চলে গেলেন ভাষা সৈনিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ইউসুফ কালু (৯১)। সোমবার (২৯ মার্চ) সন্ধ্যা ৬টার দিকে বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন শহীদ আবদুর রব সেরনিয়াবাত বরিশাল প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক কাজী মিরাজ।
সাংস্কৃতিক সংগঠন সমন্বয় পরিষদের সাবেক সভাপতি কাজল ঘোষ বলেন, ‘মঙ্গলবার সকাল ১০টায় নগরীর চৈতন্য মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে তার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। জানাজা শেষে সেখানেই রাষ্ট্রীয় সম্মাননা প্রদান করা হবে। এরপর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে নিজ বাড়ি পিরোজপুরের ভান্ডারিয়ায়। সেখানে পারিবারিক গোরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন হবে।’
এই ভাষা সৈনিকের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সদস্য আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ এমপি, বরিশাল সদর আসনের এমপি পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক শামীম, বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ, বরিশালের জেলা প্রশাসক জসীম উদ্দিন হায়দারসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
পারিবারিক সূত্র থেকে জানা গেছে, গ্রামের পাঠশালার পড়াশোনা শেষে বরিশাল বিএম স্কুলে ভর্তি হন ইউসুফ কালু। ১৯৪৮ সালে অষ্টম শ্রেণিতে অধ্যয়নত অবস্থায় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন তিনি। প্রগ্রেসিভ ছাত্রফ্রন্টের নেতা এমায়দুলের নেতৃত্বে মিছিলে যোগ দিয়ে প্রথম দিনই পুলিশের লাঠির আঘাতে আহত হন। এরপর মেট্রিকুলেশন পাস করে ১৯৫১ সালে বিএম কলেজে এইচএসসিতে (কমার্সে) ভর্তি হন কালু। তখন ভাষা সংগ্রামে সম্পৃক্ততা আরও বেড়ে যায়। তৎকালীন ছাত্রলীগের সভাপতি ও বিএম কলেজ ছাত্র সংসদের ভাইস প্রেসিডেন্ট সৈয়দ গোলাম কিবরিয়াকে আহ্বায়ক করে বিএম কলেজে গঠন করা হয় ২৫ সদস্যের ভাষা সংগ্রাম পরিষদ। ওই কমিটিতে কালুর পদ ছিল। তবে কিছুদিন পরে আন্দোলনে দেশ উত্তাল হয়ে উঠলে ৮১ সদস্য বিশিষ্ট বৃহত্তর বরিশাল ভাষা সংগ্রাম পরিষদে যুক্ত করা হয় তাকে।
১৯৫৪ সালে নির্বাচনের আগে বরিশালে প্রচারণায় আসেন পাকিস্তান মুসলিম লীগ সভাপতি ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী খান আব্দুল কাইউম। তখন কালু ও তার সহযোদ্ধারা রাষ্ট্রভাষা বাংলা ও স্বৈরাচারী সরকার নিপাত যাওয়ার দাবিতে কালো পতাকা বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। এই সময় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হলে শহরের কাউনিয়ার নিবাসী মালেক মারা য়ান। এই ঘটনায় ইউসুফ কালুসহ ৩৫ জন গ্রেফতার হলে ২২ দিন পর জামিনে মুক্ত হন।
শিক্ষাজীবনের প্রথমে ছাত্র ইউনিয়ন করেছেন কালু। ’৫২ সালে যোগ দেন ছাত্রলীগে। পরে জড়িয়ে পড়েন আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে। তিনি মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী ও প্রতিটি প্রগতিশীল আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন।
ইউসুফ কালু ১৯৩১ সালের ১৭ জানুয়ারি ঝালকাঠীর রাজাপুরের কানুদাসকাঠী মিয়াবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা ওবায়দুল করিম রাজা মিয়া ও মা ফাতেমা খাতুন। তিন ভাই ও দুই বোনের মধ্যে সবার ছোট ছিলেন তিনি। বাবা রাজা মিয়া ১৯২০ সালের দিকে কলকাতা পোর্ট কমিশনে চাকরি করতেন। পরবর্তী সময়ে চাকরি ছেড়ে দেন এবং রাজা রায় বিহারীর জমিদারির নায়েব নিযুক্ত হন। আমুয়া, ভান্ডারিয়া, কানুদাসকাঠী অঞ্চলের দায়িত্বে ছিলেন তিনি।









