রোয়াংছড়িতে জেএসএসএর দুই গ্রুপের সংঘর্ষ

‘আমি বৃদ্ধ, তাই পালাতে পারিনি’

এস বাসু দাশ, বান্দরবান
১৩ জুলাই ২০১৬, ১৩:১১আপডেট : ১৩ জুলাই ২০১৬, ১৩:২২

ঘরের দরজায় তালা। মানুষের সাড়া পেয়ে পেছন থেকে বেরিয়ে এলেন ৭০ বছর বয়েসী এক বৃদ্ধ। উ ম্রা চিং মারমা। সাংবাদিক পরিচয় দিতে মারমাভাষী এই বৃদ্ধ কান্নায় ভেঙে পড়েন। সান্ত্বনায় আশ্বস্ত হয়ে আধো আধো বাংলায় বলেন, ‘সেদিন সন্ধ্যায় সন্ত্রাসীদের নির্যাতনে সবাই পালিয়ে যায়। আমি বৃদ্ধ মানুষ পালাতে পরিনি। তাই ঘরে থেকে যাই।’

বৃদ্ধ উ ম্রা চিং মারমা বান্দরবানের রোয়াংছড়ি উপজেলার তারাছা ইউনিয়নের তালুকদার পাড়ার অধিবাসী।

তারাছা ইউনিয়নের সন্ত্রস্ত একটি পরিবার

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ৫ জুলাই সন্ধ্যায় চাঁদাবাজির টাকার ভাগাভাগি নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে জনসংহতি সমিতির  (জেএসএস) পাহাড়ি দুই সশস্ত্র দলের ১০ জন। বিরোধের এক পর্যায়ে পুলিশ উপস্থিত হলে পরে এর পেছনে স্থানীয়দের দুষে নির্যাতন ও দফায় দফায় হত্যার হুমকি দেয় দুর্বৃত্তরা। হুমকির মুখে এলাকা ছেড়ে বান্দরবান শহরে আশ্রয় নেয় ৫০টি পাহাড়ি পরিবারের প্রায় দুই শতাধিক মানুষ।

জানা যায়, পালিয়ে যাওয়া ৫০ পরিবারের মধ্যে মঙ্গলবার পর্যন্ত ফিরেছে ৩০টি পরিবার। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দেওয়া শেষ খবরে, নিরাপত্তা বিধানে পুলিশি তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে বলে জানা যায়।

এঘটনায় পুলিশ অস্ত্রসহ বিমল চাকমাকে আটক করে এবং তিনটি মামলা দায়ের করে বলে জানা গেছে।

সোমবার (১১ জুলাই) পালিয়ে থাকা পাহাড়িদের নিজ এলাকায় ফিরিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে প্রশাসনের কর্মকর্তারা রোয়াংছড়ির তালুকদার পাড়া বৌদ্ধ বিহারে মতবিনিময় সভার আয়োজন করে। এসময় উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক দীলিপ কুমার বণিক, পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান, রোয়াংছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাসুদ হোসেন।

নিরাপত্তা ব্যবস্থা তুলনামূলক জোরদার করা হয়েছে

সভায় দুর্বৃত্তদের ভয়ে আতঙ্কে থাকা স্থানীয় পাহাড়িরা তাদের নিরাপত্তার জন্য স্থায়ী সেনা ক্যাম্প স্থাপনের দাবি জানান। সেইসঙ্গে তুলে ধরেন বছরের পর বছর ধরে চলে আসা নির্মম নির্যাতন ও শোষণের বিবরণ।

এলাকার কারবারী মং পু মারমা বাংলা ট্রিবিউনকে জানায়, সন্ত্রাসীরা আমাদের হুমকি দেওয়ায় পালিয়ে যায়, এখন নিরাপত্তা দেওয়ায় ফিরে এসেছি, সেনা ক্যাম্প না দিলে আবার আক্রমন করবে।

জেলা শহর থেকে ৭ কিলোমিটার দূরে একশ’ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত এলাকাটিতে ৭০টি পাহাড়ি পরিবার বসবাস করে আসছে। একে ৪৭ রাইফেলসহ ভারী অস্ত্রেশস্ত্রে সজ্জিত সশস্ত্র দল পাড়াটিতে অবস্থান নিয়ে জোর করে পাহাড়িদের ঘরেই খেয়ে রাত যাপন করত। জুম চাষ ও মিশ্র ফলচাষ করা পাহাড়ি পরিবারগুলো থেকে জোর করে অর্থ আদায় ছিল নিত্য ব্যাপার। তাদের কথার অবাধ্য হলেই নেমে আসতে থাকে চরম নির্যাতন।

স্থানীয় মং গিলা মারমা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, প্রশাসন বলেছে ‘পাড়ায় ফিরে যাও’, আমরা ফিরে এসেছি। নিরাপত্তা না পেলে আমাদের ফের এখান থেকে চলে যেতে হবে।

শিশুদের নিরাপত্তা নিয়েও রয়েছে শঙ্কা

স্থানীয়রা জানান, সশস্ত্র বিভিন্ন দলের খুন, অপহরণ ও চাঁদাবাজি ও প্রাণনাশের হুমকির কারণে দীর্ঘদিন ধরে আতঙ্কে দিন পার করছেন তারা। পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা না হলে সামনে আরও বড় ঘটনা ঘটতে পারে বলেও আশঙ্কা তাদের। জানা যায়, পাড়াটির পাশের অরণ্যে ঘেরা পাহাড়েই অবাধ চলাচল ওই সশস্ত্র দলটির। পাড়াবাসির গতিবিধি লক্ষ্য করে তারা ওখান থেকেই।

পাড়ার বাসিন্দা সা থোয়াই চিং মারমা বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, তারা (জেএসএস) আমাদের টার্গেট করেছে। কখন কাকে গুলি করে মেরে ফেলে, সেই আতঙ্কে রাত পার করি।

সরজমিনে পরিদর্শনে দেখা যায়, ঘটনার পর নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাড়ানো হয়েছে। চারজনের পুলিশের একটি দল বেতছড়া ক্যাম্প থেকে এসে টহল দিচ্ছে। অন্যদিকে ১০ জনের সেনা সদস্যরা পাড়াটির স্কুলে অস্থায়ী ক্যাম্প বসিয়ে পাহাড়িদের নিরাপত্তা দিয়ে চলেছে।

জানা যায়, এলাকাটিতে নৌ পথের যাতায়ত একমাত্র মাধ্যম। স্থানীয়রা মনে করেন, নিরাপত্তা বাহিনীর নিজস্ব নৌযান না থাকায় বড় ঘটনা ঘটলে বাড়তি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা যোগ দিতে যে সময় লাগবে, সেই সময়ে অপরাধীরা পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।  

সাধারণ জীবনযাপনকারী পাহাড়িরা কাটাচ্ছেন সন্ত্রস্ত জীবন

১৯৯৭ সালের ২রা ডিসেম্বরের সম্পদিত পার্বত্য শান্তিচুক্তি অনুসারে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির  (জেএসএস) এর দাবি অনুসারে পাহাড়ে সেনা ক্যাম্পের পরিধি কমিয়ে আনে সরকার। আর এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে জেলায় জেএসএস তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও পাহাড়ি সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতন চালিয়ে খুন, অপহরণ ও চাঁদাবাজির মতো ঘটনা ঘটাতে থাকে।

এসব ঘটনায় জেলায় ফের সেনা ক্যাম্প স্থাপন ও র‌্যাবের ইউনিট স্থাপনের দাবি জানিয়েছে স্থানীয় আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন এলাকার নির্যাতিত পাহাড়িরা।

বান্দরবানের জেলা প্রশাসক দীলিপ কুমার বণিক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এখানে স্থায়ী সেনা ক্যাম্প বসানো যায় কিনা, তা আমরা বিবেচনা করে ব্যবস্থা নেব।

উল্লেখ্য, গত ১৩ জুন একই উপজেলার জামছড়ি এলাকা থেকে সদর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা মং পু মারমাকে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা অপহরণ করলেও, একমাসেও তার কোন খোঁজ মেলেনি।

 

/এইচকে/

আরও পড়ুন: সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন করে বন্ধুত্ব করতে চাই না: ওবায়দুল

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম