কুমিল্লার লাকসামের ঐতিহ্যবাহী দৈনিক কাঁচাবাজার দখল করে বহুতল ভবন নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে পৌরসভার মেয়র মো.আবুল খায়েরের বিরুদ্ধে। লাকসাম পৌর শহরে সরকারের এক নম্বর খাস খতিয়ানে কুমিল্লার জেলা প্রশাসকের (ডিসি) মালিকানাধীন ৫৬ শতক জায়গা রয়েছে। ওই জায়গায় ৫০ বছর ধরে প্রায় আড়াইশ’ ব্যবসায়ী ব্যবসা করে আসছেন। সম্প্রতি ওই ব্যবসায়ীদের উচ্ছেদ করে টিনের বেড়া দিয়ে পুরো বাজারটি মেয়র দখলে নিয়েছেন বলে অভিযোগ বাজার পরিচালনা কমিটির সভাপতি আলী আজগরসহ ব্যবসায়ীদের।
এ ব্যাপারে বাজার কমিটির সভাপতিসহ ২৪৮ জন ব্যবসায়ী বাদী হয়ে কুমিল্লার আদালতে মামলা করেছেন। তবে অভিযুক্ত মেয়র আবুল খায়েরের দাবি সেখানে রাস্তা ও ড্রেনের কাজ করার জন্য ব্যবসায়ীদের অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। পরবর্তীতে নিয়মনীতি মেনেই নির্মাণ করা হবে বহুতল ভবন (মার্কেট)।
একাধিক ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সরকারের এক নম্বর খাস খতিয়ানে থাকা কুমিল্লা জেলা প্রশাসকের মালিকানাধীন লাকসাম পৌর শহরের দৈনিক বাজারে প্রায় আড়াইশ’ ব্যবসায়ী অন্তত ৫০ বছর ধরে ব্যবসা করে আসছেন। ওই বাজারে প্রতিদিনের লেনদেন কোটি টাকার বেশি। চলতি বছর এই বাজারটিতে চোখ পড়ে লাকসাম পৌরসভা মেয়রের। এর আগে গত বছরের শেষের দিকে স্থানীয় সংসদ সদস্য মো.তাজুল ইসলামের সহযোগিতায় লাকসাম দৌলতগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশনের সম্পত্তি দখল করে পৌর হর্কাস মার্কেট নামে বিশাল একটি অবৈধ মার্কেট নির্মাণ করেন এই পৌর মেয়র। এরপর দৈনিক বাজারের ব্যবসায়ীদেরও ওই মার্কেটে নেওয়ার চেষ্টা করতে থাকেন। কিন্তু ব্যবসায়ীরা তাতে রাজি হননি। এরপর তিনি ব্যবসায়ীদের উচ্ছেদ করেন।
এর প্রতিবাদে পৌরসভা মেয়র মো.আবুল খায়ের, লাকসাম উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান ও স্থানীয় সাংসদের শ্যালক মহব্বত আলী বিরুদ্ধে গত ৩১ জুলাই ওই বাজার পরিচালনা কমিটির সভাপতি আলী আজগরসহ ২৪৮ জন ব্যবসায়ী বাদী হয়ে কুমিল্লার আদালতে মামলা করেন।
মামলায় ব্যবসায়ীরা উল্লেখ করেন, সিএস খতিয়ান মূলে সারাফত উল্লা নামে এক ব্যক্তি ওই সম্পত্তির মালিক ছিলেন। তিনি ওই সম্পত্তিতে সপ্তাহের শনিবার ও বুধবার গরুর হাট বসিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। পরবর্তীতে পাকিস্তান সরকারের আমলে সারাফত উল্লার নামীয় সম্পত্তি থেকে ৫৬ শতক সম্পত্তি সরকার জেলা প্রশাসকের নামে খাস খতিয়ানে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে পাকিস্তান বিভক্তির পর বাংলাদেশ সরকারের জেলা প্রশাসক, কুমিল্লার নামে এক নম্বর খাস খতিয়ানে ওই সম্পত্তি লিপিবদ্ধ হয়। কালের পরিবর্তনে ওই ভূমিতে কাঁচামালের বাজার শুরু হলে তিন প্রজন্ম ধরে ব্যবসায়ীরা সেখানে ব্যবসা-বাণিজ্য করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছিলেন। কিন্তু বর্তমানে মামলার প্রধান অভিযুক্ত পৌর মেয়র সন্ত্রাসী নিয়ে ওই ব্যবসায়ীদের উচ্ছেদের মাধ্যমে বাজার দখল করেছে। সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণের পাঁয়তারা করছেন বলেও মামলায় অভিযোগ করা হয়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বাজারটির প্রবেশপথ টিনের বেড়া দিয়ে বন্ধ করে রাখা হয়েছে। সেখানে কোনও ব্যবসায়ীকে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। বাজারের ভেতরে ড্রেনের কাজ করা হচ্ছে এমন দাবি করা হলেও বাস্তবে তা দেখা যায়নি। তবে পাশের কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, বাজারটি নিজেদের দখলে রাখতে মাঝে মধ্যে লোক দেখানো ড্রেনের কাজ করা হয়। সপ্তাহ খানেক আগে বাজারটি টিনের বেড়া দিয়ে দখল করার পর ব্যবসায়ীদের জোরপূর্বক ওই রেলের সম্পত্তিতে নির্মিত অবৈধ মার্কেটে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে অনেক ব্যবসায়ী রেলের ওই মার্কেটে যাননি বলেও জানা গেছে। এতে করে ২৪৮ জন ব্যবসায়ী মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আলী আজগর বলেন, পৌর মেয়র আবুল খায়ের, ভাইস চেয়ারম্যান মহব্বত আলী, এমপির এপিএস মনিরুল ইসলাম রতনসহ বেশ কয়েকজন নেতা ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবকলীগের নেতাকর্মীদের নিয়ে আমাদের বাজার থেকে জোর করে উচ্ছেদ করেছেন। টিনের বেড়া দিয়ে বাজার দখল করে বহুতল মার্কেট নির্মাণের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করেছেন তারা। আমরা মামলা করেছি, প্রশাসনকে বারবার জানিয়েছি। কিন্তু এতে কোনও লাভ হয়নি।’
ওই বাজারের আবদুর রউফ, খালেক ভূইায়াসহ একাধিক ব্যবসায়ী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের সকল পুঁজি এই বাজারে বিনিয়োগ করেছি। বিভিন্ন এলাকার খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে আমাদের লাখ লাখ টাকা বকেয়া আটকে রয়েছে। এখন জোর করে উচ্ছেদ করার কারণে সেই টাকাও উত্তোলন করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে আমাদের পথে বসার উপক্রম হয়েছে।
এদিকে, বাজার দখলের অভিযোগ অস্বীকার করে লাকসাম পৌরসভার মেয়র ও উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক মো.আবুল খায়ের বলেন, বাজারে ড্রেন ও রাস্তার কাজ চলছে। তাই টিনের বেড়া দেওয়া হয়েছে। আর এমপি মহোদয় ও ইউএনও সাহেবের সঙ্গে পরামর্শ মোতাবেক এখানে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। বাজার দখল এবং ব্যবসায়ীদের উচ্ছেদের কথাটি সত্য নয় বলে দাবি তার।
লাকসাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো.রফিকুল হক বলেন, ‘আমার জানা মতে সেখানে ড্রেনের কাজ করা হচ্ছে। আর সরকারি অনুমোদন ছাড়া সেখানে ভবন করা যাবে না। এছাড়া বাজারের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব আমাদের নয়।’
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো.আসাদুজ্জামান বলেন, আমিও জেনেছি সেখানে ড্রেনের কাজ করা হচ্ছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য এসিল্যান্ড এবং ইউএনওকে বলেছি। আর সরকারের ভূমি মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ছাড়া ওই বাজারে ভবন করার কোনও এখতিয়ার পৌর মেয়রের নেই বলেও জানান তিনি।
আরও পড়ুন:
কুমিল্লায় কেঁচো সার উৎপাদন করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন নারীরা








