কারনেট সুবিধায় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আনা ১১২টি বিলাসবহুল গাড়ির হদিস নেই। শুল্ক গোয়েন্দা সূত্র জানায়, ২০০৭ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত এই বন্দর দিয়ে ১২১টি গাড়ি কারনেট সুবিধায় আনা হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনও গাড়ি ফেরত নেওয়া হয়নি। গাড়িগুলো এখন কোথায়, কিভাবে আছে এ ব্যাপারে সঠিক কোনও তথ্য নেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর কাছে।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের মাধ্যমে গাড়িগুলো আনা হলেও এখন গাড়িগুলো কোথায় আছে সে ব্যাপারে তাদের কাছেও কোনও তথ্য নেই। চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যাদের নামে গাড়িগুলো আনা হয়েছে তাদেরকে এখন আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
সংস্থাটি জানায়, কারনেট সুবিধায় আনা অধিকাংশ গাড়ির মালিক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক। ধারণা করা হচ্ছে, দ্বৈত পাসপোর্টধারী এসব নাগরিক গাড়িগুলো এনে দেশে বিক্রি করে দিয়ে চলে গেছেন।
অভিযোগ রয়েছে, প্রবাসী, পর্যটক, কূটনীতিক, জনপ্রতিনিধি ও বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা কারনেটসহ শুল্কমুক্ত সুবিধা নিয়ে বিদেশ থেকে এসব বিলাসবহুল গাড়ি দেশে এনে সেগুলো বিক্রি করে দেন। আর যারা দাম দিয়ে এসব গাড়ি কিনছেন সেসব মালিক কারসাজির মাধ্যমে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে এবং ভুয়া নম্বর প্লেট ব্যবহার করে এসব গাড়ি রাস্তায় চালাচ্ছেন।
শুল্ক গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, কারনেট সুবিধায় আনা গাড়িগুলো ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে রাস্তায় চালানো হচ্ছে এমন অভিযোগে তারা অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন। আর গত বছর থেকে কঠোর অভিযান শুরুর কারণে গাড়ির মালিকদের কেউ কেউ ভয়ে দামি গাড়িগুলো রাস্তায় ফেলে যাচ্ছেন। ২০১৬ সালের জুন থেকে এই পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে চট্টগ্রামের শুল্ক গোয়েন্দা কর্মকর্তারা মোট ৯ গাড়ি জব্দ করেছেন বলেও জানিয়েছেন।
শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক মো. তারেক মাহমুদ বলেন, ‘আমাদের কাছে যে হিসেব আছে সেই অনুযায়ী ২০০৭ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত মোট ১২১টি বিলাসবহুল গাড়ি কারনেট সুবিধায় আনা হয়েছে। এসব গাড়ি পরে ফেরত নেওয়ার কথা থাকলেও ফেরত নেওয়া হয়নি। গাড়িগুলো জব্দ করার জন্য আমরা অভিযান চালিয়ে যাচ্ছি। এখন পর্যন্ত চট্টগ্রামে ৯টি গাড়ি জব্দ করতে সক্ষম হয়েছি।’
তিনি আরও জানান, ‘ঢাকায়ও কারনেট সুবিধায় আনা কিছু গাড়ি জব্ধ করা হয়েছে। সেখানে প্রায় ৫০টি গাড়ি জব্দ করা হয়। ওই গাড়িগুলোর মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আনা কয়েকটি গাড়ি থাকতে পারে।’
শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর চট্টগ্রাম সূত্রে জানা যায়, ২০১৬ সালের জুন থেকে সর্বশেষ গত বুধবার পর্যন্ত মোট ৯টি গাড়ি জব্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৬ সালের ৯ জুন বন্দরের এক নম্বর ইয়ার্ড জেটি থেকে একটি রেঞ্জ রোভার জিপ, একই মাসের ২৭ জুন পূর্ব নাসিরাবাদ গ্রিনভ্যালি আবাসিক এলাকা থেকে একটি মার্সিডিজ সুগান, একই বছরের ২৪ আগস্ট মেহেদিবাগের আমিরবাগ থেকে ১টি পোরশে ও ১টি রেঞ্জ রোভার জিপ এবং ৮ নভেম্বর চট্টেশ্বরী রোডের আল রহমান রেভারভিউ হিলস থেকে আরেকটি মিনি কোপার জব্দ করা হয়।
চলতি বছর আরও ৪টি গাড়ি জব্দ করা হয়। গাড়িগুলো মধ্যে ৬ মার্চ নাসিরাবাদ হাউজিং সোসাইটি থেকে ১টি মার্সিডিজ বেঞ্জ, ১৪ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের প্রধান ছাত্রাবাসের গেইট থেকে মিৎসুবিসি পাজেরো এবং সর্বশেষ গত বুধবার (৩ মে) চট্টগ্রাম নগরীর মুরাদপুর এলাকার একটি গ্যারেজ থেকে একটি মার্সিডিজ বেঞ্জ ও একটি মার্সিডিজ কার জব্দ করে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর।
জানা গেছে, গাড়ি দুটি চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের মাধ্যমে মোহাম্মদ মনসুর আলী ও মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম নামে দুই ব্যক্তি কারনেট সুবিধায় চট্টগ্রামে নিয়ে আসেন। ফেরত নিয়ে যাওয়ার শর্তে তারা গাড়ি দুটো শুল্কমুক্তভাবে আমদানি করলেও পরবর্তীতে তারা আর গাড়ি দুটো ফেরত নিয়ে যাননি।
এদিকে ৯টি গাড়ি জব্দের পাশাপাশি গতকাল রবিবার (৭ মে) আরও একটি গাড়ির খোঁজ পেয়েছেন শুল্ক গোয়েন্দারা। গাড়িটি নজরদারিতে রাখা হয়েছে। বিআরটিএসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের কাছ থেকে তথ্য যাচাই-বাছাই করার পর গাড়িটি জব্দ করা হবে।
জানা যায়, কারনেট সুবিধার গাড়িগুলো পর্যটকরা তার নিজ দেশ থেকে শুল্কমুক্ত সুবিধায় এনে সর্বোচ্চ তিন বছর ভ্রমণের জন্য এদেশে ব্যবহার করতে পারবেন। তবে ভ্রমণ শেষে ফিরে যাওয়ার সময় অবশ্যই তাকে গাড়িটি সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে, অথবা শুল্ক অধিদফতরের অনুমতিক্রমে নিলামে বিক্রি করতে হবে। কাগজে-কলমে এ নিয়ম লেখা থাকলেও বাস্তবে তার কোনও মিল নেই।
বাস্তবে দেখা যায়, কারনেট সুবিধার আওতায় বাংলাদেশে বিএমডব্লিউ, মার্সিডিজ, হ্যামার ও পোরশের মতো নামি দামি ব্র্যান্ডের যে গাড়িগুলো এসেছে, তার অধিকাংশ বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিকেরা বাংলাদেশে নিয়ে আসেন। কারনেট-সুবিধা ব্যবহার করে তা শুল্কমুক্তভাবে খালাস করে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে দেন। যার সঙ্গে একটি সংঘবদ্ধ চক্রও জড়িত।
শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক মো. তারেক মাহমুদ বলেন, ‘সাধারণত পর্যটকরা কারনেট সুবিধা পেতেন। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক, বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলের লোকজন এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে গাড়িগুলো নিয়ে এসেছেন। কিন্তু এগুলো আর ফেরত নেওয়া হয়নি।’
/টিএন/আপ-এমও/








