মিয়ানমারের রাখাইনে সহিংসতার পর পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতালে আলাদা ওয়ার্ড খোলা হয়েছে। গত এক সপ্তাহ ধরে এখানে রোহিঙ্গাদের চিকিৎসা চলছে। কক্সবাজার সদর হাসপাতাল ছাড়াও কুতুপালং কমিউনিটি ক্লিনিক, ‘এমএসএফ’ হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালেও তাদের চিকিৎসা চলছে। এত রোগীর চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতালগুলো। কোনও রোহিঙ্গার অবস্থার অবনতি হলে চট্টগ্রাম মেডিক্যালে পাঠানো হচ্ছে।
জাতিসংঘ এবং ‘আইওএম’ এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৪ আগস্ট মিয়ানমারে সহিংসতার পর থেকে এ পর্যন্ত চার লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। সেনাবাহিনী ও রাখাইনদের হাতে নানাভাবে নির্যাতিত হয়ে পালিয়ে আসা অনেক রোহিঙ্গা গুলিবিদ্ধ, জখমসহ নানাবিদ রোগে আক্রান্ত। যারা গুরুতর আহত তারা এখন ভিড় করছে জেলা সদর হাসপাতালে। এসব রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এতে সেবা বঞ্চিত হচ্ছে চিকিৎসা নিতে আসা স্থানীয় লোকজন। পরিস্থিতি সামাল দিতে সদর হাসপাতালে খোলা হয়েছে আলাদা রোহিঙ্গা সার্জারি ইউনিট।
মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও রাখাইনদের নির্যাতনের মুখে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের অনেকে আগুন, গুলি, দা, বোমার আঘাতে আহত। এছাড়া পালিয়ে আসা অধিকাংশই ডায়রিয়াসহ নানা রোগে আক্রান্ত। গত কয়েক দিনে মারাত্মক জখম রোহিঙ্গার সংখ্যা বাড়তে থাকায় সদর হাসপাতালে ভিড় করছে এসব রোগীরা। উখিয়া-টেকনাফের এনজিও ও জাতিসংঘ নিয়ন্ত্রিত হাসপাতালগুলোতে জায়গা না হওয়ায় তারা ছুটছে জেলা সদর হাসপাতালে। সদর হাসপাতালে রোহিঙ্গা রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসা কার্যক্রম। হাসপাতালের ২৫০ বেডের শতাধিক রোহিঙ্গা রোগীর দখলে। তাদেরকে দেওয়া হচ্ছে সরকারি ওষুধসহ নানা সহায়তা। এতে সেবা বঞ্চিত থাকছে স্থানীয়রা। রোহিঙ্গাদের সেবা দিতে গিয়ে হাসপাতালে সৃষ্টি হয়েছে অরাজকতা। স্থানীয় অনেকে সেবা না পেয়ে ছুটছে প্রাইভেট ক্লিনিকে। পরিস্থিতি সামাল দিতে খোলা হয়েছে রোহিঙ্গা সার্জারি ইউনিট।
চিকিৎসাসেবা নিতে আসা রোহিঙ্গা নারী মরিয়ম, শাহেনা আক্তার, ফরিদা বেগম, আব্দুল জব্বারসহ অনেকে জানিয়েছেন, রাখাইন রাজ্যে নির্যাতনের পর অনেকে আহতবস্থায় বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আশ্রয় নিলেও সেখানে খাদ্য, পানি, বাসস্থান ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা না থাকায় অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়ছে।
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স উম্মে সালমা বলেন, ‘প্রতিদিন শত শত রোহিঙ্গা রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। এরমধ্যে গুলিবিদ্ধ ও ডায়রিয়া রোগে আক্রান্তদের সংখ্যা বেশি। এসব রোহিঙ্গা রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। হাসপাতালের নানা ব্যস্ততার মাঝেও স্থানীয় রোগীদের মতো রোহিঙ্গাদেরও নানা সুযোগ সুবিধা দিয়ে যাচ্ছি।’
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের রোহিঙ্গা সার্জারি ইউনিটের ইনচার্জ শামসুন্নাহার বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের জন্য খোলা হয়েছে আলাদা সার্জারি ইউনিট। ইউনিটে রয়েছে সার্জারি, গুলিবিদ্ধ ও পোড়া রোগী। এদের মধ্যে চারজন শিশু, ৯ জন নারী ও ১৪ জন পুরুষ। তাদের সেবা দিতে কার্পণ্য করছি না।’
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার মো. শাহীন আব্দুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘রোহিঙ্গা রোগীদের সামাল দিতে খোলা হয়েছে আলাদা রোহিঙ্গা সার্জারি ইউনিট। মানবিক কারণে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। হাসপাতালে রোহিঙ্গা রোগীদের সেবা দেওয়া আমাদের জন্য কষ্টকর।’ এরপরও স্থানীয়দের জন্য চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হবে না বলে জানালেন এই কর্মকর্তা।
প্রসঙ্গত, গত ২৪ আগস্ট মিয়ানমারের আরকান রাজ্যে পুলিশ পোস্টে হামলা চালায় সে দেশের একটি বিদ্রোহী গ্রুপ। এতে ১২ পুলিশ সদস্যসহ বহু রোহিঙ্গা হতাহত হয়। এ ঘটনায় রাখাইন রাজ্যে অভিযানের নামে সাধারণ মানুষ ওপর হত্যা, ধর্ষণ, বাড়িঘরে আগুনসহ নানা নির্যাতন অব্যাহত রেখেছেন মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী। এ কারণে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন। জাতিসংঘের তথ্য মতে, এ পর্যন্ত চার লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের কথা বলা হলেও স্থানীয় সূত্র মতে, এই সংখ্যা আরও বেশি। এর আগে গত বছরের ৯ অক্টোবরের পর থেকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে একইভাবে হামলার ঘটনা ঘটে। ওই সময় প্রাণ ভয়ে পালিয়ে আসে প্রায় ৮৭ হাজার রোহিঙ্গা।
আরও পড়ুন:
রোহিঙ্গা মা ভাবতেও পারছেন না, শিশুটি আর নেই
রোহিঙ্গাদের হাতে হাতে মোবাইল, ব্যবহার করছেন বাংলাদেশি সিম








