X
সকল বিভাগ
সেকশনস
সকল বিভাগ

সিডর তাণ্ডবের ১৪ বছরেও স্বাভাবিক হয়নি জীবন

আপডেট : ১৫ নভেম্বর ২০২১, ১৬:৩৯

২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর বরগুনাসহ উপকূলে আঘাত হেনেছিল ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় সিডর।  ১৪ বছর পর এসে আজও সেই দিনের দুঃসহ স্মৃতির কথা মনে পড়লে আঁতকে ওঠেন উপকূলের মানুষেরা। ভয়াবহ সিডর বরগুনাসহ উপকূলবাসীর জীবনযাত্রায় রেখে গেছে ভয়াবহ ক্ষতচিহ্ন। এক ঝড়ে প্রাণ হারিয়েছে কয়েক হাজার মানুষ। ১৪ বছরেও স্বাভাবিক হয়নি স্বজন ও সম্পদ হারানো মানুষের জীবন।  

ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত সাতটা ৪০ মিনিট। মহাবিপদ সংকেতের কথা শুনে আতঙ্কিত বরগুনা উপকূলের মানুষ। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির সঙ্গে দমকা হাওয়া বইছে। সচেতন মানুষ যেতে শুরু করলো আশ্রয়কেন্দ্রে। তবে বেশিরভাগ মানুষই রয়ে গেলেন বাড়িতে। সিডরের ভয়াবহতা সম্পর্কে তারা কিছুই ধারণা করতে পারেনি। সিডরের আঘাত শুরু হলে ঘরবাড়ি উড়িয়ে নেওয়ার অবস্থা সৃষ্টি হয়। পাশাপাশি বাড়তে থাকে পানি। রাত সাড়ে ১০টার দিকে বঙ্গোপসাগরের সব জল যেন যমদূতের মতো এসে মানুষগুলোকে ভাসিয়ে নিলো। মাত্র ১০ মিনিটের জলোচ্ছ্বাসে উপকূলের কয়েক হাজার মানুষ প্রাণ হারালো। ঝড়ের তাণ্ডবে পুরো এলাকা হয়ে যায় লণ্ডভণ্ড। সকালে উপকূলের মানুষ দেখতে পেলো কেয়ামতের আলামত। লাশের পর লাশ পড়েছিল উপকূলজুড়ে। কবর দেওয়ার জায়গা পাওয়া যায়নি। এক একটি কবরে ২-৩ জনের লাশ ফেলে মাটি চাপা দেওয়া হয়। সিডরের এত বছর পরেও নিহতের সঠিক সংখ্যা পাওয়া যায়নি।

 সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সিডরের আঘাতে বরগুনা জেলার এক হাজার ৩৪৫ জন মানুষ মারা গেছেন। নিখোঁজ হন ১৫৬ জন। ৩০ হাজার ৪৯৯টি গবাদিপশু ও ছয় লাখ ৫৮ হাজার ২৫৯টি হাঁস-মুরগি মারা যায়। জেলার দুই লাখ ১৩ হাজার ৪৬১টি পরিবারের সবাই কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। গৃহহীন হয় জেলার ৭৭ হাজার ৭৫৪টি পরিবার। তবে বেসরকারি হিসাবে নিহতের সংখ্যা বলা হয়েছে এক হাজার ৬০০ জনের বেশি। 

সিডরে এত মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানে জানা যায়, ওই সময় আবহাওয়া বিভাগের সতর্কবাণী যথাযথ ছিল না। আবহাওয়া অফিস ৪ নম্বর সতর্কতা সংকেত থেকে হঠাৎ ১০ নম্বর বিপদ সংকেতের কথা ঘোষণা করে। মোংলা সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে যে সতর্কতা সংকেত প্রচার করা হয়েছিল, তা বোঝার উপায় বরগুনার মানুষের ছিল না। স্বেচ্ছাসেবকরাও ছিল প্রায় নিষ্ক্রিয়। দুই-এক জায়গায় তারা মাইকিং করলেও বেশিরভাগ জায়গায়ই কোনও সংকেত প্রচার করা হয়নি। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তথ্য অফিস মাইকিং করলেও তা ছিল শহর এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ। আবার যারা ঘূর্ণিঝড়ের সংকেত শুনেছেন, তারাও পর্যাপ্ত আশ্রয় কেন্দ্রের অভাবে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে পারেননি।

