দুমকি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য অ্যাডভোকেট হারুন-অর-রশীদকে স্বাগত জানাতে সড়কে শিক্ষার্থীদের জোর করে দুই ঘণ্টার বেশি সময় দাঁড় করিয়ে রাখার অভিযোগ উঠেছে। তবে কলেজের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ এবং নিয়মভঙ্গ করে শিক্ষার্থীদের সড়কে দাঁড় করানোর কারণে বিশেষ অতিথি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আমন্ত্রিত থাকলেও তারা অনুষ্ঠানে অংশ নেননি। তারা বলছেন, সরকারি বিধি ভঙ্গ করে যে সব শিক্ষক জোর করে শিক্ষার্থীদের সড়কে দাঁড় করিয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রবিবার (১৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরে পটুয়াখালী জেলার দুমকি উপজেলার আজিজ আহম্মেদ ডিগ্রি কলেজের পরিচালনা পরিষদের (অ্যাডহক কমিটি) প্রথমবারের মতো সভাপতি মনোনীত হওয়ায় হারুন-অর-রশীদকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন অধ্যক্ষ মো. আহসানুল হক।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ব্যক্তিরা জানান, লোক সমাগম বাড়াতে উপজেলার সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের অনুষ্ঠানে আনা হয়। এছাড়া চরবয়েড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়, জয়গুণনেছা মাধ্যমিক বিদ্যালয়, সাবেরা আজিজ বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং মুরাদিয়া বশিরিয়া ফাজিল মাদ্রাসার শিক্ষক, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীরা উপস্থিতি ছিলেন। অনুষ্ঠানে তাদের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিক্ষার্থীরা বলেন, রবিবার সকাল ১০টায় অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু উপজেলা চেয়ারম্যান বিলম্বে আসায় সাড়ে ১১টা পর্যন্ত বিভিন্ন শিক্ষার্থীদের সড়কের দুই পাশে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। চেয়ারম্যানের আগমনকে কেন্দ্র করে চরবয়েড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সামনের দুমকী-বগা ব্যস্ততম সড়কের ওপর তোরণ নির্মান করা হয়। রাস্তার দুই পাশে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকায় অনেকেই অসুস্থতা বোধ করেন।
এদিকে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ওই উপজেলার অন্তত চারটি মাধ্যমিক এবং একটি কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীরা অংশ নেওয়ায় পাঠদান ব্যহত হয়েছে।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক বলেন, শিক্ষকদের নিয়ে প্রধান শিক্ষক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যাওয়ার কারণে পাঠদান বন্ধ ছিল। শুধু শিক্ষার্থী নয়, শিক্ষক-কর্মচারীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা হয়।
তারা আরও বলেন, অনুষ্ঠানের জন্য অন্তত পাঁচ দিন আগে প্রতিষ্ঠান প্রধানের সঙ্গে চেয়ারম্যান নিজে কথা বলেছেন। শিক্ষক, শিক্ষার্থী আর কর্মচারীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। তাই নিরুপায় হয়ে ঝামেলা এড়াতে অনুষ্ঠানে আসতে বাধ্য হয়েছি।
তবে উপজেলা চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য হারুন-অর-রশীদ বলেন, কলেজ কর্তৃপক্ষ আমাকে সংবর্ধনা দিয়েছে। আমি সেই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছি। অনুষ্ঠানে আসার পথে সড়কে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীরা আমাকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানিয়েছে, এটা আমার অপরাধ নয়। স্কুল কর্তৃপক্ষ এমন আয়োজন করেছে, এ বিষয়ে আমার জানা ছিল না।
অনুষ্ঠানে আগাত জয়গুন্নেসা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ইউসুফ হোসেন বলেন, আমার স্কুলটি কলেজের কাছাকাছি। ওই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আমাকে বাধ্য করা হয়েছে। আমার কিছু করার ছিল না। এছাড়া আরও চার-পাঁচটি স্কুলের শিক্ষার্থীরা ওই অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছে।
চরবয়েড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুস সাত্তার বলেন, উপজেলা চেয়ারম্যান আমার বিদ্যালয়ের সভাপতি। তাকে সংবর্ধিত করতে রাস্তায় বিদ্যালয়ের উদ্যোগে একটি তোরণ নির্মাণ করেছি। তার নির্দেশনা অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের সড়কে দাঁড় করিয়ে সংবর্ধনা দিয়েছি। আমি নিরুপায় ছিলাম, কিছু করার ছিল না।
তবে আজিজ আহম্মেদ ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ এহসানুল হক বলেন, কাউকে বাধ্য করার বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকেরা উপস্থিত থেকে উপজেলা চেয়ারম্যানের দিকনির্দেশনামূলক ভাষণ শুনেছেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনও শিক্ষার্থীকে রাস্তায় দাঁড় করানো হয়নি কিংবা দাঁড়ায়নি। কেউ হয়তো উৎসুকভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে।
এ বিষয়ে দুমকি উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বদরুন নাহার ইয়াসমিন বলেন, অনুষ্ঠান সফল করতে উপজেলা চেয়ারম্যান কয়েকদিন ধরেই চাপ প্রয়োগ করেছিলেন। তিনি চাচ্ছিলেন, অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের অংশ গ্রহণ নিশ্চিতে আমি যেন স্কুলগুলোর প্রধানদের বাধ্য করি। তবে আমি কোনও প্রতিষ্ঠান প্রধানকে যোগ দেয়ার জন্য বলিনি। এ বিষয়টি আগে থেকেই জানার কারণে আমি ওই অনুষ্ঠান বর্জন করেছি।
তিনি আরও বলেন, শুনেছি শিক্ষার্থীদের সড়কে দাঁড় করানো হয়েছে। এমনকি অনুষ্ঠানস্থলে জোর করে নেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠান প্রধানরা কেন শিক্ষার্থীদের নিয়েছেন এ বিষয়ে তাদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হবে। পাশাপাশি কর্তৃপক্ষের কাছেও ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সুপারিশ করা হবে।
দুমকি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আল ইমরান বলেন, উপজেলা চেয়ারম্যান এই সংবর্ধনার জন্য কয়েকদিন ধরেই স্কুলের শিক্ষার্থীদের নেওয়ার জন্য চেষ্টা করছিলেন। আমি এর ঘোর বিরোধিতা করেছি। ওই অনুষ্ঠান আমি বর্জন করেছি।
প্রসঙ্গত, জনপ্রতিনিধিদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে কোমলমতি শিক্ষার্থী ও শিশুদের সড়কে দাঁড় করানো যাবে না বলে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা রয়েছে। এ ধরনের কাজ করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ২০১৪ সালর ২৭ জানুয়ারি এ বিষয়ে পরিপত্র জারি করে। এছাড়া জাতীয় কিংবা রাষ্ট্রীয় দিবস ছাড়া কোনও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সংবর্ধনার নামে রাস্তায়-মাঠে শিক্ষার্থীদের দাঁড় করিয়ে না রাখার জন্য উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞাও রয়েছে।









