সারাদেশে প্রায় ১৭ লাখ তালিকাভুক্ত জেলে রয়েছেন। তবে এদের মধ্যে এখনও প্রায় ৫ লাখ জেলে পাননি তাদের পরিচয়পত্র। এতে নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে বিড়ম্বনায় পড়ছেন অনেক জেলে। অন্যদিকে, অভিযোগ উঠেছে প্রকৃত জেলেরা পরিচয়পত্র না পেলেও অনেক এলাকাতেই জেলেদের পরিচয়পত্র দেওয়া হয়েছে অন্য পেশার লোকজনকে।
তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জেলেদের পরিচয়পত্র দেওয়া একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। সব জেলেদের তালিকাভুক্ত করা ও পরিচয়পত্র দেওয়ার জন্য ‘জেলে নিবন্ধন ও পরিচয়পত্র প্রদান প্রকল্পের’ মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানোর জন্য মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
জেলে নিবন্ধন ও পরিচয়পত্র প্রদান প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, নিবন্ধিত তালিকা না থাকায় দেশের প্রকৃত জেলেদের জীবনযাত্রার উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক সময় দুর্ঘটনা, বিভিন্ন ঝুঁকি, এমনকি মৃত্যুর ঘটনাতেও ন্যূনতম সুবিধা পান না প্রকৃত জেলেরা। তাই জেলেদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, মৎস্যখাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মৎস্য সম্পদের টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে ২০১২ সালে জেলেদের নিবন্ধন ও পরিচয়পত্র দেওয়ার কর্মসূচি গ্রহণ করে প্রায় ৮৪ কোটি টাকার প্রকল্পটি হাতে নেয় সরকার।
জানা গেছে, বর্তমানে দেশের ৪৮২টি উপজেলায় সরকার জেলেদের তালিকা তৈরি করছে। ইতোমধ্যে দেশে ১৬ লাখ ৮৫ হাজার জেলেকে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে এখনও তালিকার বাইরে রয়েছেন বিপুল সংখ্যক জেলে। অভিযোগ উঠেছে, নিবন্ধিত জেলেদের মধ্যে অনেক ‘ভুয়া’ জেলে রয়েছেন। এতে সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে অনেক প্রকৃত জেলে। আর জাল, চাল, নৌকাসহ নানা ধরনের সরকারি সাহায্য যাচ্ছে ভুয়া জেলেদের ঘরেই।
চাঁদপুরের পুরানবাজার এলাকার জেলে আবুল হাসান অভিযোগ করে বলেন, ছোটকাল থেকেই নদীতে মাছ ধরছি। কিন্তু আমরা এখনও কোনও কার্ড পাইনি। আমার মতো এ এলাকার অনেক জেলেই কার্ড পায়নি। এতে আমাদের নানা সমস্যা পোহাতে হচ্ছে। নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে কোস্টগার্ড আমাদের ধরলে আইডি কার্ড দেখাতে পারি না। অনেক সময় তারা আমাদের ডাকাত মনে করেন।
একই এলাকার জেলে করিম মিয়া বলেন, আমরা জন্মলগ্ন থেকেই জাল বাইছি। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার সময় আমাদের কোনও সরকারি সহায়তা মেলে না। আমাদের খোঁজ-খবরও কেউ নেয়নি। অথচ জেলে নন এমন লোকজন জেলে কার্ড পাচ্ছেন।
হাইমচর উপজেলার জেলে রাকিব জমাদার বলেন,‘আমরা জাল বাইয়া ভাত খাই। জেলে কার্ড মানে মাছ ধরার লাইসেন্স। কিন্তু আমরা জেলে কার্ড পাইনি। এতে নদীতে গেলে আমাদের অনেক সমস্যা হয়। আমরা এ কার্ডটা যদি পাই অনেক উপকার হবে। সদর উপজেলার বহরিয়া এলাকার জেলে জহির উদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমি জেলে হলেও কার্ড পাইনি। এলাকার শত শত জেলেও কার্ড পায়নি। অথচ রাজনৈতিক নেতাদের পেছনে ঘুরে ব্যবসায়ী, সিএনজি ড্রাইভারসহ অন্য পেশার লোকজন জেলে কার্ড পাচ্ছেন।’
চাঁদপুর জেলা মৎস্য অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, জেলায় সরকারি তালিকাভুক্ত জেলে রয়েছে ৪৬ হাজার ২৪০ জন। এর মধ্যে ২৭ হাজার ১৭৫ জনকে দেওয়া হয়েছে জেলে পরিচয়পত্র। আর সরকারি চাল সহায়তা পাচ্ছেন ৪১ হাজার ৪২ জন জেলে।
প্রকৃত জেলে হলেও পরিচয়পত্র ও সরকারি সহায়তা না পাওয়ার অভিযোগের বিষয়ে চাঁদপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. সফিকুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, জেলেদের পুনর্বাসন সরকারের একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকার। এটি বাস্তবায়নে জেলার ৮টি উপজেলায় ৪৬ হাজার ২৪০ জন জেলেকে নিবন্ধনের আওতায় আনা হয়েছে। এর মধ্যে ২৭ হাজার জনকে আইডি কার্ড দেওয়া হয়েছে। বাকিদের ছবি তোলা হয়েছে। শিগগিরই তাদের পরিচয়পত্র দেওয়া হবে।
তিনি আর বলেন, নতুন মৎস্যজীবী তালিকাভুক্ত করা একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। যখনই কারও বয়স ১৮ বছর হবে অথবা যারা বাদ পড়েছেন তারা উপজেলা মৎস্য অফিসে নির্দিষ্ট ফরমে আবেদন করলে তাদের মৎস্যজীবী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে এবং তারা সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাবেন।
জেলে নিবন্ধন ও পরিচয়পত্র প্রদান প্রকল্পের পরিচালক আরিফুর রহমান তরফদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলে জাটকা ধরা বন্ধ করতে নিবন্ধিত প্রত্যেক জেলেকে ৪০ কেজি করে চালসহ বিভিন্ন সহায়তা দেওয়া শুরু হলেই বেড়ে যায় ভুয়া জেলের সংখ্যা। ২০১২ সালের জুনে এ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। এখন পর্যন্ত যে পরিমাণ জেলের নিবন্ধন হয়েছে তার মধ্যে ১২ লাখ জেলেকে পরিচয়পত্র প্রদান করা হয়েছে।
জেলেদের অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, জেলে তালিকাভূক্তির জন্য উপজেলা পর্যায়ে কমিটি রয়েছে। কয়েক ধাপে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জেলেদের সরকারি তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে। তাই অপেশাদার কেউ জেলেদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুযোগ খুবই কম। তারপরও কোথাও কোথাও অপেশাদার জেলে তালিকাভুক্তির অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখবো।
আরও পড়ুন: চার দিন পর লাশ ফেরত দিলো বিএসএফ
/এমও/টিএন/
আপ: এইচকে