উন্নয়ন সংগঠন জাগো নারীর প্রধান নির্বাহী হোসনেয়ারা হাসি বলেন, ঘূর্ণিঝড়ের সতর্ক সংকেত স্থানীয় ভাষায় বোধগম্য করে প্রচারের ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্য ঘূর্ণিঝড় কর্মসূচির স্বেচ্ছাসেবকসহ বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে।

সিডরের পর উপকূলীয় এলাকার অবস্থা বরগুনা পাবলিক পলিসি ফোরামের আহ্বায়ক মো. হাসানুর রহমান ঝন্টু বলেন, উপকূলীয় এলাকায় আরও কমিউনিটি রেডিও স্টেশন স্থাপন করতে হবে। যাতে প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষ দ্রুত সতর্কবার্তা পেতে পারে।

তিনি আরও বলেন, বরগুনাসহ সিডর বিধ্বস্ত উপকূলীয় জনপদে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে উন্নয়নে ব্যাপক কাজ হলেও তার অধিকাংশ চলে গেছে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও এনজিওর পকেটে। তাই সিডর বিধ্বস্ত এই জনপদের মানুষের মধ্যে ত্রাণ কিংবা ঋণ বিতরণ করা হলেও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে তেমন কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

বরগুনা সদর উপজেলার সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা নলটোনা। যেখানে সিডরের এক বছর আগে থেকেই বেড়িবাঁধ ছিল না। সিডরের সময় সেখানে ২০ ফুটের মতো পানি বৃদ্ধি পেয়েছিল। ঘূর্ণিঝড়ের পরের দিনই সেখানে অর্ধশতাধিক মানুষের লাশ পাওয়া যায়। তখনও এলাকাটি পানির নিচে হাবুডুবু খাচ্ছিলো। লাশ দাফনের জন্য কোনও জায়গা পাওয়া যায়নি। পরে লাশগুলো নিয়ে আসা হয় বরগুনা-নিশানবাড়িয়া সড়কের পাশে পশ্চিম গর্জনবুনিয়া গ্রামে। দাফনের কাপড় ছাড়াই ২৯ জনকে ১৯টি কবরে মাটিচাপা দেওয়া হয়। বরগুনা প্রেসক্লাবের সহযোগিতায় স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা সংগ্রাম প্রাথমিকভাবে ইট দিয়ে কবরস্থানটি ঘিরে দিয়েছিল। বর্তমান জেলা ও উপজেলা প্রশাসন বরগুনা প্রেসক্লাবের সহযোগিতায় সেখানে সিডর স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করেছেন। সারিবদ্ধ কবর দেখে মানুষ এসে থমকে দাড়ায়। কেউ কেউ কান্না চেপে রাখতে পারেন না। সিডরের স্মৃতি হয়ে আছে কবরগুলো।

শরণখোলার সাউথখালিতে বাঁধের বিভিন্ন অংশের ব্লক ধসে গেছে সার্বিক বিষয়ে বরগুনার জেলা প্রশাসক হাবিবুর রহমান বলেন, সিডর বাংলাদেশের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়গুলোর মধ্যে একটি। এই ঝড় কেড়ে নিয়েছে উপকূলের মানুষের সম্বল। কেড়ে নিয়েছে আপনজনদের। তাই এ ক্ষতি অপূরণীয়। তবু সহায়তাদানকারী সংস্থাগুলো সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কাজ করলে উপকূলবাসী স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে। একইসঙ্গে পরবর্তী ভয়াবহতার হাত থেকেও রক্ষা পাবে।

 

/টিটি/এমওএফ/
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে দায়ী করছেন পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি কর্মীরা
দল বদলের হিড়িককেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে দায়ী করছেন পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি কর্মীরা
৬ মিনিটে তিন গোলে চ্যাম্পিয়ন ম্যান সিটি
৬ মিনিটে তিন গোলে চ্যাম্পিয়ন ম্যান সিটি
এবারও কি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে পারবে বাংলাদেশ?
এবারও কি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে পারবে বাংলাদেশ?
মিরপুর টেস্টে পয়েন্টের আশায় বাংলাদেশ 
মিরপুর টেস্টে পয়েন্টের আশায় বাংলাদেশ 
এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
মারা গেছে ভেসে আসা অসুস্থ মা ডলফিন
মারা গেছে ভেসে আসা অসুস্থ মা ডলফিন