অযত্ন-অবহেলায় হারিয়ে যাচ্ছে ভাষাসৈনিক শহীদ ধীরেন্দ্রনাথের স্মৃতি

মাসুদ আলম, কুমিল্লা
১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ১০:২১আপডেট : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ১৪:১৯

ভাষাসৈনিক শহীধ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাড়ি ভাষা সৈনিকদের মধ্যে অন্যতম কুমিল্লার শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। পাকিস্তান গণপরিষদে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার প্রথম প্রস্তাবকারী ছিলেন তিনি। অথচ প্রশাসন আর উত্তরাধিকারীদের অযত্ন-অবহেলায় হারিয়ে যাচ্ছে এই মানুষটির স্মৃতিচিহ্ন। যথাযথ পদক্ষেপ না নেওয়ায় কুমিল্লা নগরীর ঝাউতলায় অবস্থিত তার বাড়িটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত সর্বপ্রথম বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উত্থাপন করেন। এ কারণে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের রোষানলে পড়ে বহুবার কারাবরণ করেন তিনি। ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ গভীর রাতে নিজ বাড়ি থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ছেলে দিলীপ দত্তসহ তাকে কুমিল্লা সেনানিবাসে ধরে নিয়ে যায়। সেখানে ৮৫ বছর বয়সী এই দেশপ্রেমিক রাজনীতিকের ওপর চালানো হয় অমানবিক নির্যাতন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।

ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত

তবে এই মানুষটির স্মৃতিচিহ্ন সংস্কারে কোনও উদ্যোগ নেই স্থানীয় প্রশাসন ও তার স্বজনদের। কুমিল্লা নগরীর ঝাউতলা ধর্মসাগরের পশ্চিমপাশে ভাষা সৈনিকের সেই বাড়িটি একেবারেই বসবাসের অনুপযোগী। বাড়িতে ঢুকতেই রয়েছে একটি চায়ের দোকান। বাড়িটির এক পাশে হাসপাতালের বর্জ্য,অন্যপাশে নালার দুর্গন্ধযুক্ত কালো পানি। জঙ্গলে ঢাকা পড়েছে জরাজীর্ণ চারকক্ষবিশিষ্ট ভবনটি। বাড়ির মাঝখানে টিনশেডের ঘরটি বৈঠকখানা হিসেবে ব্যবহার করতেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। সেই ঘরের চালও ফুটো। বর্ষা মৌসুমে একটু বৃষ্টি হলেই বাড়ির মধ্যে জমে হাঁটু পানি।

তিনি যে কক্ষে ঘুমাতেন সেখানে এখনও তার ব্যবহৃত খাট, বালিশ, খাওয়ার প্লেট,পানির গ্লাস,গায়ের কাঁথা রয়েছে। কিন্তু এগুলো কিছুই সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেই। পড়ে আছে এদিক-সেদিক। বাড়ির সামনে শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত নামের সাইনবোর্ডটিও ভেঙে পড়ে গেছে। পুরো বাড়িটিই এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

বৈঠকখানার টিনশেডের ঘরটিতে রয়েছে মোট ছয়টি কক্ষ, যার দুইটি কক্ষে প্রায় ১৩ বছর ধরে পরিবার নিয়ে বসবাস করেন সুজন মিয়া নামে এক ব্যাক্তি। তিনি মারা যাওয়ার পর তার স্ত্রী জাহানারা বেগম এবং ছেলে রিপন মিয়া তার পরিবার নিয়ে বর্তমানে সেখানে বাস করছেন। তারা মূলত কেয়ারটেকার হিসেবে এই বাড়িতে আছেন।

পুরো বাড়ির এ দশা

২০১০ সালে তৎকালীন তথ্য ও সংস্কৃতিমন্ত্রী বাড়িটি পরিদর্শন করার পর ভাষা সৈনিক ‘ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্মৃতি জাদুঘর’  নির্মাণের আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু ৭ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই আশ্বাস পূরণে কোনও  উদ্যোগ নেওয়া হয়নি সরকারের পক্ষ থেকে। ফলে এই সূর্য সন্তানের স্মৃতি এখন নিঃশেষ হওয়ার পথে।

স্থানীয় বিশিষ্টজনেরা জানিয়েছেন, ২০১০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর তৎকালীন তথ্য ও সংস্কৃতিমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ বাড়িটি পরিদর্শন করেন। তিনি চারদিক ঘুরে বাড়িটির সার্বিক অবস্থা দেখে হতাশা প্রকাশ করেন। পরিদর্শন শেষে ভাষা সৈনিক ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্মৃতি জাদুঘর নির্মাণের কাজ খুব শিগগির শুরু হবে বলে আশ্বাস দেন। কিন্তু সে আশ্বাস আশ্বাসই থেকে গেছে, বাস্তবায়ন হয়নি।

ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের নাতনি অ্যারোমা দত্ত বলেন, ‘এখানে ১৫ শতক জায়গা রয়েছে। জাল-দলিল করে জনৈক ব্যক্তি ওই জায়গার মালিকানা দাবি করেন। এরপর সেটা নিয়ে মামলা হয়। এ জায়গাটিই আমাদের একমাত্র সম্বল। এখানে শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্মৃতি জাদুঘর করতে চাই।’

অযত্ন-অবহেলায় হারিয়ে যাচ্ছে ভাষাসৈনিক শহীদ ধীরেন্দ্রনাথের স্মৃতি

কুমিল্লার সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব শাহাজান চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রথম প্রস্তাবকারী কুমিল্লার সূর্যসন্তান শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটাও হারাতে বসেছি আমরা। এই বাড়ির উত্তরাধিকারীরা একমাত্র সম্পদ যেহেতু একেবারে দিয়ে দিতে নারাজ,  সেক্ষেত্রে  সরকার তাদের কাছ থেকে কিনে নিতে পারে। বিকল্প হিসেবে অন্য কোনও স্থানে এমন কিছু করা হোক যেন আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে স্মরণ করতে পারে।’

সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) কুমিল্লা জেলার সাবেক সভাপতি আলী আকবর মাসুম বলেন, ‘আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে ভুলতে বসেছে। অযত্ম-অবহেলায় পড়ে থাকায় একমাত্র বাড়িটিও সংস্কার ও সংরক্ষণের অভাবে হারাতে বসেছি। স্মৃতিরক্ষার্থে যে কোনও মূল্যেই শচীন দেবের বাড়ির মতো সংস্কার করে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাড়িটিও সংরক্ষণ করার দাবি জানাই।’

অযত্ন-অবহেলায় হারিয়ে যাচ্ছে ভাষাসৈনিক শহীদ ধীরেন্দ্রনাথের স্মৃতি

কুমিল্লা জেলা প্রশাসক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাড়িটি ব্যক্তি মালিকানা। যদি সরকারি সম্পত্তি হতো, তাহলে আমরা জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে কিছু করতে পারতাম। এখনও তাদের উত্তরাধিকাররা বেঁচে আছেন। তারা যদি সরকারকে শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের সম্পত্তি দান করে, তাহলে সরকার তার স্মৃতিরক্ষার্থে জাদুঘরসহ আরো ভালো কিছু করতে পারবে।’

 

 

/এসএসএ/এসটি/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম