চাচার ওপর হামলার প্রতিবাদ ও হাজী ইকবালের অন্যায় কাজের বিরোধিতা করায় যুবলীগকর্মী মহিউদ্দিনকে খুন করা হয় বলে জানিয়েছেন নিহতের আত্মীয়-স্বজন ও স্থানীয়রা। তারা জানিয়েছেন, ২০১৭ সালের ১০ জানুয়ারি হাজী ইকবাল ও তার অনুসারীরা স্কুলে ঢুকে মহিউদ্দিনের চাচা ও মেহের আফজাল স্কুলের শিক্ষক হাজী মোহাম্মদ আলী মঈনুকে কুপিয়ে আহত করে। ওই ঘটনার জের ধরে হাজী ইকবালের সঙ্গে মহিউদ্দিনের শত্রুতা শুরু হয়। এর আগে মহিউদ্দিন, হাজী ইকবালের সঙ্গে রাজনীতি করলেও ওই ঘটনার জের ধরে তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। এরপর থেকে এলাকায় সবসময় হাজী ইকবালের অন্যায় কাজের বিরোধিতা করে আসছেন।
স্বজনদের দাবি, ধারাবাহিক এই বিরোধের জের ধরেই ২৬ মার্চ মহিউদ্দিনকে হত্যা করা হয়।
নিহত মহিউদ্দিনের চাচা স্কুলশিক্ষক মোহাম্মদ আলী মঈনু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘স্কুলের একটি বিষয় নিয়ে বিরোধের জের ধরে গত বছরের ১০ জানুয়ারি হাজী ইকবাল ও তার লোকজন আমাকে কুপিয়ে আহত করে। এই ঘটনার জের ধরে আমার ভাতিজা তার কাছ থেকে সরে আসে এবং তার অন্যায় কাজের বিরোধিতা শুরু করে। সেই থেকে হাজী ইকবালের সঙ্গে আমাদের বিরোধ চলতে থাকে। হাজী ইকবাল বেশ কয়েকবার মহিউদ্দিনের দোকানেও হামলা চালিয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাকে (একজন স্কুল শিক্ষক) কুপিয়ে আহত করার ঘটনায় এলাকায় হাজী ইকবালের গুরুত্ব কমে যায়। আগে মানুষ তাকে যে সম্মান করতো, সেটি কমতে থাকে। এমনকি সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানেও দাওয়াত করতো না। ওই ঘটনার পর মূলত হাজী ইকবাল এক ঘরে হয়ে যায়। সম্প্রতি আমার ভাতিজা ফেসবুকে তার (হাজী ইকবাল) বিরুদ্ধে স্ট্যাটাস দিয়েছিল। এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করেই হাজী ইকবাল আমার ভাতিজাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে।’
তিনি বলেন, ‘হাজী ইকবাল আমার ভাতিজার গলাচিপে ধরে। আর তার ভাই মোরাদ আলীসহ অন্যরা তাকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা করে।’
মোহাম্মদ আলী মঈনু বলেন, ‘তারা এলোপাতাড়ি কুপিয়ে আহত করার পর মহিউদ্দিনের মৃত্যু নিশ্চিত করতে তার হাত-পায়ের রগ কেটে দিয়েছে। হাজী ইকবাল ও তার অনুসারীরা আমার ভাতিজাকে মধ্যযুগীয় কায়দায় হত্যা করেছে। মেরে ফেলার পর তারা মহিউদ্দিনের বাম চোখ উপড়ে ফেলে।’
নিহত মহিউদ্দিনের ফেসবুক ওয়ালে গিয়ে তার চাচার কথার সত্যতা পাওয়া গেছে। মহিউদ্দিন ২৪ মার্চ তার ফেসবুক ওয়ালে হাজী ইকবালের গত বছরের আগস্ট মাসের কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করে ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের কর্মসূচির কিছু ছবি আপলোড দিয়ে লেখেন, ‘ভণ্ড চাটুকারদের এইভাবে প্রতিহত করা হচ্ছে এবং আগামীতেও আরও শক্ত হাতে করা হবে, ইনশাআল্লাহ। তাই আবারও বলছি, সময় থাকতে ভণ্ডামি ছেড়ে ভাল হয়ে যান।’
৩৮ নম্বর দক্ষিণ মধ্যম হালিশহর ওয়ার্ডের সভাপতি ও মেহের আফজাল স্কুলের সভাপতি এম হাসান মুরাদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হাজী ইকবালের সঙ্গে নিহত মহিউদ্দিনের ভালো সম্পর্ক ছিল। কিন্তু, গত বছর তার চাচাকে কুপিয়ে আহত করার পর সে হাজী ইকবালের কাছ থেকে সরে এসে আমাদের (মূল সংগঠনের) রাজনীতি শুরু করে। এরপর থেকে সে মহানগর, ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সব কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিল। সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রীর পটিয়া আগমনের কর্মসূচিতেও সে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। তার (হাজী ইকবাল) কাছ থেকে সরে এসে রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা। পাশাপাশি