ দিনের মধ্যে আত্মসমর্পণের নির্দেশ
সর্বশেষ খবর
ঘরের একপাশ ভেঙে স্বামীকে দাফন, অন্য পাশে থাকবেন স্ত্রী
ঘরের একপাশ ভেঙে স্বামীকে দাফন, অন্য পাশে থাকবেন স্ত্রী
কক্সবাজার রুটে মহানগর এক্সপ্রেসের যাত্রা শুরু
কক্সবাজার রুটে মহানগর এক্সপ্রেসের যাত্রা শুরু
বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগের সম্ভাবনা কতটা, সামনে যেসব শর্ত
বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগের সম্ভাবনা কতটা, সামনে যেসব শর্ত
এনসিটিবির ৯ কর্মকর্তাকে বদলি, নতুন কর্মস্থল বিভিন্ন কলেজ
এনসিটিবির ৯ কর্মকর্তাকে বদলি, নতুন কর্মস্থল বিভিন্ন কলেজ
সর্বাধিক পঠিত
মোটরযানের কাগজপত্র ও ড্রাইভিং লাইসেন্স নিয়ে জরুরি বিজ্ঞপ্তি
মোটরযানের কাগজপত্র ও ড্রাইভিং লাইসেন্স নিয়ে জরুরি বিজ্ঞপ্তি
ভোট দেওয়া নিয়ে অনুশোচনা ও বিএনপি সরকারের সমালোচনা করা নারী আটক
ভোট দেওয়া নিয়ে অনুশোচনা ও বিএনপি সরকারের সমালোচনা করা নারী আটক
‘আমার মৃত্যুর জন্য ইউএনও দায়ী থাকবে’ বলা এসিল্যান্ডকে প্রত্যাহার
‘আমার মৃত্যুর জন্য ইউএনও দায়ী থাকবে’ বলা এসিল্যান্ডকে প্রত্যাহার
‘আমাদের নীরব কান্না দেখার মতো কেউ নেই’
‘আমাদের নীরব কান্না দেখার মতো কেউ নেই’
সাময়িকভাবে পূর্ণ মন্ত্রীর মর্যাদা পেলেন হুমায়ুন কবির, প্রজ্ঞাপন জারি
সাময়িকভাবে পূর্ণ মন্ত্রীর মর্যাদা পেলেন হুমায়ুন কবির, প্রজ্ঞাপন জারি