নদীতে জাল ফেললে বড় বড় ইলিশে জাল ভরে যায়। ওই লোভ সামাল দিতে পারেন না মৌসুমি ও পেশাদার জেলেরা। আবার লোভে পড়ে অনেকে কর্মস্থল থেকে ছুটি নিয়ে বাড়িতে এসে ইলিশ শিকার করছেন। জেলেরা তো বটেই, লোভ সামলাতে পারেননি পুলিশ সদস্যরাও। তাই নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও ইলিশ শিকার চলছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এ কাজে ইন্ধনদাতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
৯ অক্টোবর নিষেধাজ্ঞা শুরুর পর থেকে ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত বরিশাল বিভাগের ৬ জেলার জেলা প্রশাসন, নৌবাহিনী, নৌ-পুলিশ, কোস্টগার্ড ও পুলিশের অভিযানে প্রায় ৯০০ জেলেকে আটক করা হয়েছে।
ইলিশ শিকারের দায়ে বরিশাল মেট্রোপলিটন বন্দর থানার ৩ পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত এবং ৫ জনকে পুলিশ লাইনসে ক্লোজ করা হয়। জেলেদের কাছ থেকে ঘুষ নেওয়ায় মেহেন্দীগঞ্জ থানার দুই পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করে পুলিশ লাইনসে ক্লোজ করা হয়।
বরিশাল জেলা মৎস্য কর্মকর্তা (ইলিশ) বিমল চন্দ্র দাস বলেন, নিষেধাজ্ঞার সময় যারা ইলিশ শিকার করছেন, তাদের ৮০ ভাগ মৌসুমি জেলে। এদের মধ্যে ছাত্র, গার্মেন্টশ্রমিক, ভুয়া সাংবাদিক এমনকি রাজনৈতিক পরিচয় দেওয়া লোকজনও রয়েছেন। ইলিশের লোভে তারা অক্টোবরে এলাকায় ছুটে আসেন। এ কাজে কিছু অসৎ ব্যবসায়ী এদের উৎসাহিত করেন। এসময় ছোট জালের এক টানে এক থেকে দুই মণ পর্যন্ত ইলিশ ওঠে। এই লোভ সামলাতে না পেরে ঝুঁকি নিয়েই নদীতে নামছেন মৌসুমি ও কিছু পেশাদার জেলেরা।
তিনি বলেন, “বর্তমানে নদীতে যারা নামছেন তাদের পেছনে একটা সিন্ডিকেট কাজ করছে। তারা জেলেদের সাহস জোগায় এই বলে ‘ভয় নেই সব আমরা ম্যানেজ করবো’। শর্ত হলো মাছের অর্ধেক পাবে সিন্ডিকেট সদস্যরা।”
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘১৮ অক্টোবর যে ১০ জন সাংবাদিক সেজে কীর্তনখোলা নদীতে মাছ ধরছিলেন, তারা নতুন নয়, পুরনো মুখ। ২০১৮ সালেও আমি তাদের আটক করেছিলাম। যাদের আটক করা হয়েছে, তারা সরাসরি জাল দিয়ে মাছ ধরছিলেন। নিষিদ্ধ সময়ে ইলিশ নিয়ে যা হচ্ছে সব লোভের কারণেই। এই লোভ সামলাতে না পারলে ইলিশ ধরা পুরোপুরি বন্ধ করা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না।’
কোস্টগার্ড বরিশালের কন্টিনজেন্ট কমান্ডার আতিউর রহমান বলেন, ‘লোভে পড়ে জেলেরা নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে মাছ ধরছেন। লোভটা কিসের সেটা জেলেরাই ভালো বলতে পারবেন। এ পর্যন্ত আমি ২৩/২৪ জেলে আটক করে আইনের আওতায় এনেছি। এছাড়া এদের কাছ থেকে মা ইলিশ ও জাল জব্দ করা হয়।’
ক্ষুদ্র মৎস্যজীবী জেলে সমিতির শায়েস্তাবাদ ইউনিয়ন সভাপতি খোরশেদ আলম বলেন, ‘যারা নিষেধাজ্ঞার সময় ইলিশ ধরছে, তারা এলাকার পোলাপান। কেউ ঢাকা, কেউ চট্টগ্রাম থেকে ছুটিতে এসে মাছ ধরছে। প্রতিবছরই তারা আসে। কিন্তু এবার আগতদের সংখ্যা তিনগুণ বেড়েছে। তারা একাধিক জাল বানিয়ে রাখছে। একটা নিয়ে গেলে আরেকটা নিয়ে নামে। বেশিরভাগ মাছ আমাদের চোখের সামনে দিয়ে বরিশাল শহরে চলে যায়। আমাদের তো কোনও বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া নেই। তাই কিছু করতে পারছি না।’
তার অভিযোগ, ‘যারা প্রকৃত জেলে, তারা মাছও ধরে না, চালও পায় না। যাদের দাপট আছে তারা মাছও ধরে, চালও নেয়।’
তিনি আরও বলেন, বরিশাল বিভাগের ছয় জেলায় জেলের সংখ্যা ৩ লাখ ১৪ হাজার। এদের মধ্যে কার্ডধারী জেলের সংখ্যা ২ লাখ ২৭ হাজার। তবে গত ৯ অক্টোবর থেকে ইলিশ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলেও এখন পর্যন্ত সরকারি সহায়তার চাল পায়নি অনেক জেলে।
অভিযোগ রয়েছে, নিষেধাজ্ঞার সময় জেলেদের সহায়তার চাল গুদামে আসলেও তা উত্তোলন করেন না দায়িত্বরত ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানরা। এ কারণে কার্ডধারী জেলেরা সময়মতো চাল পাচ্ছেন না।
বরিশাল সদর উপজেলা শায়েস্তবাদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আরিফুজ্জামান মুন্নাসহ একাধিক চেয়ারম্যান বলেন, চাল বিতরণের আগে অনেক কাজ থাকে, তা সম্পন্ন করার পরই চাল বিতরণ করা হয়। আমাদের কাজ শুধু জেলেদের চাল বিতরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আরও অনেক কাজ রয়েছে, তাও করতে হয়। এ কারণে জেলেদের চাল বিতরণে কিছুটা দেরি হয়।








