গত বছর হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে বরগুনা সদর উপজেলার গোলবুনিয়া শিশু-কিশোর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নাসির হাওলাদারের মৃত্যু হয়েছিল বলে দাবি করেছিলেন স্ত্রী ফাতিমা আক্তার মিতু। করোনা মহামারি ও ঈদ থাকায় তখন বিষয়টি নিয়ে কেউ তেমন মাথা ঘামাননি। তবে ঘটনার ৯ মাস পর পুলিশের কাছে আসা একটি ফোনকল রেকর্ড বদলে দিয়েছে সবকিছু। যে স্ত্রী দাবি করেছিলেন হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে স্বামী মারা গেছেন, তিনিই এখন হত্যার আসামি। প্রেমিকের সঙ্গে যৌথ পরিকল্পনায় নিজের স্বামীকে শ্বাসরোধে হত্যার পর স্বাভাবিক মৃত্যু বলে চালাতে চেয়েছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
ইতোমধ্যে স্বামীকে হত্যার অভিযোগে স্ত্রী ও তার প্রেমিককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
বুধবার (১০ ফেব্রুয়ারি) রাত সাড়ে ১১টার দিকে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মেহেদী হাসান, বরগুনা থানার ওসি তারিকুল ইসলাম, ওসি (তদন্ত) সহিদুল ইসলাম মিলন ও ডিবির ওসি আবুল বাশারের নেতৃত্বে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করা হয়। পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছেন গ্রেফতার দুই জন।
গ্রেফতার ফাতিমা আক্তার মিতু বরগুনা পৌরসভার থানাপাড়া এলাকার মাহতাব হোসেনের মেয়ে এবং রাজু মিয়া ঢলুয়া ইউনিয়নের গুলবুনিয়া এলাকার বারেক মিয়ার ছেলে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ফাতিমা আক্তার মিতুর প্রেমিক রাজু তার মোবাইল ফোনটি বরগুনার একটি দোকানে চার্জ করতে দেন। সেখান থেকে মোবাইলটি হারিয়ে যায়। হারিয়ে যাওয়া ফোনে নাসিরকে হত্যার পরিকল্পনা এবং রাজু ও মিতুর কথোপকথনের রেকর্ড ছিল। পরে ওই ফোনের কথোপকথনের রেকর্ড পায় নাসিরের স্বজনরা। এর পরিপ্রেক্ষিতে থানায় অভিযোগ করেন নাসিরের বড় ভাই জলিল হাওলাদার।
পুলিশ জানায়, গত বছরের ২৩ মে বরগুনার শিক্ষক নাসির হাওলাদারকে ঘুমের ওষুধ খাওয়ানোর পরে শ্বাসরোধে হত্যা করে স্ত্রী মিতু আক্তার ও তার প্রেমিক রাজু মিয়া। পরে স্বামী হার্ট অ্যাটাক করেছে জানিয়ে তড়িঘড়ি করে পরদিন জানাজা শেষে দাফন করা হয়। হত্যার এ বিষয়টি একরকম ধামাচাপা পড়ে যায়। কিন্তু ঘটনার ৯ মাস পর পুলিশের হাতে আসে হত্যার পরিকল্পনার ফোনকল রেকর্ড। এ ঘটনায় নাসিরের বড় ভাই মো. জলিল হাওলাদার বাদী হয়ে বরগুনা সদর থানায় অভিযোগ করলে তদন্তে নামে পুলিশ। পরে ঘটনার প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় স্ত্রী ফাতিমা আক্তার মিতু ও তার প্রেমিক রাজুকে গ্রেফতার করা হয়।
নিহতের ভাই আবদুল জলিল হাওলাদার বলেন, নাসির উদ্দিনের সঙ্গে দশ বছর আগে ফাতিমা আক্তার মিতুর বিয়ে হয়। তাদের নুসরাত (৮) ও নাঈম (৫) নামে দুই সন্তান রয়েছে। দুই বছর আগে ঢলুয়া ইউনিয়নের গোলবুনিয়া গ্রামের আবদুল বারেকের ছেলে কলেজছাত্র রাজুর সঙ্গে মিতুর প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। মিতু ও রাজু সম্পর্কে দাদি-নাতি। প্রেম থেকে তারা অনৈতিক সম্পর্কেও জড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি নাসির টের পাওয়ায় তাকে হত্যা করা হয়। আমরা এই ঠান্ডামাথার খুনে সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানাই।
ডিবি পুলিশের ওসি আবুল বাসার সাংবাদিকদের বলেন, স্বামীর অর্থসম্পদ নিজের করে নেওয়ার জন্য প্রেমিকের সহায়তায় ওই স্কুলশিক্ষককে হত্যার পরিকল্পনাসহ ১৩টি কল রেকর্ড বুধবার (১০ ফেব্রুয়ারি) রাতে হাতে পাই। এরপরই সদরের বড়ইতলা এলাকা থেকে প্রথমে প্রেমিক রাজু মিয়াকে আটক করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে হত্যার কথা স্বীকার করে রাজু। এরপর মিতু আক্তারকে সদরের থানাপাড়ার নিজ বাসা থেকে আটক করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তিনিও স্বামীকে হত্যার কথা স্বীকার করেছেন।
এ বিষয়ে সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তারিকুল ইসলাম জানান, রাজুর হারিয়ে যাওয়া মোবাইল ফোন ঢলুয়া ইউনিয়নের পোটকখালী বাজারের এক দোকানদার পেয়েছিল। ওই ফোনের কল রেকর্ডে হত্যার পরিকল্পনার তথ্য পাওয়া যায়। কল রেকর্ডসহ মোবাইল ফোনটি ওসির হাতে চলে এলে বুধবার রাতেই মিতু ও রাজুকে গ্রেফতার করা হয়। নাসিরের বড় ভাই আবদুল জলিল হাওলাদার বাদী হয়ে মিতু ও রাজুকে আসামি করে হত্যা মামলা করেছেন বলে জানান তিনি।









