ভোট কারচুপির কারণে ব্যাপক সংঘর্ষ ও সহিংসতার মধ্য দিয়ে উজিরপুর উপজেলার সাত ইউনিয়নের মধ্যে সাত ইউনিয়নে নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। মঙ্গলবারের ইউপি নির্বাচনে পাল্টাপাল্টি হামলায় চেয়ারম্যান প্রার্থীসহ কমপক্ষে ২০ জন আহত হয়েছেন।
প্রত্যেক ইউনিয়নে নৌকার প্রার্থী ব্যতীত অন্যান্য চেয়ারম্যান প্রার্থীদের অ্যাজেন্ট বের করে দেওয়া, জোর করে ব্যালট পেপার ও বাক্স ছিনিয়ে নেওয়া, প্রকাশ্যে নৌকা প্রতীকে ভোট দিতে বাধ্য করা, প্রিজাইডিং অফিসারদের মাধ্যমে ভোট কাটার অভিযোগে সাত ইউনিয়নে বিএনপির সাত চেয়ারম্যান প্রার্থী ওয়ার্কাস পার্টির এক, সতন্ত্র দুইজনসহ মোট ১০ চেয়ারম্যান প্রার্থী নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকাল ৮ টায় ভোট গ্রহণ শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই উপজেলার হারতা ইউনিয়নের জামবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে নৌকা প্রতীকের চেয়ারম্যান প্রার্থী ডা. হরেন রায় ১০টি মোটরসাইকেল নিয়ে ৩০/৪০ জন সমর্থকসহ জামবাড়ী কেন্দ্র দখল করেন। তারা চেয়ারম্যানদের ব্যালট পেপার ও বাক্স ছিনিয়ে নিয়ে প্রকাশ্যে সিল দেওয়া শুরু করেন।
এ ঘটনায় উত্তেজিত এলাকাবাসী ও উপস্থিত ওয়ার্কার্স পার্টির কর্মী ও সমর্থকরা আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থী হরেন রায়কে একঘন্টা অবরুদ্ধ করে রাখে এবং তার সঙ্গে আসা সন্ত্রাসী বাহিনীর ৭টি মোটরসাইকেল গুঁড়িয়ে দেয়।
খবর পেয়ে বিজিবি, র্যাব, পুলিশের স্ট্রাইকিং ফোর্স নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছান উজিরপুর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ মো. নুরুল ইসলাম। চেয়ারম্যান প্রার্থী হরেন রায়কে ও ছিনতাইকৃত ব্যালটবাক্স উদ্ধার করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন বলে জানান।
পরে ওই ভোট কেন্দ্রের অবস্থা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কেন্দ্রটির নির্বাচন স্থগিত ঘোষণা করেন।
এ সময় উভয়পক্ষের হামলায় সুধাংশু রায়(৪৭), দুলাল মজুমদার(২৭), নরেশ বাড়ৈ(৩০), তাপস মল্লিক(৪০), মনোরঞ্জন মল্লিক(৪০), উত্তম ভাংরা(৪৫), বিমল বাড়ৈ(১৮), নির্মল বল্লভ(৪৫), হরেন মুড়ি(৪৫), ডাঃ আশুতোষ মল্লিক(৪০) আহত হন।
গুরুতর আহত মনোরঞ্জন মল্লিক ও সুধাংশুকে বরিশাল শেবাচিম হাসপাতালে পাঠানো করা হয়।
এছাড়া সকাল সাড়ে ১০ টায় হারতা ইউনিয়নের মধ্য কালবিলা (বড়ইভিটা) কেন্দ্র থেকে আওয়ামী লীগের সমর্থকরা ৩শ’ ব্যালট পেপার জোর করে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় ওয়ার্কার্স পার্টির সমর্থকদের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। ফলে ১ ঘন্টা ২০ মিনিট সেখানে ভোট গ্রহণ স্থগিত ছিল।
শোলক ইউনিয়নের কচুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ-বিএনপির সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে সোহাগ(৩২), মাহমুদা(২৮) আহত হন এবং প্রিজাইডিং অফিসার আল-আমিন মিঞা সকাল ১০টা থেকে ২ ঘণ্টা কেন্দ্রটির ভোট গ্রহন বন্ধ থাকে।
