চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করায় পরিবহন ব্যবসায়ী মো. হারুন চৌধুরীকে খুন করা হয় বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। স্থানীয় কয়েকজন পরিবহন ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, গত ২৭ নভেম্বর পশ্চিম মাদারবাড়ি ওয়ার্ডের বাসিন্দা মাদক ব্যবসায়ী মোশারফ হোসেন লিটন পরিবহন ব্যবসায়ীদের কাছে চাঁদা দাবি করলে হারুন তার প্রতিবাদ করেন। এসময় তার নেতৃত্বে পরিবহন ব্যবসায়ীরা লিটনকে মারধর করে পুলিশে দেয়। পরে স্থানীয় কাউন্সিলর ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের সহযোগিতায় ছাড়া পান লিটন। ওই ঘটনার জের ধরেই রবিবার সন্ধ্যায় পূর্বপরিকল্পিতভাবে হারুনকে হত্যা করা হয় বলে দাবি করেন তারা।
একই ধরনের অভিযোগ করেছেন নিহত হারুনের পরিবার। তার ছোট ভাই হুমায়ুন চৌধুরী বলেন, ‘আমার ভাই চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করেছিলেন। এ কারণেই তাকে হত্যা করা হয়েছে। আমরা তার হত্যার বিচার চাই।’
নিহত হারুনের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এসটি ট্রান্সপোটে কর্মরত মিলন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করায় হারুন ভাই খুন হয়েছেন। ঘটনার পরপরই আমি সেখানে গিয়ে দেখি লিটন ও তার সহযোগীরা ঘটনাস্থল থেকে চলে যাচ্ছেন। ফিরিঙ্গি বাজার ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাসান মুরাদ বিপ্লব তাদের ওইখান থেকে সরে যেতে সহযোগিতা করেন।’
এর আগে রবিবার (৩ ডিসেম্বর) সন্ধ্যা সাড়ে ৫টার দিকে চট্টগ্রাম নগরীর সদরঘাটের শুভপুর বাসস্ট্যান্ডের পাশে নিজের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সামনে মো. হারুন চৌধুরীকে গুলি করে হত্যা করে দুবৃর্ত্তরা। হারুন স্থানীয় সদরঘাট যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন।
সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নিহত হারুনের বাসায় গিয়ে দেখা যায়, ময়নাতদন্ত শেষে তার লাশ বাসায় নিয়ে আসা হয়েছে। গোসল শেষে মরদেহটি বাসার গলির সামনে রাখা হয়েছে। এসময় প্রত্যক্ষদর্শী একাধিক ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের স্বীকৃতিকে ঘিরে স্থানীয় তিন ওয়ার্ডের উদ্যোগে রবিবার বিকেলে একটি শোভাযাত্রা বের করা হয়। শোভাযাত্রায় দুই হাজারের বেশি লোকের সমাগম হয়। শোভাযাত্রা শেষে পাঁচ-ছয়জন যুবক হারুনকে ঘিরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার মাথায় আঘাত করে। এক পর্যায়ে হারুনের বুকের অস্ত্র ঠেকিয়ে পর পর তিনটি গুলি করে। পরে মৃত্যু নিশ্চিত করে তারা সেখান থেকে পালিয়ে যায়। ঘটনার সময় মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত মোশারফ হোসেন লিটন ও নুর নবী ঘটনাস্থলে ছিলেন বলে তারা জানান।
স্থানীয় রাজনীতিতে লিটন মহানগর যুবলীগ নেতা (সিআরবি জোড়া খুনের মামলার আসামি) সাইফুল আলম লিমনের অনুসারী হিসেবে পরিচিত। অন্যদিকে নুর ২৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আব্দুল কাদের (মাছ কাদের) এর অনুসারী বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
মহানগর যুবলীগ নেতা সাইফুল আলম লিমন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের স্বীকৃতিকে কেন্দ্র করে স্থানীয় আওয়ামী লীগ আনন্দ র্যালির আয়োজন করে। তারা আমাকে আমন্ত্রণ করায় আমি ওই অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহণ করি। ওই র্যালিতে স্থানীয় তিন কাউন্সিলরও ছিলেন। র্যালির পরে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেছে বলে শুনেছি। কে বা কারা এ ঘটনা ঘটিয়ে আমার জানা নেই। লিটন নামে কারও সঙ্গে তার রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নেই বলে তিনি জানান।’
ফিরিঙ্গি বাজার ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাসান মুরাদ বিপ্লব বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রোগ্রাম শেষ করে আসার সময় একজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন শুনে, আমি সেখানে গিয়ে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠাই। এসময় কিছু লোক লাঠিসোঠা নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়লে আমি তাদের অবরোধ না করে গুলিবিদ্ধ হারুনকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে সহযোগিতা করার কথা বলি।’ কে বা কারা এ ঘটনা ঘটিয়েছেন, তা জানা নেই বলে তিনি জানান।
নিহত হারুন চৌধুরীর চাচা স্থানীয় সদরঘাট থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি জাহাঙ্গীর চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কে বা কারা খুন করেছে এ বিষয়ে আমি মন্তব্য করবো না। যারা খুন করেছেন তাদের বিষয়ে আইনশৃংখলা বাহিনী খোঁজখবর নিচ্ছে। আমি আগামীকাল দলের হাইকমান্ডের সঙ্গে কথা বলবো। আমাদের দলকে ব্যবহার করে কোনও খুনী যেন পার না পায় সেটি নিশ্চিত করতে উনাদের সহযোগিতা চাইবো।’
এ বিষয়ে নগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (কোতোয়ালী জোন) জাহাঙ্গীর আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘প্রাথমিক খোঁজ খবর নিয়ে আমরা খুনের সঙ্গে জড়িত কয়েক জনের নাম পেয়েছি। তারা আমাদের নজরদারির মধ্যে রয়েছে। তাদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পরপরই আমরা তাদের গ্রেফতার করবো।’
মাদক ব্যবসায়ী লিটন জড়িত থাকার বিষয়ে পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘তার জড়িত থাকার বিষয়ে আমাদের কাছে কিছু তথ্য আছে। তবে আমরা এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত নই। তার জড়িত থাকার বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখছি।’ এঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনও মামলা দায়ের হয়নি বলে তিনি জানান।
আরও পড়ুন: ফরিদপুরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ১








