তলিয়ে গেছে খুলনার সড়ক, ৮২৩ কোটির প্রকল্পে মিলছে না সুফল

হেদায়েৎ হোসেন, খুলনা
০৯ জুলাই ২০২৬, ১৪:০৯আপডেট : ০৯ জুলাই ২০২৬, ১৪:০৯

খুলনা মহানগরীতে বুধবার দিনগত সারারাত ভারী বৃষ্টি হয়। আবহাওয়া অফিস বৃহস্পতিবার ভোর ৬টা পর্যন্ত ৭৮ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করে। এই বৃষ্টিতে তলিয়ে যায় শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কসহ নিচু এলাকা। জলাবদ্ধতা নিরসনে ৮২৩ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প নেওয়া হলেও সুফল মিলছে না। ৭৫০ কোটি টাকা ব্যয়ের পরও দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে নগরবাসীকে।

সামান্য বৃষ্টিতে নগরীর প্রধান সড়কগুলোর পাশাপাশি অধিকাংশ অলিগলিও পানিতে তলিয়ে যায়। অনেক এলাকায় বাসাবাড়ি ও দোকানপাটে পানি ঢুকে পড়ায় বিপাকে পড়েছেন বাসিন্দারা। পানির কারণে নষ্ট হয়ে ইজিবাইক সড়কের মাঝেই বিকল হচ্ছে। যাত্রীরা নেমে রিকশা ঠেলে দিচ্ছেন। ভেজা ইউনিফর্ম পরে স্কুলে পৌঁছাতে হয়েছে শিক্ষার্থীদের। অন্যদিকে অফিসগামী মানুষকে জলাবদ্ধ সড়ক পেরিয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে হচ্ছে।

জানা গেছে, শহরের খুলনা বিশেষায়িত হাসপাতাল মোড়, উল্লাস পার্ক মোড়, আহসান আহমেদ রোড, রয়েল মোড়, খানজাহান আলী সড়ক, বাস্তুহারা, বাইতিপাড়া, চানমারী, লবণচরা, টুটপাড়া, মিস্ত্রিপাড়া, রূপসা নতুন বাজারসহ অধিকাংশ নিম্নাঞ্চল পানিতে তলিয়ে আছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, দৌলতপুর, খালিশপুর, বয়রা, মুজগুন্নি ও কবির বটতলা এলাকার পানি কারিগরপাড়া খাল হয়ে ময়ূর নদে যাওয়ার কথা। কিন্তু দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় এই পানি ঠিকমতো প্রবাহিত হতে পারছে না।

টুটপাড়ার রহিম মিয়া বলেন, ‘বৃষ্টির সঙ্গে রূপসা নদীতে জোয়ার এলে নদীর পানি নালা দিয়ে উল্টো শহরের ভেতরে ঢুকে পড়ে। এ কারণে রূপসা স্ট্যান্ড রোড, চানমারী, কেএমপি সদর দফতর এলাকা ও দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরি সড়ক প্লাবিত হয়।

খুলনা শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে ২০০৮ সালে তৎকালীন মেয়র তালুকদার আবদুল খালেকের প্রথম মেয়াদের শেষ দিকে শতকোটি টাকার নগর অঞ্চল উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। এরপর ২০১৩, ২০১৮ ও ২০২৩ সালের নির্বাচনি প্রচারণায়ও জলাবদ্ধতা নিরসন ছিল তার অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি। পরে ৮২৩ কোটি টাকার জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প অনুমোদন হয়। এই প্রকল্পের আওতায় গত সাড়ে পাঁচ বছরে প্রায় দুই শতাধিক নালা নির্মাণ এবং ময়ূর নদসহ ৭টি খাল খননের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা। তবুও নগরবাসীর অভিযোগ, প্রকল্পের অধীনে দৃশ্যমান অবকাঠামো তৈরি হলেও বৃষ্টির দিনে তার সুফল মিলছে না।

খুলনা সিটি করপোরেশনের কনজারভেন্সি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, নগরে নালার দৈর্ঘ্য ১ হাজার ১৬৫ কিলোমিটার। মেগা প্রকল্পের আওতায় নির্মিত অধিকাংশ নালা ঢাকনাযুক্ত। কিন্তু এসব নালা পরিষ্কারের কোনও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা না থাকায় ম্যানুয়ালি পরিষ্কার করতে হয়। ফলে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ সম্ভব হচ্ছে না।

খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী মশিউজ্জামান খান বলেন, ‘জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের অনেক কাজ শেষ হলেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ এখনও বাকি রয়েছে। বিশেষ করে, পাম্প স্টেশন ও স্লুইসগেট সংস্কারের কাজ বাকি। এ কাজ সম্পন্ন হলে প্রকল্পের পূর্ণ সুফল পাওয়া যাবে।’

বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি শেখ আশরাফ উজ জামান বলেন, ‘চার দশক ধরে প্রতিটি নির্বাচনে খুলনা শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি। প্রকল্প গ্রহণের আগে সমন্বিত পরিকল্পনা এবং নগরের ২২টি খালের পূর্ণাঙ্গ সংস্কার ছাড়া খুলনার জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।’

খুলনা নাগরিক কমিটির সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, ‘গত দুই দশকে খুলনার জলাবদ্ধতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ভৈরব ও রূপসা নদী নিয়মিত ড্রেজিং না হওয়ায় নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে। ফলে বর্ষার পানি দ্রুত নদীতে নামতে পারে না, উল্টো জোয়ারের পানি শহরে ঢুকে পড়ে। শহরের পশ্চিম পাশের নিচু জলাধারগুলো আবাসন প্রকল্পের জন্য ভরাট হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি ধারণের প্রাকৃতিক ব্যবস্থা নষ্ট হয়েছে।’

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) খুলনা বিভাগীয় সমন্বয়কারী মাহফুজুর রহমান মুকুল বলেন, ‘৫ বছর আগে খুলনা নগর ও জেলার তিনটি উপজেলার ময়ূর নদসহ ২৬টি খালে ৪৬০ জন দখলদার এবং ৩৮২টি অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করা হলেও সেগুলো উচ্ছেদে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ময়ূর নদ খনন করা হলেও পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ না হওয়ায় নদীর পাড়ে ফেলে রাখা মাটি আবার বৃষ্টির পানিতে নদীতে ফিরে যাচ্ছে। একই সঙ্গে আলুতলা গেট খুলে ময়ূর নদকে রূপসা নদীর সঙ্গে কার্যকরভাবে সংযুক্ত করা গেলে পানি নিষ্কাশন অনেক সহজ হবে।’

জলাবদ্ধতা নিরসনের বিষয়ে খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, ‘বিগত সরকারের আমলে নগরের জলাবদ্ধতা সমস্যার গভীরে কেউ যায়নি। গত সাড়ে তিন মাসে আমরা সমস্যাগুলো চিহ্নিত করেছি। কিন্তু চ্যালেঞ্জটা এমন যে এখনই কাজ শুরু করলে তা শেষ করতে আরও এক-দেড় বছর সময় লাগবে।’

/এমএএ/
সম্পর্কিত
চট্টগ্রামে জলাবদ্ধ এলাকায় বন্ধ থাকবে প্রাথমিক বিদ্যালয় 
খাগড়াছড়িতে পানি কিছুটা কমলেও রয়েছে জলাবদ্ধতা
একদিকে বন্যা, আরেকদিকে পাহাড়ধসে মৃত্যু, উৎকণ্ঠায় কয়েক লাখ মানুষ
সর্বশেষ খবর
শিক্ষার্থীদের সফট স্কিল বাড়াতে প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম চালুর উদ্যোগ 
শিক্ষার্থীদের সফট স্কিল বাড়াতে প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম চালুর উদ্যোগ 
মাদুরো দম্পতির ভাগ্যে কী আছে
মাদুরো দম্পতির ভাগ্যে কী আছে
দুর্নীতির মামলায় আবেদপুত্র সিয়ামের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য শুরু 
দুর্নীতির মামলায় আবেদপুত্র সিয়ামের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য শুরু 
জঙ্গি সংগঠনে জড়িত সন্দেহে সিঙ্গাপুর ফেরত দুই যুবক রিমান্ডে 
জঙ্গি সংগঠনে জড়িত সন্দেহে সিঙ্গাপুর ফেরত দুই যুবক রিমান্ডে 
সর্বাধিক পঠিত
৫ জনকে জীবিত উদ্ধার, মাটির নিচে চাপা পড়েছে আরও ২০ জন
৫ জনকে জীবিত উদ্ধার, মাটির নিচে চাপা পড়েছে আরও ২০ জন
শাপলা চত্বর ঘটনার তদন্ত শেষ, আসামির তালিকায় যারা 
শাপলা চত্বর ঘটনার তদন্ত শেষ, আসামির তালিকায় যারা 
বিমানের ওভারটাইম: কেউ ঘুমান রেস্ট রুমে, কেউ মসজিদে, মাসে গচ্চা দেড় কোটি
বিমানের ওভারটাইম: কেউ ঘুমান রেস্ট রুমে, কেউ মসজিদে, মাসে গচ্চা দেড় কোটি
আলোচিত সেই সংঘবদ্ধ ধর্ষণ মামলার যুক্তিতর্ক শেষ, রায় ১৪ জুলাই
আলোচিত সেই সংঘবদ্ধ ধর্ষণ মামলার যুক্তিতর্ক শেষ, রায় ১৪ জুলাই
ফিফার তদন্তে মিসর জয়ী হলে আর্জেন্টিনার কপালে কী ঘটবে?
ফিফার তদন্তে মিসর জয়ী হলে আর্জেন্টিনার কপালে কী ঘটবে?