বাবরখানা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে দুপুর ১ টায় ২ সদস্য প্রার্থীর মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হলে এতে হাতেম বেপারী, কামরুল বেপারী, শাওন হাওলাদার, সিদ্দিক হাওলাদার আহত হন। এ সময় পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ২ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ে। এছাড়া ওই ইউনিয়নের উত্তর শোলক ভোট কেন্দ্রে বিএনপি প্রার্থীর চাচাকে আওয়ামী লীগ সমর্থকরা পিটিয়ে গুরুতর আহত করেছেন।
বড়াকোঠা ইউনিয়ন ডিগ্রি কলেজ কেন্দ্রে সকাল সাড়ে ৯টায় নৌকা প্রতীকের সমর্থকরা ভোটারদের উপস্থিতিতে ভোট কাটতে গেলে ধানের শীষ প্রতীকের সমর্থকরা বাধা দিলে তাদের সঙ্গে সংঘর্ষ শুরু হয়, সেখানেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশের ৭ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ে এবং দুপুর ২টায় সেখানে কোনও ভোটারদের উপস্থিতি দেখা যায়নি। সহকারী প্রিজাইডিং ও পোলিং অফিসারদের নৌকার ভোট কাটতে দেখা গেছে।
ওই ইউনিয়নের দরগাবাড়ী কেন্দ্রে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী শাহআলম হাওলাদার ও আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী অ্যাডভোকেট শহিদুল ইসলাম এর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি এনায়েত হোসেন গুরুতর আহত হন। তাদের ৪টি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করে আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে একঘন্টা অবরুদ্ধ করে রাখা হয়।
একই ইউনিয়নের মিয়াবাড়ী ভোটকেন্দ্রে সকাল ১০টায় মেম্বার প্রার্থী ইকবাল বেপারী অপর প্রার্থী প্রফুল্ল হালদারের ওপর চড়াও হন।
পশ্চিম সাতলা কেন্দ্রে দুই মেম্বর প্রার্থীর মধ্যে ভোট কাটা নিয়ে সংঘর্ষে মো. রিপন গুরুতর আহত হন এবং চারটি মোটরসাইকেল ভাঙচুর হয়।
জল্লা ইউনিয়নে গড়ইবাড়ী কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীর সমর্থকরা আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী উর্মিলা বাড়ৈর ছেলে অচিন্ত বাড়ৈ ও মেয়ে ডলি বাড়ৈকে লাঞ্ছিত করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। উত্তর মুন্সির তাল্লুক কেন্দ্রে ঐ দুইজনকে একঘন্টা অবরুদ্ধ করে রাখা হয়।
এ সব ঘটনায় শোলক ইউনিয়নের বিএনপির প্রার্থী মশিউর রহমান মনির সকাল সাড়ে ১০ টায়, ওটরার কামরুজ্জামান টুলু সকাল ১০টায়, সাতলার মেজবাহ উদ্দিন আহম্মেদ সকাল পৌনে ১০টায়, বামরাইলের আব্দুল মতিন সরদার নান্টু বেলা ১২টায়, জল্লার অধ্যাপক মিজানুর রহমান সকাল ১১ টায়, হারতায় মাওলানা সিদ্দিকুর রহমান সকাল সাড়ে ১১ টায়, আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী উর্মিলা বাড়ৈ সকাল সাড়ে ১১টায়, হারতায় ওয়ার্কাস পার্টির বিমল চন্দ্র করাতী দুপুর ১ টায় নিজ নিজ এলাকায় নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা করেন।
বিকেলে উপজেলা নির্বাচন অফিসারের বরাবরে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন এবং এ সময় উপজেলা চত্তরে সকল বর্জনকৃত প্রার্থীরা একযোগে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন।
এছাড়াও কচুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্থগিত করার পরেও পুনরায় ভোট গ্রহণ করায় এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে বলে স্থানীয় সূত্র জানান।
উপজেলা নির্বাচন অফিসার জসীম উদ্দিন জানান সংঘর্ষের কারণে জামবাড়ী কেন্দ্রটি বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
/এইচকে/







