পটুয়াখালীর গলাচিপায় সাপের কামড়ে জাকির হোসেন মৃধা (৪৫) নামে এক বিএনপি নেতার মৃত্যু হয়েছে। পরিবারের অভিযোগ, সাপের কামড়ের পর তাকে গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে অ্যান্টিভেনম না দিয়ে পটুয়াখালীতে রেফার করা হয়। পরে পটুয়াখালী নেওয়ার পথে অ্যাম্বুলেন্সে মৃত্যু হয়।
শনিবার (৮ আগস্ট) সকালে উপজেলা সদরের কালিকাপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। মৃত জাকির হোসেন গলাচিপা সদর ইউনিয়নের কালিকাপুর গ্রামের মৃধা বাড়ির মো. ফজলুল করিম মৃধার ছেলে। তিনি সদর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, শনিবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে নিজ ঘরে বসে চা খাওয়ার সময় একটি সাপ তার বাম পায়ের আঙুলে কামড় দেয়। সাপটি দেখতে পেয়ে তিনি বিষয়টি স্ত্রীকে জানান। পরে পরিবারের সদস্যরা দ্রুত তাকে গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান।
হাসপাতালের রেজিস্টার খাতা অনুযায়ী, সকাল ৭টা ৪৫ মিনিটের দিকে জাকির হোসেনকে হাসপাতালে আনা হয়। পরিবারের অভিযোগ, হাসপাতালে নেওয়ার পর তাকে অ্যান্টিভেনমসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না দিয়ে পটুয়াখালীতে রেফার করা হয়।
নিহতের বড় ভাই ও সাবেক ইউপি সদস্য আব্দুল অদুদ মৃধা বলেন, ‘হাসপাতালে কোনও চিকিৎসা দেওয়া হয়নি। অ্যান্টিভেনম দিলে আমার ভাই মারা যেতো না। কর্তব্যরত চিকিৎসক কেন অ্যান্টিভেনম ও চিকিৎসা না দিয়ে রোগীকে পটুয়াখালী রেফার করলেন, তা আমার জানা নেই। অ্যান্টিভেনম দিলে হয়তো পটুয়াখালী নেওয়ার মতো সময় পেতাম। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাই।’
অ্যাম্বুলেন্সচালক মো. জুয়েল বলেন, ‘রেফার করার পর পটুয়াখালী নেওয়ার সময় রোগীর জ্ঞান ছিল। পথে কোনও বিলম্ব হয়নি। পটুয়াখালী হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।’
অ্যান্টিভেনম না দেওয়ার বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক জান্নাতুল নাঈম তানহা। তিনি বলেন, ‘রোগীকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছিল। তার ব্লাড প্রেশার ও হার্ট রেট অনেক বেশি ছিল। এ কারণে কার্ডিয়াক ইস্যুর কথা বিবেচনা করে সিনিয়র চিকিৎসকদের সঙ্গে পরামর্শ করে অ্যান্টিভেনম না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং পটুয়াখালী হাসপাতালে রেফার করা হয়।’
এ বিষয়ে গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. মেজবাহ উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সাপে কাটা রোগীদের চিকিৎসার জন্য আমাদের হাসপাতালে অ্যান্টিভেনম ছিল। তবে জাকির হোসেনের শ্বাসকষ্ট, প্রেশার ও আশঙ্কাজনক অবস্থায় থাকায় তার শরীরে অ্যান্টিভেনম প্রয়োগ করা হয়নি।’
তিনি বলেন, ‘কর্তব্যরত চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছি, রোগীর প্রাথমিক লক্ষণ দেখে বিষধর সাপ কিনা, তা শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। তবে রোগীর শ্বাসকষ্ট ও প্রেশার বেশি থাকায় অ্যান্টিভেনম না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ বিষয়ে সিনিয়র কনসালট্যান্টের সঙ্গে পরামর্শ করে উন্নত চিকিৎসার জন্য পটুয়াখালীতে রেফার করা হয়েছে। শুধুমাত্র বিষাক্ত সাপে কাটলে সেই ক্ষেত্রে রোগীর লক্ষণ বুঝে অ্যান্টিভেনম দেওয়া হয়। নতুবা হিতে বিপরীত হতে পারে। জাকির হোসেনের শরীরে বিষধর সাপে কাটার কোনও লক্ষণ ছিল না। যে কারণে চিকিৎসক তাকে অ্যান্টিভেনম প্রয়োগ করেননি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের হাসপাতালে বর্তমানে ৪০ ভায়াল অ্যান্টিভেনম মজুত আছে। চিকিৎসা নিয়ে রোগীর পরিবারের কোনও অভিযোগ থাকলে তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকেও জানানো হয়েছে।’
এদিকে, সাপের কামড়ের পর অ্যান্টিভেনম প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা ছিল কিনা, রোগীর শারীরিক অবস্থার ভিত্তিতে চিকিৎসকের সিদ্ধান্ত যথাযথ ছিল কিনা এবং কেন অ্যান্টিভেনম দেওয়া হয়নি—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার করার দাবি জানিয়েছেন নিহতের পরিবার ও স্থানীয় লোকজন।
এনিমেল লাভার অব পটুয়াখালী সংগঠনের পরিচালক আবদুল কাইউম বলেন, ‘বিষধর সাপে কামড় দেওয়ার লক্ষণগুলো রোগীর মধ্যে ছিল। রোগীকে অন্যত্র না পাঠিয়ে হাসপাতালে রেখে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও অ্যান্টিভেনম দেওয়া প্রয়োজন ছিল। অথচ রোগীর গুরুতর অবস্থা দেখে রেফার করা হয়েছে। সড়কে নড়াচড়া করায় বিষ রোগীর শরীরে ছড়িয়ে গেছে। বিষধর সাপে কাটার পরে গলা আটকে আসা বা শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া অন্যতম লক্ষণ। হাসপাতালে পৌঁছানোর আগে রোগীর শ্বাস বন্ধ হয়ে আসা বা শ্বাস বন্ধ হচ্ছে এমন উপক্রম হলে রোগীর মুখে মুখ দিয়ে কৃত্রিম শ্বাস দেওয়া উচিত ছিল। এসব সংকটের কারণে মৃত্যু হয়েছে।’









