এই বছরের ৫ ডিসেম্বর রাঙামাটিতে আওয়ামী লীগের এক নেতাকে গুলি করে হত্যা ও পরে একাধিক নেতার ওপর হামলার ঘটনায় আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে পাহাড়ের রাজনীতি। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের অভিযোগ, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) টার্গেট করে দলীয় নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালাচ্ছে। এ নিয়ে আতঙ্ক ছড়িয়েছে ক্ষমতাসীন দলটির স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে। ক্ষমতাসীন দলটির স্থানীয় নেতাদের অভিযোগ, পাহাড়ের এই উত্তপ্ত রাজীতিতেও বিএনপির নেতাকর্মীরা বনভোজন করেছেন। যদিও দলটি স্থানীয় নেতারা বলছেন, তারাও রয়েছেন জেএসএসের ‘চাপে’। তবে সব অভিযোগই অস্বীকার করছেন জেএসএস নেতারা।
প্রসঙ্গত, গত ৫ ডিসেম্বর রাঙামাটির জুরাছড়ি উপজেলায় আওয়ামী লীগের নেতা অরবিন্দ চাকমাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। একইদিন হামলা চালানো হয় বিলাইছড়ি আওয়ামীলীগ নেতা রাসেল মারমার ওপর। এঘটনার প্রতিবাদ জানাতে জেলা আওয়ামী লীগের প্রতিবাদ সভায় বক্তব্য দেওয়ার পর রাতে নিজ বাসায় হামলার শিকার হন মহিলা লীগের সহ-সভাপতি ঝর্ণা খীসা। আওয়ামী লীগ নেতা হত্যার প্রতিবাদে গত ৭ ডিসেম্বর জেলায় হরতাল পালন করে জেলা যুবলীগ। এর পরদিনই (৮ ডিসেম্বর) পাহাড়ি নেতাকর্মীদের নিয়ে বনভোজনে যান বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা নেতা মনীষ দেওয়ান।
আওয়ামী লীগের অভিযোগ, পাহাড়িদের মধ্যে যারা আওয়ামী লীগ করেন, তাদেরই টার্গেট করে হামলা করছে জেএসএস। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের অভিযোগ, এ কারণে আরও হামলার আতঙ্কে দলীয় পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মীর পদত্যাগের ঘটনাও ঘটেছে। তবে এর মধ্যে কোনও ধরনের হামলার শিকার হননি বিএনপির কোনও নেতাকর্মী। বরং দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে বনভোজন আয়োজনের ঘটনা নিয়ে আওয়ামী লীগের অভিযোগ, আগামী নির্বাচনে তাদের ঠেকাতেই ভয়ভীতি দেখিয়ে তাদের নেতাকর্মীদের পদত্যাগে বাধ্য করানো হচ্ছে। আর সেই উদ্দেশ্যেই জেএসএসের সঙ্গে গোপনে সমঝোতা হয়ে থাকতে পারে বিএনপির।
রাঙামাটি জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক প্রকাশ চাকমা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা সবসময় অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি করি। আর বিএনপি ও জেএসএস সম্প্রদায়িক রাজনীতিকে প্রশ্রয় দেয়। আওয়ামী লীগ সরকার যখন পার্বত্য চুক্তি করে, তখন বিএনপি কালো পাতাকা নিয়ে সারা দেশে মিছিল করে। শান্তি চুক্তির পরের নির্বাচনে পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি দীপংকর তালুকদারের বিরুদ্ধে জেএসএস মাঠে নামে। তারা বিএনপি প্রার্থী মনি স্বপন দেওয়ানকে মৌন সমর্থন দেয়। এখানে সবকিছু পরিষ্কার—আঞ্চলিক দলগুলো অসাম্প্রদায়িক শক্তিকে ধ্বংস করে সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান ঘটিয়ে পার্বত্য অঞ্চলে অশান্ত করার চেষ্টায় লিপ্ত।’
জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হাজী মো. মুছা মতব্বর বলেন, ‘যেখানে আওয়ামী লীগের পাহাড়ি নেতাকর্মীদের দল থেকে পদত্যাগে বাধ্য করতে জেএসএস হত্যার রাজনীতিতে নেমেছে, সেখানে বিএনপিকে তারা জামাই আদর করছে। বিএনপির সঙ্গে জেএসএসের সম্পর্ক ভালো ছিল। কারণ, বিএনপি ক্ষমতায় থাকার সময় শান্তি চুক্তির কোনও ধারা বাস্তবায়ন করেনি। করার চেষ্টাও করেনি। আর তারাও চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য কোনও চাপ দেয়নি বিএনপিকে। আমরা চুক্তি বাস্তবায়নের কাজের গতি যখন বাড়িয়ে দিলাম, তখন তারা এর বাস্তবায়ন ঠেকানোর জন্য পার্বত্য অঞ্চলকে উত্তপ্ত করার চেষ্টায় লিপ্ত হলো। এর মূল কারণ, চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন হলে তাদের রাজনীতি ধ্বংস হয়ে যাবে। সাধারণ মানুষকে যেভাবে তারা চুক্তির কথা বলে ধোঁকা দেয়, তা বন্ধ হয়ে যাবে।’
এ বিষয়ে রাঙামাটি বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দীপন তালুকদার দীপু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা আমাদের নেতাকর্মীদের নিয়ে বনভোজনে গিয়েছি। এটা পূর্বনির্ধারিত ছিল।’ তাদের ওপর পাহাড়িদের চাপ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আঞ্চলিক দলগুলো শুরু থেকেই পাহাড়ি নেতাকর্মীদের চাপ দিয়ে আসছে। এই চাপ এখনও অব্যাহত আছে। পাহাড়িরা যেন জাতীয় রাজনীতি না করে, সেটাই আঞ্চলিক দলগুলোর মূল লক্ষ্য। অন্যদিকে, আমরা পাহাড়ি-বাঙালি একসঙ্গে কাজ করার চেষ্টা করছি। কারও চাপের কাছে আমরা নতি স্বীকার করি না। আর জেএসএসের সঙ্গে বিএনপির সমঝোতার কোনও সম্ভাবনা নেই।’
বিএনপি ও আওয়ামী লীগ নেতাদের এসব অভিযোগ অস্বীকার করে জেএসএসের সহ-তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিএনপির সঙ্গে কোনও সমঝোতা হয়নি। হওয়ারও কোনও সম্ভাবনা নেই। তারা এক আদর্শ নিয়ে রাজনীতি করে, আমরা আরেক আদর্শ নিয়ে রাজনীতি করি।’ হত্যা বা হামলার সঙ্গে জেএসএস জড়িত নয় দাবি করে তিনি বলেন, ‘যখন শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের দিকে যায়, তখন কিছু মানুষ পরিস্থিতি ঘোলাটে করে চুক্তি বাস্তবায়নের পথে বাধা তৈরি করে।’
আরও পড়ুন:








