শুক্রবার বিকাল ৪টা। নিবন্ধন পরীক্ষা শেষে সিডিএ আবাসিক এলাকার হাতেখড়ি স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে বের হন ফয়েজ চৌধুরী। স্কুল ভবনের দোতলা থেকে নেমেই দেখেন নিচতলায় হাঁটু পানি। ফয়েজ ভাবতে থাকেন জোয়ারের পানি নেমে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন কিনা। নাকি হাঁটু পানি পার হয়েই চলে যাবেন। এমন সময় দেখা হয় তার ব্যাচের আরও কয়েকজন সহপাঠীর। পানি নেমে যাওয়া পর্যন্ত সেখানে অপেক্ষা করার সুযোগ না থাকায় সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিলেন পানি ডিঙিয়ে তারা যে যার গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা দেবেন।
ফয়েজ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগ থেকে সদ্য পাস করে বেরিয়েছেন। এখন চাকরি খুঁজছেন।
তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আজ নিবন্ধন পরীক্ষা দিতে এসে এমন দুর্ভোগ পোহাতে হবে কখনও ভাবিনি। জীবনে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি আগে কখনও হইনি।’
ফয়েজ আরও বলেন, ‘আমরা ছেলেরা তো কোনও মতে পার হয়ে আসছি। কিন্তু মেয়েদের অনেক বেশি ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। কয়েকজন তো পানি পার হতে গিয়ে নালায় পড়ে আহত হয়েছেন।’
শুধু ফয়েজ নয়,এদিন আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক এলাকার বিভিন্ন স্কুল অ্যান্ড কলেজে ১৪তম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় অংশ নেওয়া কয়েক হাজার শিক্ষার্থী এ ধরনের ভোগান্তির শিকার হন।
ওই এলাকার আগ্রাবাদ মহিলা কলেজ কেন্দ্রে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী জান্নাতুন নাঈম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘বেলা ২টার দিকে পরীক্ষা দিতে যাওয়ার সময় রাস্তায় কোনও পানি দেখিনি। কিন্তু পরীক্ষার হল থেকে বের হয়ে দেখি চারদিকে শুধু পানি আর পানি। কোমর পরিমাণ পানি ডিঙিয়ে বাসায় ফিরে এসেছি।’
তৌহিদুল ইসলাম নামে আরেক পরীক্ষার্থী বলেন, ‘হাতেখড়ি স্কুলের নিচতলায় আমার সিট পড়ে। পরীক্ষা শুরু কিছুক্ষণের মাথায় পরীক্ষার হলে পানি ঢুকতে শুরু করে। এসময় পায়ে থাকা জুতো ভিজে যাওয়া থেকে বাঁচাতে হল পরিদর্শক জুতা খুলে লো বেঞ্চে রেখে পরীক্ষা দিতে বলেন। পরে জুতো জোড়া লো বেঞ্চে রেখে পরীক্ষা দিয়েছি।’
তিনি আরও বলেন,‘ওই সময় হল পরিদর্শক আমাদের বলেন,আপনারা তো আজ একদিন এই কষ্ট সহ্য করছেন। আমাদেরকে প্রতিদিন এই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।’
আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন,এভাবে প্রতিদিন দুই বেলা জোয়ারের পনিতে তলিয়ে যায় পুরো আবাসিক এলাকা। প্রতিবার পাঁচ ঘণ্টা করে দিনে প্রায় ১০ ঘণ্টা জোয়ারের পানিতে বন্দি থাকেন সেখানকার বাসিন্দারা। বর্তমানে ওই আবাসিক এলাকায় যাতায়াতের জন্য জোয়ার-ভাটার সময়সূচি জেনে নিতে হয় বাসিন্দাদের।
শুধু আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক এলাকা নয়,বঙ্গপোসাগরে সৃষ্ট জোয়ারে প্রতিদিন আগ্রাবাদ এলাকায় অবস্থিত বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান,ব্যবসা-বাণিজ্য, ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিদের আবাসিক কলোনি নিয়মিত ডুবছে। এছাড়া জোয়ারের পানিতে ওই এলাকায় অবস্থিত চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল ডুবছে নিয়মিত।
এদিকে নিয়মিত জলবাদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ায় অফিসে যাতায়াতের জন্য সিডিএ আবাসিক এলাকায় অবস্থিত চট্টগ্রাম কর অঞ্চল-৪ কর্তৃপক্ষ গত জুলাইয়ে একটি নৌকা কিনেছে। এর কিছুদিন পর চট্টগ্রাম পুলিশ কমিশনার অফিসও একটি নৌকা কেনে।
নৌকাটি কেনার সময় চট্টগ্রাম কর অঞ্চল-৪ এর কমিশনার আহমেদ উল্লাহ সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, ‘সেবা প্রার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারিদের দুর্ভোগ লাঘবের জন্য এ নৌকাটি কেনার সিদ্ধান্ত হয়। জলাবদ্ধতার কারণে একজন কর কর্মচারিকে দৈনিক ৩০০ টাকা গুনতে হয়। তাই উপায়োন্ত না দেখে আমরা নৌকাটি কিনতে বাধ্য হয়েছি।’
সিডিএ আবাসিক এলাকার বাসিন্দা রিয়াজুল হকের অভিযোগ,‘জোয়ারের পানিতে যখন সিডিএ আবাসিক এলাকা তলিয়ে যায় তখন পুরো এলাকার অধিকাংশ ভবনের নিচতলা পানির নিচে তলিয়ে যায়। স্কুল,কলেজের শিক্ষার্থী ও কর্মক্ষেত্রে যেতে হয় পানির মধ্য দিয়ে। কেউ অসুস্থ হলে তখন তাকে হাসপাতালে নিতে পড়তে হয় চরম বিড়ম্বনায়।








