ঘূর্ণিঝড় মোরা’র প্রভাবে ভারি বর্ষণে সৃষ্ট চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতা গত চার দিনেও কাটেনি। নগরীর আগ্রাবাদ সিডিএ, হালিশহর, গোসাইলডাঙার মানুষ এখনও পানিবন্দি জীবনযাপন করছেন। মহেশখালে নির্মিত বাঁধের কারণে বৃষ্টির পানি সরতে না পারায় এই অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এতে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে নগরীর এসব এলাকার মানুষদের। তবে গত তিন দিনের তুলনায় শনিবার জলাবদ্ধতা অনেকটা কমেছে। কিছু কিছু এলাকায় গোড়ালি সমান পানি জমে আছে।
এদিকে শনিবার ভোর থেকে আবারও থেমে থেমে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। এতে আবারও এসব এলাকায় ভয়াবহ জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
ভুক্তভোগী এলাকাবাসীর অভিযোগ, কর্তৃপক্ষের খাম-খেয়ালিপনাই এজন্য দায়ী। বাঁধটি অপসারণ করে নিলে তাদের আর এই দুর্ভোগে পড়তে হতো না।
বাঁধটি অপসারণে এলাকাবাসীকে সঙ্গে নিয়ে দীর্ঘদিন আন্দোলন করে আসছেন মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি খোরশেদ আলম সুজন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মহেশখালে নির্মিত এ মরণফাঁদ (বাঁধ) স্থানীয়দের জীবন-যাপন দুর্বিসহ করে তুলছে। বাঁধের কারণে সামান্য বৃষ্টিতে এখানকার বাসা-বাড়ি পথ-ঘাট তলিয়ে যায়। গত চারদিন ধরে এসব এলাকা পানির নিচে ডুবে আছে।’
তিনি বলেন, ‘শনিবার জলাবদ্ধতা কিছুটা কমলেও ভোর থেকে পুনরায় থেমে থেমে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। এতে পানি সরে যাওয়ার পরিবর্তে জলাবদ্ধতা আরও প্রকট হবে।’ তিনি দ্রুত সময়ের মধ্যে মহেশখালে নির্মিত বাঁধটি অপসারণের দাবি জানান।
আগ্রাবাদ-সিডিএ এলাকাসহ কয়েকটি এলাকাকে জোয়ারের পানি থেকে রক্ষা করতে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মহেশখালে বাঁধ নির্মাণ করে বন্দর কর্তৃপক্ষ। প্রথম দিকে এসব এলাকার মানুষ বাঁধের কিছুটা সুফল পেলেও এখন সামান্য বৃষ্টিতে ওই এলাকা পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে বাঁধ নির্মাণের ফলে জোয়ার-ভাটা না থাকায় খালটি ক্রমে নাব্যতা হারাতে শুরু করেছে। এভাবে চলতে থাকলে অচিরেই খালটি সমতল ভূমিতে রূপ নেবে। তখন জলাবদ্ধতা আর বাড়বে।
মঙ্গলবার ঘূর্ণিঝড় মোরা চট্টগ্রাম অতিক্রমের পর ওইদিন রাত থেকেই মাঝারি থেকে ভারি বর্ষণ শুরু হয়। ওই দিন রাতে পানি উঠতে শুরু করে আগ্রাবাদ, গোসাইলডাঙা ও হালিশহরসহ নগরীর নিচু এলাকায়। বুধবারের বৃষ্টিতে এসব এলাকায় হাটু থেকে কোমর পর্যন্ত জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। যা গত চার দিনেও কাটেনি। শনিবারও কোনও কোনও এলাকায় হাটু পরিমাণ পানি আছে। তবে গত তিনদিন এসব এলাকা কোনও গাড়ি চলাচল না করলেও শনিবার সকাল থেকে গাড়ি-ঘোড়া চলাচল শুরু করেছে।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, পূর্ব গোসাইলডাঙার চেয়ারম্যান বাড়ি, মধ্যম গোসাইলডাঙার উত্তর পাশ এবং দক্ষিণ গোসাইলডাঙার কিছু এলাকা এখনও জলাবদ্ধ হয়ে আছে। এছাড়া সিডিএ আবাসিক এলাকা, ব্যাপারি পাড়া, ছোটপুল, আগ্রাবাদ এক্সেস রোডে পানি রয়েছে। আগ্রাবাদ মা ও শিশু হাসপাতাল এলাকায়ও সড়কের ওপর গোড়ালি সমান পানি জমে থাকতে দেখা গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জমে থাকা পানিতে এসব এলাকার বাসিন্দাদের আসবাবপত্র, কাপড়চোপড়, টিভি-ফ্রিজসহ নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নষ্ট হয়ে গেছে। বেচাকেনা নেই সড়কের পাশের দোকানগুলোতে।
ছোটপুল এলাকায় একটি প্লাস্টিকের আসবাব পত্রের দোকানের সেলস ম্যান হিসেবে কাজ করেন আমির হোসেন। তিনি বলেন, ‘গত তিন দিনে কোনও কাস্টমার দোকানে আসেননি। সড়কেও মানুষজনকে তেমন চলাফেরা করতে দেখা যায়নি। জলাবদ্ধতার কারণে মানুষ ঘরে বসে অলস সময় পার করছেন।’
অন্যদিকে হালিশহর বাসিন্দা জসিম উদ্দিন জানান, ‘মঙ্গলবারের বৃষ্টিতে তার ঘরে পানি ঢুকে যায়। অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ না থাকায় বৃষ্টির পানিতে ঘরে থাকা ফ্রিজটি নষ্ট হয়ে গেছে।’
আগ্রাবাদ মা ও শিশু হাসপাতালের ডেপুটি ডিরেক্টর মোশারফ হোসাইন জানান, ‘হাসপাতালের নিচ তলায় থাকা পানি সরে গেছে। তবে হাসপাতালের আশপাশে নিচু এলাকায় এখনও কিছু পানি জমে আছে।’ তিনি বলেন, ‘শনিবার ভোর থেকে থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে, টানা ঘণ্টাখানেক বৃষ্টি হলে আবারও হাসপাতালে পানি প্রবেশ করবে।’
গোসাইলডাঙা ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাবিবুল হক বলেন, ‘এখনও অধিকাংশ এলাকায় পানি রয়েছে। রাস্তা-ঘাটে এখনও ৮/১০ ইঞ্চি পানি। সকাল থেকে থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা আরও বাড়বে।’ তিনি মহেশখালে নির্মিত বাঁধটি অপসারণের দাবি জানান।
হাবিবুল হক বলেন, ‘বাঁধটি যতটুকু না স্বস্তি দিয়েছিল, তার কয়েকগুণ বেশি মানুষকে ভোগান্তিতে ফেলছে। বাঁধটি অপসারণ না হলে এই জলাবদ্ধতা কখনও কাটবে না।’
চট্টগ্রাম আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ আবদুল হান্নান বলেন, ‘আরও দুই-তিন দিন হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। তবে কোনও ধরনের সংকেত দেখাতে হবে না।’ এছাড়া থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে পাহাড় ধসের আশঙ্কা রয়েছে বলে তিনি জানান।
/এপিএইচ/