তাকে (হাজী ইকবাল) এলাকায় কোনঠাসা করে রাখায় মহিউদ্দিনকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘হাজী ইকবাল অনেক আগ থেকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। সে ২০০৭-০৮ সালের দিকে বন্দর থানা আওয়ামী লীগ কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ছিল। কিন্তু তার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে ওই সময় থানা আওয়ামী লীগ সভাপতি-সেক্রেটারি বসে তাকে কমিটি থেকে বহিষ্কার করে। তারপর থেকে এখন পর্যন্ত তার কোনও পদ-পদবি নাই। ওর শুধু একটা মুজিব কোর্ট ছাড়া আর কোনও পরিচিতি নেই। ওটাই তার পরিচিতি, কেউ যেন তাকে কিছু বলতে না পারে সেজন্য সে সবসময় ওই কোর্ট পরে থাকে।’
নিহত মহিউদ্দিন মহিব দক্ষিণ মধ্যম হালিশহর নতুন দুই নম্বর সাইডের মঈনু মাস্টারের বাড়ির মৃত আবু ইব্রাহিমের ছেলে। তিনি যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। রাজনীতিতে মহিউদ্দিন নগর আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি প্রয়াত নেতা এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারী ছিলেন।
অন্যদিকে হাজী ইকবাল নগরীর ৩৮ নম্বর দক্ষিণ মধ্যম হালিশহর ওয়ার্ডের হাজি আবদুল মালুম বাড়ির বাসিন্দা আলী আকবরের ছেলে। বর্তমানে আওয়ামী লীগের কোনও পদ-পদবিতে না থাকলেও বেশ কয়েক বছর আগে তিনি বন্দর থানা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। দলীয় পদ-পদবি ব্যবহার করে সুবিধা আদায়ের অভিযোগে তাকে ৮ বছর আগে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। তার বাবা আলী আকবর প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা এম এ আজিজ হত্যাচেষ্টা মামলার আসামি ছিলেন বলে জানা গেছে।
বন্দর থানা আওয়ামী লীগের বর্তমান সভাপতি নুরুল আলম বলেন, ‘কখনও নিজেকে বন্দর থানা সভাপতি, কখনও সাধারণ সম্পাদক দাবি করে মানুষকে বিভ্রান্ত এবং দলীয় পদবি ব্যবহার করে সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করায় আট বছর আগে ইকবালকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।’
এদিকে হাজী ইকবাল দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকলেও সে গত বছরের ১৫ আগস্ট আলোচনায় আসে। ওই দিন চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সামনে ‘শোক দিবস উদযাপন পরিষদ ২০১৭ চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা)’ ব্যানারে একটি মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়। ওই কর্মসূচিতে ৫০ থেকে ৬০ জন লোক অংশ নিয়েছিলেন। তখন হাজী ইকবাল জিঞ্জির চাকু (ব্লেড আকৃতির ধারালো ছুরি গুচ্ছ) দিয়ে নিজের শরীরে আঘাত করছিলেন, আর বলছিলেন ‘হায় মুজিব’, ‘হায় মুজিব’। বেশ কিছুক্ষণ ধরে তার এই মাতম চলে। বঙ্গবন্ধুর জন্য শোক প্রকাশের নামে তার এমন বিকৃত আচরণের ভিডিও ফুটেজ ফেসবুকে ভাইরাল হলে সারাদেশে সমালোচনার ঝড় ওঠে।
সোমবার (২৬ মার্চ) দুপুর আড়াইটার দিকে বন্দর থানাধীন মেহের আফজাল স্কুলে প্রধান শিক্ষকের কক্ষে মহিউদ্দিনকে কুপিয়ে আহত করা হয়। পরে তাকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে জরুরি বিভাগের চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ওই দিন পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হাজী ইকবালের নেতৃত্বে তার ছেলে, ভাই, ভাগনেসহ ১৫-২০ জন অনুসারী স্কুলের প্রধান শিক্ষকের কক্ষে ঢুকে মহিউদ্দিনকে কুপিয়ে আহত করে।
এই ঘটনায় নিহত মহিউদ্দিনের মা নুর ছাহার বেগম বাদী হয়ে থানায় হাজী ইকবালসহ ১৮জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় ইতোমধ্যে দুই জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গ্রেফতার দুই আসামি হলো বাপ্পী ও মুছা। তাদেরকে ঘটনার পর সোমবার রাতে গ্রেফতার করা হয়।








