একাত্তরের রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও স্বাধীনতাবিরোধীদের প্রথম পর্বের যে তালিকা মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রকাশ করেছে, তাতে বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার প্রতিমন্ত্রী শাহজাদা আবদুল মালেক খানের নামও রয়েছে। তিনি মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত মন্ত্রিসভার শিল্প প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। সেই সঙ্গে ছিলেন তৎকালীন বৃহত্তর পটুয়াখালী জেলার বাকশালের গভর্নর।
তালিকার ২১ নম্বর পৃষ্ঠায় ১৯৭২ সালের ১৯ জুলাই দায়ের করা মামলায় তার নাম আছে ৭৫ নম্বরে। মামলা নম্বর-৪৪। মালেক খানের বাড়ি বরগুনার বেতাগী উপজেলার কাউনিয়া গ্রামে। তার বাবার নাম আলী আবদুল্লাহ খান।
রাজাকারের তালিকায় তার নাম আসায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বরগুনা জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম, মুক্তিযুদ্ধ ৭১-সহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠন।
বরগুনা জেলা মুক্তিযুদ্ধ সংসদের সাবেক কমান্ডার আবদুর রশিদ বলেন, ‘মালেক খান ছিলেন দক্ষিণাঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও আওয়ামী লীগের একনিষ্ঠ নেতা। রাজাকারের তালিকায় তার নাম আসাটা দুঃখজনক। এটা আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য লজ্জার। যারা একাত্তরে আমাদের সঙ্গে ছিলেন, কিংবা আমাদের সহযোগিতা করেছিলেন তারা আজ রাজাকারের তালিকায়। প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ থাকবে, এই তালিকা প্রত্যাহার করে পুনরায় প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে তথ্য সংগ্রহ করে রাজাকারের তালিকা প্রস্তুত করা হোক।’
বেতাগী পৌরসভার মেয়র এবিএম গোলাম কবির বলেন, ‘শাহজাদা আবদুল মালেক খান বরগুনার বেতাগী নয়, সারা দক্ষিণাঞ্চলের গর্বের বিষয় ছিলেন। তিনি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে একই মন্ত্রিসভায় মন্ত্রিত্ব করেছেন। আজ তারই নাম রাজাকারের তালিকায়। আমরা এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।’
এ বিষয়ে শাহজাদা মালেক খানের ছেলে মন্টি খান বলেন, ‘আমরা হতবাক হয়েছি, বিস্মিত হয়েছি। আমার বাবা ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। কিন্তু আজ তিনি রাজাকারের তালিকায়। কী বলবো ঠিক বুঝতে পারছি না। তবে প্রকাশিত তালিকা প্রত্যাহারের দাবি জানাই। সেই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ থাকবে, তিনি যেন বিষয়টি দেখেন।’
মন্টি খান আরও বলেন, ‘আমার বাবা ছিলেন বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত আস্থাভাজন। তাই তো মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময় যে সরকার গঠন করা হয়েছিল, সেখানেও বাবাকে শিল্প প্রতিমন্ত্রী হিসেবে রাখা হয়েছিল। ছয় দফা আন্দোলনে গোটা দক্ষিণাঞ্চলে তিনি বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন।’
প্রসঙ্গত, শাহজাদা আবদুল মালেক খান ১৯৫৪ সালে বরিশাল বিএম কলেজে অধ্যাপনার মাধ্যমে তার কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৬১ সালে শুরু করেন আইন ব্যবসা। ৬৬-এর ছয় দফা আন্দোলনে গোটা বরিশাল অঞ্চলের পালন করেছিলেন বিশেষ ভূমিকা। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে পাথরঘাটা-বরগুনা আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে অসহযোগ আন্দোলনে বিভিন্ন স্থানে, বিশেষ করে বেতাগী, বামনা, পাথরঘাটা ও কাঁঠালিয়া থানার নেতৃত্ব দেন তিনি। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার পর মুজিব নগরের অস্থায়ী সরকারের অধীনে স্বাধীনতা যুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সরকারের মন্ত্রিপরিষদে শিল্প প্রতিমন্ত্রী হিসেবে যোগ দেন মালেক খান। ২০০৭ সালের ১ এপ্রিল তিনি মৃত্যুবরণ করেন।








