বরগুনায় প্রায় ১৩ মাস আগে মারা যাওয়া এক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকার নামে এখনও নিয়মিত বেতন-ভাতা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে উপজেলা শিক্ষা অফিসের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় উপজেলা শিক্ষা অফিসের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। তবে অভিযোগের বিষয়ে দায় স্বীকার না করে অফিসের সহকারী কর্মচারীদের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করছেন বরগুনা সদর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা লায়লা জেরিনা আক্তার।
অভিযোগ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বরগুনা সদর উপজেলার পশ্চিম গোলবুনিয়া শিশু-কিশোর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক তাজবিন প্রিয়া ২০২৫ সালের ২৯ মে সন্তান প্রসবের সময় মারা যান। তার মৃত্যুর বিষয়টি বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি উপজেলা শিক্ষা অফিসের সংশ্লিষ্টদেরও জানানো হয়। মৃত্যুর পর তার মৃত্যু সনদও উপজেলা শিক্ষা অফিসে জমা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এমনকি সরকারি চাকরিতে কর্মরত অবস্থায় কোনও শিক্ষকের মৃত্যু হলে পরিবারের জন্য প্রাপ্য এককালীন আর্থিক সুবিধাও তাজবিন প্রিয়ার পরিবার উপজেলা শিক্ষা অফিসের মাধ্যমে উত্তোলন করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানা গেছে।
অভিযোগের সবচেয়ে গুরুতর বিষয় হলো মৃত্যুর প্রায় ১৩ মাস পরও তাজবিন প্রিয়ার নামে নিয়মিত বেতন-ভাতা দেওয়ার ঘটনা। একজন সরকারি কর্মচারীর মৃত্যুর পর তার নামে কীভাবে মাসের পর মাস বেতন বিল তৈরি ও পরিশোধ হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সংশ্লিষ্ট মহলে।
সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, একজন শিক্ষিকার মৃত্যুর তথ্য বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও উপজেলা শিক্ষা অফিস জানার পরও কেন বেতন বিল প্রস্তুত হচ্ছে? যাচাই ও অনুমোদনের সময় বিষয়টি কেন শনাক্ত করা হলো না? মৃত্যুসনদ জমা থাকার পরও সরকারি নথিতে তার চাকরির অবস্থা কেন পরিবর্তন করা হয়নি? এ নিয়েও দেখা দিয়েছে নানা কৌতূহল।
এদিকে, একজন সরকারি শিক্ষকের মৃত্যুর তথ্য জানার পরও প্রায় ১৩ মাস ধরে তার নামে বেতন-ভাতা পরিশোধের অভিযোগকে সাধারণ ভুল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তাদের মতে, বিষয়টি প্রশাসনিক গাফিলতি, দায়িত্বে অবহেলা নাকি সরকারি অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বের করা জরুরি। মৃত শিক্ষিকার নামে গত ১৩ মাসে কত টাকা বেতন-ভাতা দেওয়া হয়েছে? কারা বেতন বিল প্রস্তুত ও অনুমোদন করেছেন? এবং অর্থ কোন হিসাবে জমা হয়েছে? এসব তথ্য যাচাই করে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনা হোক।
এ বিষয়ে নিহত স্কুলশিক্ষিকা তাজবিন প্রিয়ার স্বামী আরিফুল ইসলাম বলেন, আমার স্ত্রী গত ২৯ মে ২০২৫ সালে সন্তান জন্মদানের সময় মারা যান। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর আমি তার মৃত্যুসনদ উপজেলা শিক্ষা অফিসে জমা দিই। তবে এরপরও গত ১৩ মাস ধরে আমার স্ত্রীর ব্যাংক হিসাবে নিয়মিত মাসিক বেতন-ভাতা জমা হয়েছে, বিষয়টি আমার জানা ছিল না।
