কুমিল্লায় দুই মাস আগে সংঘটিত সিএনজিচালক রাসেল (১৮) হত্যারহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ। হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত টুংকু জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে, তার বড় ভাইসহ আরও দুজন রাসেলকে হত্যা করে লাশ স্থানীয় পুরাতন বিমানবন্দরের জঙ্গলে ফেলে দিয়েছে। এ স্বীকারোক্তি অনুযায়ী ওই জঙ্গল থেকে বৃহস্পতিবার একটি কঙ্কাল উদ্ধার করেছে পুলিশ। জেলার পুলিশ সুপার মো. শাহ আবিদ হোসেন দাবি করেছেন, কঙ্কালটি নিহত রাসেলের।
বৃহস্পতিবার বিকালে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার আরও দাবি করেন, আটক আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা গেছে, মাদক ও পরকীয়ার জের ধরেই রাসেলকে হত্যা করা হয়। নিহত রাসেল কুমিল্লা চৌদ্দগ্রাম উপজেলার মুভপুর গ্রামের জয়নাল আবেদিনের ছেলে।
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি জানান, সিএনজিচালক রাসেল ১৮ জুন যাত্রী নিয়ে নাঙ্গলকোটের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয়। এক সপ্তাহ পরেও তার খোঁজ না পেয়ে গত ২৫ জুন রাসেলের বাবা জয়নাল আবেদীন বাদী হয়ে ৪ জনের নাম উল্লেখ করে চৌদ্দগ্রাম থানায় একটি অপহরণ মামলা দায়ের করেন। পরে চৌদ্দগ্রাম থানার ওসি আবুল ফয়সালের নেতৃত্বে পুলিশ বিভিন্নস্থানে অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত শুভপুর গ্রামের শাহীন (২৩), একরামুল হক পাগলা (৪৫) এবং সন্দেহভাজন আসামি আসমা আক্তার সাথীকে গ্রেফতার করে। এদের মধ্যে শাহীনের কাছ থেকে চালক রাসেলের সিএনজিটি উদ্ধার করে পুলিশ। এরপর আটকদের জিজ্ঞাসাবাদে ঘটনার সঙ্গে টুংকু নামে আরেক ব্যক্তির জড়িত থাকার সংবাদ জানতে পারে পুলিশ। তথ্যপ্রযুক্তির সাহায্যে টুংকুকে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেফতার করা হয়। এরপরেই বেরিয়ে আসে হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের তথ্য।
পুলিশ সুপার জানান, জিজ্ঞাসাবাদে টুংকু জানায়, তার বড় ভাই গিয়াসউদ্দিন, শাহীন এবং অলি আহাম্মদ মিলে রাসেলকে হত্যার পর কুমিল্লার পুরাতন বিমানবন্দরের একটি জঙ্গলে লাশ ফেলে রেখেছে। এ বর্ণনা অনুযায়ী সদর দক্ষিণ ও চৌদ্দগ্রাম থানার পুলিশ গত ৮ জুলাই সদর দক্ষিণ উপজেলার পুরাতন বিমানবন্দরের জঙ্গলে তল্লাশি চালিয়ে একটি লাশের কঙ্কালসহ আলামত হিসেবে তার পোশাক উদ্ধার করে। পুরাতন বিমানবন্দর সংলগ্ন ইপিজেড পুলিশ ফাঁড়িতে নিহত রাসেলের বাবা-মা এসে এগুলো তাদের ছেলের বলে শনাক্ত করেন। রাসেলের মোবাইলও শনাক্ত করেন তারা।ফলে কঙ্কালটি যে রাসেলের সে ব্যাপারে নিশ্চিত হয় পুলিশ।
এদিকে ফেনীর রেল স্টেশন থেকে হত্যাকাণ্ডের মূল আসামি গিয়াস উদ্দিনকে গ্রেফতারের পর পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে সে জানায়, রাসেলের সঙ্গে তার ভাবি সাথীর প্রেমের সম্পর্ক ছিল। আবার গিয়াসের সঙ্গেও সাথীর একইরকম সম্পর্ক ছিল। বিষয়টি রাসেল মানতে না পারায় গিয়াস তাকে হত্যার পরিকল্পনা করে।
গত ১৭ জুন শুভপুরে একটি নির্মানাধীন ভবনে গিয়াস, শাহীন ও অলি মিলে রাসেলকে হত্যার পরিকল্পনা করে। এ পরিকল্পনা অনুযায়ী ১৮ জুন বিকেলে গিয়াস, শাহীন, অলি নাঙ্গলকোট যাওয়ার কথা বলে রাসেলের সিএনজিটি ভাড়া নেয়। দিনভর বিভিন্নস্থানে ঘোরাফেরার পর রাতে জেলার সদর দক্ষিণ উপজেলার রাজাপাড়া রাস্তার মোড়ে সিএনজি রেখে ইয়াবা খাওয়ার কথা বলে রাসেলকে পুরাতন বিমানবন্দর এলাকা নিয়ে যায়। সেখানে ঘাতকরা ইয়াবা সেবন করে এবং একপর্যায়ে রাসেলকে নির্মমভাবে হত্যার পর লাশ জঙ্গলে লুকিয়ে রাখে।
গ্রেফতারকৃত ৫ জনের মধ্যে শাহীন, গিয়াস উদ্দিন ও টুংকু মিয়া বৃহস্পতিবার কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. সাইফুল ইসলামের আদালতে এ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার মো. শাহ আবিদ হোসেন জানান, রাসেলকে হত্যার পর আসামীরা তাদের হাতের ছাপ মুছে ফেলার উদ্দেশ্যে ভিকটিমের মুখে ও শরীরে কাদা মেখে দেয়।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল আল মামুন, সাখাওয়াৎ হোসেন, সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার চৌদ্দগ্রাম সার্কেল মেহেদী হাসান, চৌদ্দগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবু ফয়সাল, সদর দক্ষিন মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ নজরুল ইসলাম পিপিএম, সদ্য যোগদানকৃত ডিআইওয়ান মাহবুব মোরশেদসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
/টিএন/আপ-এআর/








