১২ বছর আগে বরিশালসহ দেশের ৯টি সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ইলেক্ট্রো মেডিক্যাল বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। দেশের হাসপাতালগুলোর রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য ব্যবহৃত ভারী যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণে চার বছর মেয়াদি এই বিষয়টি চালু করা হয়। এই বিষয়ে পড়ে যারা পাস করেবেন, তারা এসবের রক্ষণাবেক্ষণ করবেন। কিন্তু, তারা এখনও বেকার। পদ সৃষ্টি না হওয়ায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হয়নি। তাদের দাবি পদ সৃষ্টি করে যত দ্রুত সম্ভব নিয়োগের। এতে করে সারা বছর সচল থাকবে হাসপাতালগুলোর পরীক্ষা-নীরিক্ষার যন্ত্রপাতি।
সহজে সরকারি চাকরি পাওয়ার আশায় ২০০৫-০৬ শিক্ষাবর্ষে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী বরিশাল সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ভর্তির জন্য আবেদন করেন। প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নির্বাচিত মাত্র ৬০ জন শিক্ষার্থীকে ভর্তি করা হয়।
বরিশাল পলিটেকনিক থেকে পাস করা শিক্ষার্থীরা জানান, এটি একেবারে নতুন বিষয় ছিল। পড়াশোনায় বেগ পেতে হলেও যখন চিন্তা করতাম চার বছর পর পাস করে বের হলেই চাকরি। সংসারে কিছুটা হলেও সাহায্য করা যাবে। তাই ভর্তি হয়েছিলাম। কিন্তু, যে চিন্তাধারা নিয়ে আমরা ভর্তি হয়েছিলাম, তা এখন হতাশায় পর্যবসিত হয়েছে। আমাদের পর বরিশাল থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন সরকারি পলিটেকনিক থেকে ৮টি ব্যাচ বের হলেও দেশে চাকরির ক্ষেত্র তৈরি হয়নি। সরকার এখন পর্যন্ত কোনও হাসপাতালে এ বিভাগের প্রকৌশলীদের জন্য কোনও পদ সৃষ্টি না করায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এ নিয়ে বিভিন্ন সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলন হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
তারা আরও জানান, এক যুগ পার হলেও এ বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নেওয়ার জন্যও সরকার থেকে কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। উচ্চতর ডিগ্রির ব্যবস্থা থাকলে ইতোমধ্যে আমরা বিএসসি প্রকৌশলী হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতাম। এতে করে নতুন নতুন যে যন্ত্রপাতি আসছে তা সচল করতে আরও পারদর্শী হওয়া যেত। অথচ আমাদের পরিবার কত আশা-ভরসা নিয়ে এ বিভাগে ভর্তি করিয়েছিল। তার সন্তান পাস করে ভালো চাকরি করবে, সংসারের হাল ধরবে। কিন্তু, চাকরি তো দূরের কথা বেকার হয়ে পরিবারের ওপর বোঝা হয়ে থাকতে হচ্ছে।
বরিশাল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে বর্তমানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা জানান, সামান্য ত্রুটির কারণে বছরের পর বছর অচল থাকছে শেরেবাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের কোটি কোটি টাকা মূল্যের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ভারী যন্ত্রপাতি। আর যন্ত্রপাতি ত্রুটিমুক্ত করতে প্রকৌশলী না থাকায় ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে রোগীদের।
শিক্ষার্থীরা আরও জানান, ক্লাস চলাকালীন শেরেবাংলা মেডিক্যালের ভারী যন্ত্রপাতির ওপর এবং ক্লাসেও রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ব্যবহৃত বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ত্রুটি মুক্ত করতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এ কারণে চার বছর মেয়াদী কোর্সের মাধ্যমে আমরা ওই সব যন্ত্রপাতি ত্রুটিমুক্ত করতে পারদর্শী হয়েছি। সামান্য ত্রুটির কারণে বিভিন্ন উপজেলা হাসপাতালগুলোর এক্সরে মেশিন থেকে শুরু করে রোগীর পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রপাতি বছরের পর বছর ধরে অচল থাকছে। এতে করে ওই মেশিনের আয়ু বসে বসেই শেষ হচ্ছে। আর আমাদের নিয়োগ দেওয়া হলে কোনও যন্ত্রপাতি অচল থাকবে না। এ কারণে দুর্ভোগও পোহাতে হবে না রোগীদের।
বরিশাল সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ইলেক্ট্রো মেডিক্যালের ইন্সট্রাক্টর মো. কবির হোসেন বলেন, ‘প্রতি বছর শত শত দক্ষ ইঞ্জিনিয়ার বের হলেও নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি না থাকা ও উচ্চতর ডিগ্রির সুযোগ সৃষ্টি না হওয়ায় হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়েছে এ বিভাগের শিক্ষার্থীরা। এ বিভাগ থেকে যারা প্রকৌশলী হয়ে বের হচ্ছেন, তারা সবাই হাসপাতালের ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি সচল করতে পারদর্শী।’ এ বিভাগে শিক্ষার্থী ধরে রাখতে অতি দ্রুত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের দাবি জানান এই শিক্ষক।
শেরেবাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. বাকির হোসেন বলেন, ‘আমরাও চাচ্ছি ভারী যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণে প্রকৌশলীর পদ সৃষ্টি করে ইলেক্ট্রো মেডিক্যাল বিষয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়োগ দেওয়া হোক। এতে রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি সচল রাখা সম্ভব হবে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।’
বরিশাল সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ প্রকৌশলী মো. রুহুল আমিন বলেন, ‘বিষয়টি মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তর অবহিত রয়েছে। এমনকি সংসদের প্রশ্ন-উত্তর পর্বেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।’
উল্লেখ্য, দেশের ৯টি সরকারি পলিটেকনিক ইনিস্টিটিউট থেকে প্রায় ৫ হাজার শিক্ষার্থী ইলেক্ট্রো মেডিক্যাল বিষয়ে পাস করে সরকারি নিয়োগের অপেক্ষায় রয়েছেন। এছাড়া ওইসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বর্তমানে আরও ২ হাজারের অধিক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি পলিটেকনিকেও অধ্যয়নরত রয়েছে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী।