তিনি বলেন, ১৬ আগস্ট ব্যাংকের মাধ্যমে জানতে পারি, গত ১৩ মাস ধরে আমার স্ত্রীর ব্যাংক হিসাবে নিয়মিত বেতন-ভাতার টাকা জমা হচ্ছে। বিষয়টি জানতে পেরে আমি তাৎক্ষণিক উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে জানাই। এরপর গত ১৮ আগস্ট শিক্ষা অফিস থেকে আমাকে ডেকে বলা হয়, আমি নাকি লোনের আবেদন করেছি এবং আমার স্ত্রীর ব্যাংক হিসাবেও সরকারি টাকা জমা হয়েছে। এ সময় আমার কাছ থেকে একটি ব্ল্যাঙ্ক চেক রেখে বলা হয়, আমার স্ত্রীর ব্যাংক হিসাবে ২ লাখ ৯৮ হাজার টাকা জমা হয়েছে, সেটি ফেরত নেওয়ার জন্য চেকটি রাখা হয়েছে।
এই শিক্ষক বলেন, আমিও আয়লা লেমুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। আমি একটি লোনের জন্য আবেদন করি, তবে ওই ১৮ আগস্ট আমার লোনের টাকা আমার ব্যাংক হিসাবে জমা হওয়ার পরপরই উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আমার হিসাব থেকে টাকা কেটে নেন। বিষয়টি জানতে চাইলে আমি তাকে প্রশ্ন করি, কোনও ধরনের নোটিশ না দিয়ে কেন আমার টাকা কেটে নেওয়া হলো? তখন তিনি বলেন, আমাদের ভুলে আপনার স্ত্রীর ব্যাংক হিসাবে টাকা চলে গেছে, তাই তা কেটে নেওয়া হয়েছে। আমরা এখন এই টাকা সরকারি কোষাগারে জমা করে দেবো।
প্রিয়ার স্বামী আরও বলেন, আমার সঙ্গে এটা অবিচার করা হয়েছে। আমার স্ত্রীর ব্যাংক হিসাবে যে টাকা জমা হয়েছে, সেটি ব্যাংকের সঙ্গে সমন্বয় করেই তারা ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু আমার ব্যক্তিগত হিসাব থেকে টাকা কেটে নেওয়া হলো কেন? আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে ন্যায়বিচার চাই।
বরগুনা সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. মতিউর রহমান বলেন, আমরা যারা শিক্ষা বিভাগে চাকরি করি, আমাদের বেতন আইবাস সিস্টেমের মাধ্যমে আসে। এখানে ফাঁকি দেওয়ার কোনও সুযোগ নেই। তবে ওই শিক্ষিকা তাজবিন প্রিয়া মারা যাওয়ার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট স্কুলের প্রধান শিক্ষকের উচিত ছিল উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে জানানো। আর প্রধান শিক্ষক জানানোর পরও যদি এমন ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে এর সম্পূর্ণ দায়ভার উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে নিতে হবে। এই টাকা আত্মসাৎ করার কোনো সুযোগ নেই। তবে তিনি টাকাটি কীভাবে আত্মসাৎ করেছেন বা করছেন কি না, তা আমার জানা নেই। ওই টাকা সরকারি কোষাগারে জমা হওয়া উচিত। তবে সংশ্লিষ্টরা এ বিষয়ে কী করেছেন, তা আমি জানি না। যদি কেউ এই টাকা আত্মসাৎ করে থাকেন, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বরগুনা সদর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা লায়লা জেরিনা আক্তার দাবি করেন, তাজবিন প্রিয়ার মৃত্যু সনদ উপজেলা শিক্ষা অফিসে জমা দেওয়া হয়েছিল, তবে সেটি আমার কাছে পৌঁছায়নি। অফিসের কোনও কর্মকর্তা-কর্মচারী ওই কাগজপত্র উপস্থাপন না করে বিষয়টি গোপন রেখেছেন। এমনকি আমাকে ফাঁসানোর উদ্দেশেই এটি করা হয়ে থাকতে পারে।
অন্যদিকে, বিষয়টি ভুল হিসেবে উল্লেখ করে এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য সাংবাদিকদের অনুরোধও করেন উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা লায়লা জেরিনা আক্তার।
অভিযোগের বিষয়ে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আবু জাফর মো. ছালেহ বলেন, উপজেলার সব শিক্ষকদের বেতন উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার স্বাক্ষরে পাস হয়, মৃত্যু শিক্ষককে বেতন দেওয়ার বিষয়ে অফিস স্টাফদের দায়ী করার কোনও সুযোগ নেই। এসব অভিযোগের সত্যতা পেলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কারণ এটি কোনও স্বাভাবিক ভুল না। তবে তদন্ত সাপেক্ষে আমরা আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।









