বান্দরবানে টানা দুইদিনের প্রবল বর্ষণে পাহাড় ধসের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী জেলার প্রায় কয়েক হাজার পরিবার পাহাড় ধসের ঝুঁকিতে রয়েছে। এরই মধ্যে রুমা এলাকায় সড়কের ওপর পাহাড় ধসে জেলা শহরের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। প্রবল বৃষ্টিপাতে প্লাবিত হয়ে গেছে শহরের নিম্নাঞ্চল।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বান্দরবান সদরের লামা উপজেলায় বসবাসকারীরা সবচেয়ে বেশি পাহাড় ধসের ঝুঁকিতে রয়েছে। ইতিমধ্যে জেলার বিভিন্ন স্থানে ছোট বড় পাহাড় ধসের খবর পাওয়া গেলেও এখনও পর্যন্ত কোনও হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। তবে যে কোনও মুহূর্তে পাহাড় ধসে প্রাণহানির ঘটতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের মতে, শুষ্ক মৌসুমে উন্নয়নের নামে পাহাড় কেটে বিভিন্ন এলাকার সড়কে সৃষ্ট গর্ত ভরাটসহ নতুন সড়কে মাটি দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া অপরিকল্পিতভাবে পাহাড় কেটে বসত বাড়ি নির্মাণ করায় বর্ষাকালে কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে মাটি নরম হয়ে ঘরের ওপর আছড়ে পড়ে। এতে মাটি চাপা পড়ে প্রাণহানি ঘটে অনেকের। বিগত বছর গুলোতেও এভাবে পাহাড় ধসে অনেক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। এভাবে অতি বর্ষণ অব্যাহত থাকলে এবারও পাহাড় ধসে ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
কয়েকটি বেসরকারি সংস্থার জরিপ থেকে জানা গেছে, সদর উপজেলার কাসেমপাড়া, ইসলামপুর, বনরূপা পাড়া, হাফেজঘোনা, বাসস্টেশন এলাকা, স্টেডিয়াম এলাকা, নোয়াপাড়া, কসাইপাড়া, লামা উপজেলার হরিনমারা, তেলুমিয়া পাড়া, ইসলামপুর, গজালিয়া, মুসলিম পাড়া, চেয়ারম্যানপাড়া, হরিণঝিড়ি, টিঅ্যান্ডটি এলাকা, সরই, রুপসীপাড়া, নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার উত্তরপাড়া, বাইশফাঁড়ি, আমতলী, রেজু, তুমব্রু, হেডম্যানপাড়া, মনজয় পাড়া, দৌছড়ি, বাইশারী, রুমা উপজেলার হোস্টেলপাড়া, রনিনপাড়াসহ ৭টি উপজেলার বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ের পাদদেশে অপরিকল্পিতভাবে বসতি গড়ে তুলেছে প্রায় ২৫ হাজারেরও বেশি পরিবার। এবছর পাহাড়ের পাদদেশে নতুন নতুন বসতি গড়ে উঠায় গত বছরের তুলনায় ঝুঁকিপূণ পরিবারের সংখ্যা আরও অনেক বেড়ে গেছে। পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীর বেশিরভাগই হতদরিদ্র মানুষ।
সরকারিভাবে প্রাপ্ত তথ্যর মাধ্যমে জানা গেছে, কয়েক বছরে জেলায় ২০০৬ সালে জেলা সদরে ৩ জন, ২০০৯ সালে লামা উপজেলায় শিশুসহ ১০ জন, ২০১০ সালে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় ৫জন, ২০১১ সালে রোয়াংছড়ি উপজেলায় দুইজন, ২০১২ সালে লামা উপজেলায় ২৮ জন ও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় ১০ জন, ২০১৫ সালের লামায় ৪ জন, সিদ্দিকনগরে ১জন ও সদরের বনরূপায় ২জন পাহাড় ধসে মারা গেছে।
পাহাড়ের নিচে ঝুঁকিতে থাকা ওসমান বলেন, আমি অনেক কষ্ট করে এ জায়গাটি কিনে পাহাড় সামান্য ছাটাই করে ঘর তৈরি করেছি। প্রতি বছর বর্ষাতে আমি পরিবারকে নিয়ে ভয়ে ভয়ে রাত্রি যাপন করি। পাহাড় প্রতিবছরই কম বেশি ভাঙে। তবে এখনও বড় ধরনের সমস্যা হয়নি।
হাফেজ ঘোনার আমেনা বলেন, পাহাড় অনেক সস্তায় কেনা যায়। আমাদের পক্ষে ভালো কোনও সমতল জায়গা কেনা সম্ভব নয়। তাই আমি পাহাড় কিনে সেখানেই ঘর বেঁধে থাকছি। বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিতে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে প্রচারণা চালায় প্রশাসন। কিন্তু পরিবারগুলোর স্থায়ী পুনর্বাসনের ব্যাপারে কোনও উদ্যোগ নেই কোনও সংস্থার। এদিকে, স্থায়ীভাবে পুনর্বাসন করা না হলে ঝুঁকি সত্ত্বেও পাহাড় ছাড়তে নারাজ বসবাসকারীরা।
বান্দরবান মৃত্তিকা গবেষণা কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মাহাবুবুল ইসলাম জানান, পাহাড়ে বালির আধিক্য, পাহাড়ের উপরিভাগে গাছ না থাকা, গাছ কেটে ভারসাম্য নষ্ট করা, পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ বসতবাড়ি গড়ে তোলা, পাহাড় থেকে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না রাখা, বনায়নের পদক্ষেপের অভাব, বর্ষণে পাহাড় থেকে নেমে আসা বালি ও মাটি অপসারণে দুর্বলতা ইত্যাদির কারণে পাহাড় ধস হয়ে থাকে।
জেলা প্রশাসক দিলীপ কুমার বণিক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, পাহাড়ে ঝুঁকি নিয়ে বসবাসকারীর সংখ্যা অনেক বেশি। এত পরিবারকে একসঙ্গে পুনর্বাসন করা প্রশাসনের পক্ষে হঠাৎ করে সম্ভব নয়। তবে বেশি বৃষ্টি হলে আমরা মাইকিং করে পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিতে বসবাসকারীদের নিরাপদে চলে আসতে বলি। যারা আসে না তাদেরকে আমরা নিজ উদ্যোগে সরিয়ে আনি।
টানা বর্ষণে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত: গতকাল রবিবার থেকে টানা বর্ষণে সাঙ্গু নদীর পানি বেড়ে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে আর্মি পাড়া, শেরে বাংলা নগর, ইসলামপুরসহ শহরের কয়েকটি এলাকার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। বন্যার্তরা বিভিন্ন আশ্রয় কেন্দ্র ও আত্মীয় স্বজনের বাসায় আশ্রয় নিয়েছে। এছাড়া প্রবল বর্ষণে বান্দরবান রুমা সড়কের ১৪ কিলোমিটার এলাকার দনিয়ালপাড়াস্থ কাটা পাহাড়ে প্রধান সড়কের ওপর পাহাড় ভেঙে পড়ে দুপুর থেকে রুমার সঙ্গে বান্দরবানসহ সারাদেশের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
/টিএন/আপ-এআর/এনআই








